কৃষক কার্ড কৃষিতে আনছে নতুন দিনের বার্তা

মোহাম্মদ জাকির হোসেন

দেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। কৃষির সাথে বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ মানুষ জড়িত। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মর্যাদাপূর্ণ পেশা কৃষিকে আরও মহিমান্বিত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সকল শ্রেণির কৃষকের জন্য কৃষক কার্ড প্রদানের অঙ্গীকার করেছেন। তারই ধারাবহিকতায় কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে কৃষক কার্ড প্রদান করা হচ্ছে।

তিন ধাপে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের সব কৃষককে ‘কৃষক কার্ড’ দেবে সরকার। পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে দেওয়া হবে এই কার্ড। এর মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণসহ ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন কার্ডধারী কৃষকেরা। পয়লা বৈশাখ (আগামী মঙ্গলবার) নতুন বাংলা বছরের প্রথম দিনে প্রাক পাইলটিং পর্যায়ের ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ উদ্বোধন করা হবে। টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

কৃষক কার্ড বিতরণ তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে। এগুলো হলো, প্রাক পাইলটিং (পরীক্ষামূলক), পাইলটিং এবং দেশব্যাপী কার্যক্রম। প্রাক পাইলটিং পর্যায়ে ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে ফসল উৎপাদনকারী কৃষকের পাশাপাশি মৎস্যচাষি বা আহরণকারী, প্রাণিসম্পদখাতে নিয়োজিত খামারি ও দগ্ধ খামারিসহ ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড়ো শ্রেণির কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লবণচাষিও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। প্রাক পাইলটিং পর্যায়ে ওই ১১টি ব্লকের কৃষক, মৎস্যচাষি, প্রাণিসম্পদ খামারি ও লবণ চাষিকে ” কৃষক কার্ড” দেওয়া হচ্ছে। এটি একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড। সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় পর্যায়ের শাখায় সংশ্লিষ্ট কৃষকদের নামে এই কার্ডের বিপরীতে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভূমিহীন কৃষক ২ হাজার ২৪৬ জন, প্রান্তিক কৃষক ৯ হাজার ৪৫৮ জন, ক্ষুদ্র কৃষক ৮ হাজার ৯৬৭ জন, মাঝারি কৃষক ১ হাজার ৩০৩ এবং বড়ো কৃষক ৯১ জন। এর মধ্যে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের কার্ডের মাধ্যমে বছরে আড়াই হাজার টাকাও নগদ দেওয়া হবে। ২২ হাজার ৬৫ জনের মধ্যে এই সংখ্যা ২০ হাজার ৬৭১ জন। প্রাক পাইলটিংয়ের জন্য ব্যয় হবে প্রায় আট কোটি ৩৪ লাখ টাকা। প্রাক পাইলটিংয়ে শেষ হওয়ার পর আগামী আগস্ট পর্যন্ত ১৫টি উপজেলায় পাইলট কার্যক্রম শুরু করা হবে। এর অভিজ্ঞতার আলোকে আগামী চার বছরে সারা দেশে এই কার্ড বিতরণ ও তথ্য ভাণ্ডার তৈরির কাজ পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

দেশের মোট আবাদযোগ্য কৃষি জমির সর্বোচ্চ বিজ্ঞানম্মত ব্যবহারের লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। সামনের দিনে দেশের প্রতি ইঞ্চি জমিকে ডাটাবেজের আওতায় আনা সরকারের লক্ষ। জমির অম্লতা হ্রাস করে জমির স্বাভাবিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার  করা, সারের অতি ব্যবহার হ্রাস, পরিমিত সেচ, ফসলের আবর্তন, স্থানীয় প্রকরণের বিস্তারসহ বিবিধ বিষয়ে কাজ করার মাধ্যমে কৃষিকে আধুনিক ও রপ্তানীমুখী করা সরকারের লক্ষ্য। কৃষির পাশাপাশি মৎস্য, প্রাণিসম্পদখাত, সমুদ্রে টেকসই মৎস্য আহরণ প্রভৃতি বিষয়ে বিশদ কাজ করার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।

এসকল প্রপঞ্ছ বাস্তবায়ন করে একটি স্বনির্ভর অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদশকে দাঁড় করাতে কৃষিখাতের উন্নয়নের বিকল্প নেই। কৃষির মূল চালিকাশক্তি কৃষক। দেশের প্রায় দুই কোটি সাতাশ লক্ষ কৃষককে একটি ডাটাবেজের আওতায় এনে কৃষিখাতকে বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালনা করে দেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব বাড়ানো সম্ভব। সে লক্ষে সরকার কৃষক কার্ড চালু করেছে। দেশের ১০ টি জেলার ১১ টি উপজেলার ১১ টি ব্লকে প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে কৃষক কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে। পহেলা বৈশাখ প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কৃষকগণ কৃষি কার্ড পাচ্ছেন। দেশের কৃষিতে এ এক নতুন যুগের সূচনা। পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলার কমলাপুর ব্লক, বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার উথলি ব্লক,  ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার কৃপালপুর ব্লক, পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার রাজাবাড়ি ব্লক, কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার রাজারছড়া ব্লক, কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর উপজেলার অরণ্যপুর ব্লক, টাঙ্গাইল জেলার টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সুরুজ ব্লক, রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার তেনাপঁচা ব্লক,  মৌলভিবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার ফুলতলা ব্লক, পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার পাঁচপির ব্লক ও জামালপুর জেলার, ইসলামপুর উপজেলার গাইবান্ধা ব্লকের মোট ২২,০৬৫ জন কৃষক এ কার্ড পাচ্ছেন। যার মধ্যে ২০,৬৭১ জন কৃষক প্রণোদনা পাবেন।

এ কার্ডের মাধ্যমে  সকল শ্রেণির কৃষক, খামারি, মৎস্যজীবী, ক্ষেত্রমতে লবণ চাষিরাও ডিজিটাল ডাটেবেজের আওতায় আসবে। কৃষকেরা এ কার্ডের মাধ্যমে  সরাসরি নগদ আর্থিক সহায়তা এবং সার, বীজ ও কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের ওপর ভর্তুকি পাবেন,  অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে কৃষি ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন, কার্ড দেখিয়ে ন্যায্যমূল্যে বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সংগ্রহ করতে পারবেন, কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও ভর্তুকি মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সুযোগ পাবেন, শস্য ও কৃষি বীমার সুবিধা পাবেন, যা দুর্যোগকালে কৃষকের ঝুঁকি কমাবে, উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি ও প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারবেন, কৃষকেরা ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা পাবেন, উৎপাদিত কৃষিপণ্য সরাসরি বিক্রির সুবিধা পাবেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য হ্রাস পাবে, আবহাওয়ার তথ্য ও রোগ বালাই দমনের পরামর্শ পাবে এবং  ডিজিটাল ডেটাবেজ এর মাধ্যমে কৃষি সংক্রান্ত তথ্যের সংরক্ষণ ও সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। মোদ্দাকথা এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকের প্রয়োজনীয় সকল সেবা একটি ছাতার মধ্যে আসবে।

স্মার্ট কৃষি কার্ড পেতে কৃষকদের নিবন্ধন করতে হবে। এ জন্য বেশ কয়েকটি তথ্য প্রয়োজন হবে। সেগুলো হলো,এনআইডির ফটোকপি,পাসপোর্ট সাইজের ছবি,রেজিস্ট্রেশনকৃত মোবাইল নাম্বার,জমির দলিল কিংবা ভাগে চাষিদের জন্য প্রমাণপত্র,ব্যাংক বা মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্ট নম্বর।

কৃষক কার্ড পাওয়ার ধাপসমূহ হলো: সরকার স্থানীয় কৃষি অফিসের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে এই কার্ডটি পৌঁছে দেবে সরাসরি কৃষকের হাতে। এজন্য কৃষককে ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (SAAO)-এর সাথে যোগাযোগ করতে হবে কারণ তিনিই প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেন। এলাকায় যখন ‘পাইলট প্রজেক্ট’ বা মূল প্রকল্প শুরু হবে, তখন কৃষককে একটি ফরম পূরণ করতে দেওয়া হবে। অনেক ক্ষেত্রে এটি অনলাইনেও করা যাবে।এরপর কৃষকের দেওয়া তথ্য (জমির পরিমাণ, ফসলের ধরন ইত্যাদি) কৃষি অফিস থেকে সরেজমিনে যাচাই করা হবে। তথ্য সঠিক হলে সংশ্লিষ্ট কৃষকের এনআইডি এবং মোবাইল নম্বরের ভিত্তিতে একটি ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি হবে। তারপর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কৃষককে এই স্মার্ট কৃষক কার্ড প্রদান করা হবে। কৃষি স্মার্ট কার্ড নিয়ে ইতোমধ্যে সতর্কতা জারি করেছে সরকার। কর্তৃপক্ষ বলছে, কার্ডটি বিনা মূল্যে পাওয়া যাবে। কার্ডের জন্য কারো সঙ্গে কোনো প্রকার অর্থের প্রয়োজন হবে না।

পেশাগত মর্যদা মানুষের কর্মস্পৃহা বাড়িয়ে দেয়। এ কার্ড কৃষকের মর্যাদাপূর্ণ পেশাকে আরও মহিমান্বিত করবে। আগামীর বাংলাদেশ কৃষকের বাংলাদেশ হবে। কৃষক কার্ড কৃষি পেশার দেশীয় পরিমন্ডল ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক গন্ডিতে স্বীকৃতি দেবে। সেদিন দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশের প্রতিটি কৃষক স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।

লেখক: সিনিয়র তথ্য অফিসার, কৃষি মন্ত্রণালয়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

sixteen + 1 =