২০২৫ সালে পৃথিবীতে আটকে থাকা তাপের রেকর্ড

২০২৫ সালে পৃথিবীতে আটকে থাকা তাপের পরিমাণ রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে। এর প্রভাব হাজার হাজার বছর স্থায়ী হতে পারে বলে সোমবার সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। খবর বাসস

জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ু সংস্থা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) তাদের প্রধান বার্ষিক প্রতিবেদন ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ক্লাইমেট’— এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এতে বলা হয়, ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ ১১টি বছরই ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে। এএফপি।

ডব্লিউএমও জানায়, গত বছরটি রেকর্ড অনুযায়ী দ্বিতীয় বা তৃতীয় উষ্ণতম বছর ছিল। ১৮৫০-১৯০০ সময়ের গড়ের তুলনায় ওই বছর তাপমাত্রা ছিল প্রায় ১ দশমিক ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘বৈশ্বিক জলবায়ু এখন জরুরি অবস্থায় রয়েছে। পৃথিবীকে তার সীমানার বাইরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। জলবায়ুর প্রতিটি প্রধান সূচকই লাল সংকেত দেখাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘মানবজাতি টানা ১১টি উষ্ণতম বছর পার করেছে। ইতিহাস যদি ১১ বার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে, তা আর কাকতালীয় নয়। এটি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান।’

প্রথমবারের মতো ডব্লিউএমও’র এই প্রতিবেদনে পৃথিবীর ‘এনার্জি ইমব্যালান্স’ বা শক্তির ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি পৃথিবীতে প্রবেশ করা ও বের হয়ে যাওয়া শক্তির হারের পার্থক্য নির্দেশ করে।

জেনেভাভিত্তিক সংস্থাটি জানায়, স্থিতিশীল জলবায়ুতে সূর্য থেকে আসা শক্তি ও বের হয়ে যাওয়া শক্তির পরিমাণ প্রায় সমান থাকে।

কিন্তু কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের মতো তাপ ধারণকারী গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব কমপক্ষে ৮ লাখ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোয় এই ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।

ডব্লিউএমও জানায়, ‘১৯৬০ সালে পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে, পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্যহীনতা বেড়েই চলেছে, বিশেষ করে গত ২০ বছরে। ২০২৫ সালে এটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়।’

ডব্লিউএমও প্রধান সেলেস্তে সাউলো বলেন, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ফলে এই ভারসাম্যহীনতা ও এর প্রভাব সম্পর্কে বোঝাপড়া বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘মানুষের কর্মকাণ্ড প্রাকৃতিক ভারসাম্য ক্রমেই নষ্ট করছে। এর প্রভাব শত শত থেকে হাজার বছর পর্যন্ত বহন করতে হবে।’ অতিরিক্ত তাপের ৯১ শতাংশের বেশি সাগরে জমা হচ্ছে।

ডব্লিউএমও জানায়, ‘২০২৫ সালে সমুদ্রের তাপমাত্রা নতুন রেকর্ডে পৌঁছেছে। ১৯৬০-২০০৫ সময়ের তুলনায় ২০০৫-২০২৫ সময়ে উষ্ণতা বৃদ্ধির হার দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।’

সংস্থাটি জানায়, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি সামুদ্রিক প্রতিবেশের অবনতি, জীববৈচিত্র্য হ্রাস ও কার্বন শোষণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

এটি উষ্ণ ও উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় ঝড়কে শক্তিশালী করে। মেরু অঞ্চলের সমুদ্রের বরফ গলনও ত্বরান্বিত করে। অ্যান্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডের বরফের স্তর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে।

২০২৫ সালে আর্কটিক সাগরের বরফের বার্ষিক গড় বিস্তৃতি উপগ্রহ যুগে সর্বনিম্ন বা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন ছিল।

১৯৯৩ সালে স্যাটেলাইট পরিমাপ শুরু হওয়ার পর থেকে গত বছর বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা প্রায় ১১ সেন্টিমিটার বেড়েছে।

সমুদ্র উষ্ণতা বৃদ্ধি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়া শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলতে পারে।

ডব্লিউএমওর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জন কেনেডি বলেন, বৈশ্বিক আবহাওয়া এখনও লা নিনার প্রভাবে রয়েছে। এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি, যা প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের মধ্য ও পূর্ব অংশে পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়।

এতে বাতাস, চাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরণে পরিবর্তন আসে। লা নিনা ও এর বিপরীত উষ্ণ প্রবণতা এল নিনোর মধ্যে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন ঘটে। মাঝখানে থাকে নিরপেক্ষ অবস্থা।

রেকর্ড উষ্ণতম বছর ২০২৪ সালে তাপমাত্রা ১৮৫০-১৯০০ সময়ের গড়ের চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। ওই বছরটি শক্তিশালী এল নিনোর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল।

কেনেডি জানান, পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নিরপেক্ষ অবস্থা বিরাজ করতে পারে। বছরের শেষের দিকে এল নিনো গড়ে উঠতে পারে।

তিনি বলেন, ‘এটি হলে ২০২৭ সালে আবারও উচ্চ তাপমাত্রা দেখা যেতে পারে।’

ডব্লিউএমওর উপ-প্রধান কো ব্যারেট বলেন, ভবিষ্যৎ চিত্র ভয়াবহ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 × 2 =