বিভাজনের রাজনীতি তখনও, এখনও—ইতিহাস কি সত্যিই বদলেছে?

২০ জুন ১৯৪৭ থেকে ২০২৬

১৯৪৭: বিভাজনের জন্ম—পরিকল্পিত অপরাধের রাজনৈতিক দলিল

ভূমিকা

২০ জুন ১৯৪৭-কে বহু পাঠ্যবই প্রায়শই “ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত” হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল বহু বছরের পরিকল্পিত রাজনৈতিক অপরাধের চূড়ান্ত ধাপ। বিভাজন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আকস্মিক সংঘর্ষের ফলাফল নয়; বরং এটি ছিল উপনিবেশিক শাসক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ধর্মভিত্তিক স্বার্থের একটি মিলিত নকশা।

যদি আমরা ইতিহাসকে আদালতে তুলি, ২০ জুন ১৯৪৭ হবে সেই মামলার রায় ঘোষণার দিন—যেখানে সাধারণ মানুষ ছিল অনুপস্থিত, অথচ কোটি কোটি মানুষ তা ভোগ করছে তার শাস্তি।। এই ঘটনা শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি ছিল গণতন্ত্রের নামে অভিজাততন্ত্রের প্রয়োগ, যা বহু প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছে।

কুকীর্তি–১: ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতিকে সাংবিধানিক অস্ত্রে রূপান্তর

১৯০৫ সালে Lord Curzon, ভারতের ভাইসরয় এবং অন্যান্য ব্রিটিশ প্রশাসকরা প্রথম বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেন। তাদের লক্ষ্য ছিল ভারতকে সহজে শাসনযোগ্য করে তোলা এবং রাজনৈতিক শক্তি কেন্দ্রীভূত রাখা। এই বিভাজন শুধু ভূগোল নয়, বরং সামাজিক মনস্তত্ত্বেরও প্রতিফলন ছিল। ব্রিটিশরা ধর্মভিত্তিক বিভাজনের নীতি ব্যবহার করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ভাঙার চেষ্টা করেছিল।

এরপর, ১৯০৯ সালে Morley–Minto Reforms, Communal Award এবং ১৯৩৫ সালে Government of India Act প্রণয়নের মাধ্যমে জনগণকে নাগরিক হিসেবে নয় বরং ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠী হিসেবে রাষ্ট্রের সামনে হাজির করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের নামে সাম্প্রদায়িক সংখ্যাতত্ত্ব চালু করা হয়, যা পরবর্তীতে বিভাজনের সাংবিধানিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতার লোভ ও উপনিবেশিক স্বার্থকে রক্ষা করা, যেখানে স্থানীয় জনগণ শুধু বস্তু হিসেবে বিবেচিত হয়।

কুকীর্তি–২: বাংলার জনগণকে প্রশ্ন না করা—গণভোটহীন সিদ্ধান্ত

১৯৪৭ সালের জুনে বাংলা ভাগের সিদ্ধান্তে সাধারণ জনগণকে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়। A.K. Fazlul Huq, বঙ্গপ্রিমিয়ার এবং ব্রিটিশ কর্মকর্তারা জানতেন, জনগণ অখণ্ড বাংলার পক্ষে থাকবে। সেইজন্য অভিজাতরা নিজের সুবিধামতো মানচিত্র তৈরি করে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রাখে।

এই প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্রের সরাসরি হত্যার সাক্ষ্য পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষকে প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার মাধ্যমে অভিজাতরা রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করে এবং ধর্মভিত্তিক বিভাজনের পথ সুগম করে। ফলে, বাংলার সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ চরমভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়।

কুকীর্তি–৩: Cabinet Mission Plan—শেষ আশার ইচ্ছাকৃত হত্যা

১৬ মে ১৯৪৬-এ Cabinet Mission Plan ছিল ভারতের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই পরিকল্পনা ভারতকে একটি শিথিল ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে রাখার চেষ্টা করেছিল, যেখানে বাংলা অখণ্ড থাকতে পারত। বাস্তবিকভাবে এটি সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের একটি সুযোগ ছিল।

কিন্তু জওহরলাল নেহরু ঘোষণা করেন যে কংগ্রেস ভবিষ্যতে এই পরিকল্পনার কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না। মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ও বুঝতে পারেন যে পরিকল্পনা কার্যকর হলে পাকিস্তানের যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে উভয় পক্ষই পরিকল্পনাটি ব্যর্থ করে। এটি কোনো ব্যর্থতা ছিল না; এটি ছিল রাজনৈতিক স্বার্থে সহাবস্থানের ইচ্ছাকৃত হত্যার প্রক্রিয়া।

কুকীর্তি–৪: Direct Action Day—মানুষের লাশে রাজনীতির সিঁড়ি

১৬ আগস্ট ১৯৪৬-এ কলকাতায় Direct Action Day উদযাপন হয়। এই সিদ্ধান্তে নেতৃত্ব দেয় H.S. Suhrawardy, Muslim League-এর স্থানীয় নেতা এবং ব্রিটিশ প্রশাসন। এই দিনে কলকাতা রক্তে ভেসে যায়; সহিংসতা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ ছিল না। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা, পরিকল্পিত উস্কানি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবহেলা মিলিতভাবে হাজার হাজার মানুষের জীবন কেড়ে নেয়।

পরবর্তীতে এই সহিংসতাকে বিভাজনের যৌক্তিকতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়—“দেখুন, একসঙ্গে থাকা যায় না।” এখানে সাধারণ মানুষ কেবল একটি উপকরণ; তাদের জীবন রাজনৈতিক কৌশলের জন্য তুচ্ছ হয়ে যায়। এই ঘটনা পরবর্তীতে পশ্চিম ও পূর্ব বাংলার বিভাজনের নীতিকে দৃঢ় করার জন্য ব্যবহৃত হয়।

কুকীর্তি–৫: র‍্যাডক্লিফ লাইন—অজ্ঞতা নয়, নৈতিক অবহেলা

১৯৪৭ সালের জুনে Sir Cyril Radcliffe এবং Lord Mountbatten-কে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সীমান্ত নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। Radcliffe ভারত বা বাংলা আগে কখনো দেখেননি। সীমান্তের অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত কোটি কোটি মানুষের জীবনে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে।

ফলস্বরূপ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়, এবং আদিবাসী ও বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানে চলে যায়। এটি সাধারণ প্রশাসনিক ভুল নয়, বরং রাজনৈতিক চাপ এবং নৈতিক অবহেলার ফলাফল। স্থানীয় জনগণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ—সবই রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়।

কুকীর্তি–৬: ২০ জুন ১৯৪৭—জনগণ ছাড়া জনগণের রায়

২০ জুন ১৯৪৭-এ Bengal Legislative Assembly-এর সদস্যরা বাংলা দ্বিখণ্ডনের সিদ্ধান্ত নেন। সাধারণ মানুষ ভোট প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়। অভিজাতরা নিজের সুবিধামতো মানচিত্র এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে।

ফলস্বরূপ লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়, পরিবার ভেঙে যায় এবং সামাজিক বুনন ধ্বংস হয়। এটি গণতন্ত্রের নামে অভিজাততন্ত্রের চরম উদাহরণ। সাধারণ জনগণ সিদ্ধান্তের বাইরে থাকায় তাদের জীবন ও অধিকারকে উপেক্ষা করা হয়।

কুকীর্তি–৭: পূর্ব বাংলার উপর অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ

পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পরও পূর্ব বাংলা প্রকৃত স্বাধীনতা পায়নি। পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রিক প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা রাষ্ট্রভাষা উর্দু চাপিয়ে দেন, সম্পদ শোষণ করেন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রাখেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করে যে, ১৯৪৭ ছিল মুক্তির বছর নয়, বরং নতুন শৃঙ্খলের সূচনা। পূর্ব বাংলার মানুষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই প্রক্রিয়া দেখায় যে, বিভাজনের প্রভাব শুধু ভূগোল নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত।

কুকীর্তি–৮: ইতিহাস বিকৃতি ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি

ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং শিক্ষাবোর্ড সুবিধামতো ইতিহাস লিখে প্রজন্ম বিভ্রান্ত করেছে। বিভাজনের দায় চাপানো হয়েছে একে অপরের উপর; ব্রিটিশদের দোষ চাপানো হয়েছে, কখনো সাম্প্রদায়িক শত্রুকে দোষারোপ করা হয়েছে।

তথ্য বিকৃতি এবং স্বার্থান্বেষী ইতিহাস শিক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়েছে। এটি দেখায় যে, বিভাজনকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকার না করা হলে ইতিহাস নিজেই পুনরাবৃত্তি করবে।

কুকীর্তি–৯: ২০২৬ সালে বিভাজনের আধুনিক রূপ

২০২৬ সালে, সমাজে দেশভাগ নেই, কিন্তু সামাজিক বিভাজন প্রবল। নাগরিকত্ব, ধর্ম, ভাষা এবং পরিচয় আবার রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব সমাজকে বিভাজিত করে ক্ষমতা এবং প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

১৯৪৭-এর দর্শন আধুনিক ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে; অর্থাৎ সময় বদলেছে, তবে বিভাজনের নীতি অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। ইতিহাস ও সামাজিক কাঠামোতে এই প্রভাব এখনও শক্তিশালী।

কুকীর্তি–১০: সীমান্ত সংক্রান্ত উদ্বাস্তু সমস্যা

সীমান্ত নির্ধারণের পর, Sir Cyril Radcliffe, ব্রিটিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় পাকিস্তানি ও ভারতীয় প্রশাসকরা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হন। লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়, বসতি ও সম্পদ হারায়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট গভীর হয়।

সীমান্ত কেবল রাজনৈতিক নয়, মানুষের জীবন ও সম্পদের উপরও স্থায়ী প্রভাব ফেলে। এটি দেখায় যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় মানুষের জীবনকে প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়।

কুকীর্তি–১১: ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় প্রভাব

১৯৪০–১৯৪৭ সালের মধ্যে Muhammad Ali Jinnah, Jawaharlal Nehru, Subhas Chandra Bose ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। Jinnah পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, Nehru কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছিলেন, আর Bose পশ্চিম বাংলার স্বার্থ রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।

ফলস্বরূপ, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক কৌশল নির্বাচনী এবং প্রশাসনিক প্রভাব বাড়াতে ব্যবহার হয়। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কুকীর্তি–১২: অর্থনৈতিক সম্পদ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করা

পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এবং ভারতীয় প্রশাসকরা পূর্ব বাংলার শিল্প, বাণিজ্য ও সংস্থান কেন্দ্রীভূত করেন। এতে পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক দুর্বলতা বৃদ্ধি পায়, এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীভূত হয়।

এই প্রক্রিয়া দেখায় যে বিভাজন কেবল রাজনৈতিক ও ভূগোলিক নয়, বরং অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

উপসংহার

২০ জুন ১৯৪৭ থেকে আজ ২০২৬—দেখা যায়, বিভাজন শেষ হয়নি, শুধু তার রূপ বদলেছে। সেই দিনে যে ভুলগুলি সংঘটিত হয়েছিল, তার প্রভাব আজও আমাদের সমাজে দৃঢ়। ইতিহাস থেকে আমরা যদি শিক্ষা না নিই, এই বিভাজনের নীতিই বারবার পুনরাবৃত্তি হতে পারে।

এটি শুধু মানচিত্রের পরিবর্তনের গল্প নয়। এটি আমাদের সমাজ, রাজনৈতিক কাঠামো, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির ওপর যে ক্ষতি করেছে—তারও গল্প। আগামী প্রজন্মের জন্য একমাত্র উপায় হলো, সাহসিকতার সঙ্গে এই বিভাজনকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকার করা এবং ভুলগুলি থেকে শিক্ষা নেওয়া। শুধুমাত্র তখনই আমরা এক নতুন, সমন্বিত এবং ন্যায়সম্মত সমাজ গড়তে পারব।

লেখক, সংগ্রাহক ও গবেষক: হক মো. ইমদাদুল, জাপান

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

12 − eleven =