
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থের রেকট্যাঙ্গুলার স্টেডিয়ামে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বাংলাদেশের গর্বিত মেয়েরা লড়াই করেও উজবেকিস্তানের কাছে ০-৪ গোলে হেরে মাথা উঁচু করেই বিদায় নিয়েছে। সিডনিতে অনুষ্ঠিত আগের দুই ম্যাচে বাংলাদেশ চীনের কাছে ০-২ আর উত্তর কোরিয়ার কাছে ০-৫ গোলে পরাজিত হয়েছিল। স্মরণীয় যে বাংলাদেশ এবারেই প্রথম বারের মত নিজেদের যোগ্যতার ভিত্তিতে এশিয়ার ১২ দলের একটি হয়ে এশিয়ান কাপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে।
গ্রুপের তিনটি দল বাংলাদেশের তুলনায় খেলার দক্ষতা, কৌশল, অভিজ্ঞতা, শারীরিক সক্ষমতায় যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে তরুণ দলটি অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়েও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ দলগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে সেটিও কিন্তু কম অর্জন নয়। স্মরণ করুন ৩, ৬, ৯ তারিখে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যাবধানে বাংলাদেশকে তিন প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অজানা পরিবেশে খেলতে হয়েছে। প্রাপ্তি বিবেচনায় একেবারে সামান্য বলার অবকাশ নেই। ভেবে দেখুন বাংলাদেশের থেকে অনেক বেশি প্রস্তুতি নিয়ে খেলা ভারত একটি ম্যাচেই জাপানের বিরুদ্ধে ১১ গোল হজম করে বিপর্যস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ ছিল টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়ন চীনের বিরুদ্ধে। সেই অসম যুদ্ধে বাংলাদেশ প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই করে ০-২ হেরে বাংলাদেশিদের প্রত্যাশার পারদ উর্ধমুখী করেছিল। বাংলার বাঘিনী ঋতুপর্ণা চাকমার দূরপাল্লার গোলমুখী রেইনবো শট দীর্ঘদেহি চীনের গোলরক্ষক প্রতিহত না করলে হতে পারতো টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোল। বিশ্বমঞ্চে প্রথম আবির্ভাবেই গর্বিত করেছিল বাংলাদেশ। ম্যাচে চমক ছিল প্রথম চয়েস গোলকিপার রূপনা চাকমার পরিবর্তে প্রথমবারের মত খেলা মিলির অতিমানবীয় দক্ষতা। মিলি অন্তত এক ডজন গোল নিজের ক্ষিপ্রতায় প্রতিহত করেছিল।
দ্বিতীয় ম্যাচের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বিশ্বমানের উত্তর কোরিয়া দল। ওদের আগ্রাসী উন্নত কৌশল আর দক্ষতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যর্থ হয়ে ০-৫ গোলে পরাজিত হলেও সাধ্যের সবটুকু দিয়েই খেলেছে বাংলার মেয়েরা। এই ম্যাচেও অনন্য ছিল মিলি। একটি বিশ্বমানের দলের বিরুদ্ধে সামান্য প্রস্তুতি নিয়ে খেলতে আশা স্বল্প অভিজ্ঞ তরুণ দল ৯০ মিনিট লড়াই করে পরাজয়ের ব্যাবধান সীমিত করা ছিল সাধ্যের অতিরিক্ত। এই ম্যাচে পেনাল্টি গোল খাওয়ায় প্রতিরোধের দেয়াল ভেঙে পড়েছিল। সারাক্ষণ প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামাল দেওয়া আর মধ্যমাঠে সমন্বয় এলোমেলো হয়ে পড়ে কাউন্টার এটাক করতে পারেনি বাংলাদেশ।
অবশেষে কাল ছিল শেষ ম্যাচ চীন, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কিছুটা কম শক্তির পশ্চিম এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তান। কাল কিন্তু বাংলাদেশ আগের ম্যাচের ধকল হজম করে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করেছে। ম্যাচের শুরুতে ১০ মিনিট ০-১ পিছিয়ে পড়ার পড়ে বার বার প্রতি আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। প্রথম ম্যাচের মত কাল ঋতুপর্ণা চাকমার আরো একটি দূরপাল্লার গোলমুখী দুর্দান্ত শট উজবেক গোল রক্ষক অসামান্য দক্ষতায় প্রতিহত না করলে প্রথমার্ধ ১-১ শেষ হতো। দ্বিতীয়ার্ধেও বাংলাদেশ আক্রমণ করেছে গোলের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু দক্ষ গোলদাতার অভাবে গোল পায়নি। উপরন্তু উজবেক দলের সুযোগ সন্ধানী দক্ষ গোলদাতারা আরো ৩ গোল করে ৪-০ ব্যাবধানে ম্যাচ জিতেছে। বাটলার হয়ত শেষ দিকে সাগরিকা, আলপির মত উদীয়মান তরুণদের দিয়ে গ্যাম্বেল করতে পারতো।
আমি বাংলাদেশের মেয়েদের উৎসাহ, শক্তিশালী প্রতিপক্ষ দলগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিকতাকে সাধুবাদ জানাই। বাংলাদেশে নারী ফুটবলের অবকাঠামো বলতে কি আছে সেগুলো এই টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া বাকি ১১ দলের কাছে লজ্জাকর ভাবেই অপ্রতুল। এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট খেলার আগে বিএফএফ দলটির জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম প্রস্তুতির ব্যবস্থা রাখেনি। কোচ খেলোয়াড় দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের সেরা ৫ জন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের দলে নেওয়া হয়নি।
তবুও ১৯ বছরের গড় বয়সী দল সৃজনশীল ফুটবল খেলে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের আগমনী করেছে। বিএফএফ প্রেসিডেন্ট তাবিথ আউয়াল স্বয়ং উপস্থিত থেকে খেলা দেখেছেন। আশা করি এই মুহূর্তে এগিয়ে যাওয়ার জন্য দেশে নারী ফুটবল অবকাঠামোর খোল-নলচে পাল্টে ফেলা হবে। দেশে নিয়মিত লীগ অনুষ্ঠান। শক্তিশালী বিদেশি দলগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত খেলার ব্যবস্থা করা।
প্রমাণ হয়েছে যথাযথ প্রণোদনা পেলে বাংলার মেয়েরা অচিরেই বিশ্বে ফুটবল মাতম তুলবে। মিলি, শিউলি, আফাইদা, মনিকা, মারিয়া, রিতু, আনিকাদের দেখে বাংলাদেশ এবং প্রবাসে থাকা অনেক নারী ফুটবলার বাংলাদেশের হয়ে আগ্রহী হয়ে উঠবে।
আমি নারীদের জন্য অন্তত একটি বিশ্বমানের ফুটবল স্টেডিয়াম এবং স্পোর্টস কমপ্লেক্স স্থাপন করার জন্য সুপারিশ করছি। কলসিন্দুর থেকে সিডনি বাংলাদেশ ফুটবল যাত্রা নিয়ে অনেক আশাবাদী হবার কারণ রয়েছে।