জাতীয় জ্বালানি রূপান্তর নীতিমালা ও ২০৫০ সালের মধ্যে ‘নেট জিরো’র দাবীতে জেটনেট-বিডির নাগরিক ইশতেহার পেশ

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমবর্ধমান চাপ কাটিয়ে উঠতে এবং জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আজ জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘১৪ দফা নাগরিক ইশতেহার’ পেশ করেছে একশনএইড বাংলাদেশ ও জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট-বিডি)।

‘জ্বালানির জন-মালিকানা: বাংলাদেশের ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর’ শীর্ষক এই ইশতেহারে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু ন্যায্যতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট-বিডি) দেশব্যাপী ১৫৫ টি নাগরিক সংঠনের একটি প্লাটফর্ম। একশনএইড বাংলাদেশ উক্ত সংগঠনের সচিবালয় (Secretariat) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার ৯৭ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে মেটানো হচ্ছে, যার ৭০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। বছরে প্রায় ১.৫ লক্ষ কোটি টাকার এই বিশাল আমদানি ব্যয় জাতীয় অর্থনীতির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। একইসাথে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকেও হুমকিতে ফেলছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে একশনএইড ও জেটনেট প্রস্তাবিতন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর ইশতেহার, ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিএবং ২০৫০ সালে নেট-জিরো কার্বন ইমিশন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে ।

নাগরিক ইশতেহারের দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: জ্বালানি খাতের সকল আইন ও পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে একটি সমন্বিত জাতীয় জ্বালানি রূপান্তর নীতিমালা প্রণয়ন করা।ব্যয়বহুল ও আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেশীয় নবায়নযোগ্য উৎস দ্বারা প্রতিস্থাপন করার মাধ্যমে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জন।শুধু বিদ্যুৎ খাত নয়, বরং কৃষি, তৈরি পোশাক, পরিবহন ও সিমেন্ট শিল্পের জন্য খাতভিত্তিক পথনকশা ও নেট-জিরো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা।স্বচ্ছতা ও সংস্কার নিশ্চিতেবিইআরসি (BERC)-কে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা এবং জ্বালানি খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রাংশ আমদানিতে আগামী ৫ বছরের জন্য শূন্য শুল্ক সুবিধা প্রদান এবং দেশীয় উদ্ভাবনকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ৫০-৩০০ গিগাওয়াট সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেওজাতীয় জ্বালানি রূপান্তর নীতিমালা ও কার্যকর পরিকল্পনার অভাবে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ইশতেহারে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পরিবর্তে দেশীয় বিশেষজ্ঞ এবং অংশীজনের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে জ্বালানি নীতি ও মহাপরিকল্পনা তৈরির ওপর জোর দেন ।

একশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্‌ কবিরের সঞ্চালনায় সাংবাদিক সম্মেলনেআইআইইএফএ (IEEFA)-র লিড অ্যানালিস্ট ও জেটনেট-বিডির উপদেষ্টা সদস্যজনাব শফিকুল আলমবাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সামগ্রিক চিত্র নিয়ে একটি পেপার উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন-এনার্জি ও বিদ্যুৎ খাতের বিদ্যমান গ্যাপগুলো তুলে ধরেন। এলএনজি, কয়লা এবং তেলের মত জীবাশ্ম জ্বালানীর উপর নির্ভরতা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে যে ঝূঁকিতে ফেলেছে, তা আরও বাড়বে যদি আমরা যথাযথ উদ্যোগ নিতে না পারি। তাছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমাতে ও সাশ্রয় বাড়াতে জ্বালানি দক্ষতার কোন বিকল্প নেই।

জনাব আবুল কালাম আজাদ, ম্যানেজার-জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন, একশনএইড বাংলাদেশ ও সদস্য সচিব, জেটনেট-বিডি নাগরিক ইশতেহারের দাবীনামা উপস্থাপন করেন।

ন্যায্য, টেকসইজ্বালানিরূপান্তরেসবাইকেএকত্রেকাজকরারআহ্বানজানিয়ে একশনএইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রিডিরেক্টরফারাহ্কবিরবলেন,

“এই রাজনৈতিক দাবিনামা সারাদেশের দেড় শতাধিক নাগরিক সংগঠন ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছে। ন্যায্য ও টেকসই জ্বালানি রূপান্তরের জন্য শক্তিশালী জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে ও স্থানীয় দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি তৃণমূল মানুষের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ জ্বালানি ঘাটতি চায় না; বরং টেকসই, দক্ষ ও জনগণকেন্দ্রিক জ্বালানি খাত গড়ে তোলারদিকে এগিয়ে যেতে হবে।

বিশেষ আলোচক হিসাবে সাংবাদিক সম্মেলনে আলোচনা করেন জেটনেট-বিডি’র উপদেষ্টামন্ডলীর জ্বালানি বিশেষজ্ঞবৃন্দ।তাদের মধ্যে- জ্বালানি ও শক্তি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আইইউবি (IUB) এর উপাচার্য ড. ম. তামিম বলেন,“বাংলাদেশকে কোনোভাবেই জ্বালানি সংকট বা জ্বালানি দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসা প্রয়োজন হলেও, এই রূপান্তর এমনভাবে পরিচালিত হতে হবে যেন জ্বালানি নিরাপত্তা ও সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত থাকে। বাংলাদেশে এখন জরুরি ভিত্তিতে একটি সুপরিকল্পিত, স্বল্প নিঃসরণভিত্তিক জ্বালানি রূপান্তর নীতি ও পথনকশা প্রয়োজন, যা এই ইস্তেহারের ১ নম্বর দাবী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটা অর্জন করা গেলে, বাস্তবসম্মতভাবে জ্বালানি চাহিদা ও জলবায়ু লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে।

বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও শুরু থেকেই একটি সমন্বিত ও সুস্পষ্ট নীতিগত কাঠামো অপরিহার্য। এমন কাঠামো তৈরি হলে বেসরকারি বিনিয়োগ স্বাভাবিকভাবেই আসবে। বর্তমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে শতকরা হিসাবের চেয়ে বাস্তবে মেগাওয়াট হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি যুক্ত করাই এখন আর বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য।”

জলবায়ূ অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের নির্বাহী জনাব জাকির হোসেন খান বলেন, “একটি পরিবেশবান্ধব ও স্মার্ট জ্বালানি রূপান্তর নীতিমালা ও পথনকশা এখন জরুরি। প্রাকৃতিক নদী ও খাল দখল বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতা থাকতে হবে, বিশেষ করে ২০৫০ সালের মধ্যে খরার ঝুঁকি বাড়ার প্রেক্ষাপটে। সরকারকে আদানি বিদ্যুৎ চুক্তি বাতিল করে দেশীয় বিনিয়োগের দিকে এগোতে হবে। বড় পরিসরের যেকোনো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিক অর্থনৈতিক ও রাজস্ব কাঠামো না থাকলে ভবিষ্যতে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে এবং দুর্নীতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।”

বিএসআরই’র সভাপতি ব্যবসায়ী মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, “রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশে সৌর জ্বালানির দাম কৃত্রিমভাবে বেশি রাখা হয়েছে। বৃহৎ সৌর প্রকল্পের জন্য ভূমি বরাদ্দ ও নবায়নযোগ্যবান্ধব গ্রিড অবকাঠামো নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যয় তুলনামূলক কম এবং বিভিন্ন স্থানে বাস্তবায়নযোগ্য হওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যৎ সরকারগুলোকে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে জ্বালানি খাতে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর খসরু মোহাম্মদ সেলিম বলেন, “বাংলাদেশে ভূমির স্বল্পতার কারণে বৃহৎ পরিসরের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন। এ কারণে কমিউনিটিভিত্তিক, বিকেন্দ্রীভূত ও ক্ষুদ্র পরিসরের জ্বালানি সমাধানের দিকে যেতে হবে। যেমন- কমিউনিটি গ্রিড, সৌরচালিত ইলেকট্রিক চার্জিং স্টেশন ও সৌর সেচ ব্যবস্থা ইত্যাদি। এসব উদ্যোগে কম বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়, স্থানীয় জনবল বিশেষত নারীরা যুক্ত হতে পারেন। এর জন্য নেট মিটারিং সরবরাহকে আরো সহজলভ্য করতে হবে এবং এ ব্যাপারে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

সমাপনী বক্তব্যে বুয়েট-এর সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন,“জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে অর্থনৈতিক চাপ কমানোর একমাত্র টেকসই পথ হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি। সৌর, বায়ু ও বায়োমাস নির্ভরযোগ্য সমাধান দিতে পারে, এবং গ্রিড প্যারিটি ইতোমধ্যে অর্জিত হওয়ায় আগামী ২০৩৫ সাল পর্যন্ত জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক নতুন কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজন নেই। সৌর ও বাযূ জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দিলে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হতে পারবে। সেক্ষেত্রে, ২০৫০ সাল নাগাদ নেট-জিরো কার্বন এমিশনে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা যায়।”

উক্ত অনুষ্ঠানে জেটনেট-বিডি-র সদস্য সংগঠন নেকমের প্রধান নির্বাহী জনাব মনজুরুল হান্নান খান, পরিবেশ রক্ষা উন্নয়ন সোসাইটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইন, যুব সংগঠন সুর্যোদয়ের রায়হান নোমান নূরনবী সহঅন্যান সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের সঞ্চালকএকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টরফারাহ্ কবিরজানান, একশনএইড ও জেটনেট-বিডি উপস্থাপিত ন্যায্যজ্বালানি রূপান্তর নাগরিক ইস্তেহার ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে হস্তান্তর করবেন। পাশাপাশি জেটনেট-বিডি’র সদস্যদের মাধ্যমে সারাদেশের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। জেটনেট-বিডি’র সদস্যবৃন্দ প্রত্যাশা করেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে এই ইস্তেহার বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি নীতিতে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

five × four =