উৎপলা সেন: এ প্রজন্মের কজন চেনেন

অলকানন্দা মালা

পঞ্চাশ ষাটের দশকে ভারতীয় সঙ্গীতাঙ্গনের রানীর আসনটি ছিল উৎপলা সেনের। হিন্দি বাংলা দুই ভাষায়ই গান গেয়ে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন। কিশোর কুমার তাকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করতেন। উত্তম কুমার মন ভালো করতেন তার গান শুনে।

উৎপলা সেন ঢাকার মেয়ে। ১৯৪২ সালের ১২ মার্চ ঢাকার রায় বাহাদুর পরিবারে প্রফুল্ল কুমার ঘোষের ঔরসে হীরণবালার কোলজুড়ে আসেন উৎপলা। সুন্দর মুখ নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন। রায় বাহাদুর ঠাকুরের মনে হয়েছিল পদ্ম ফুলের মতো সুন্দর। তাই হয়তো নাতনির নাম রেখেছিলেন উৎপলা। যার অর্থ নীল পদ্মফুল। মা হীরনবালা ছিলেন একজন সঙ্গীত সাধক। আনন্দময়ী মায়ের আট সখীর একজন। ঘরের বাইরে যেতে হয়নি উৎপলাকে, মায়ের কাছেই হয় সঙ্গীতে হাতেখড়ি। ঘর থেকে যেমন সঙ্গীতের শুরু হয়েছিল তেমনই রুদ্ধ করার চেষ্টাও ওই ঘর থেকেই হয়েছিল। মেয়েদের বাইরে গান করা মোটেই পছন্দ ছিল না উৎপলার বাবার। একই কারণে স্ত্রীর গানও বন্ধ করেছিলেন। মেয়ের ক্ষেত্রেও জারি করেছিলেন একই নিয়ম। গান করার অপরাধে স্কুল থেকেও বিতাড়িত করা হয়েছিল উৎপলাকে। ওই বয়সেই কণ্ঠের জোরেই ফিরেছিলেন। উৎপলার গানের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছিল স্টেটসম্যান কাগজে। তাই দেখে ভুল ভাঙে শিক্ষকদের। স্কুলে ফিরিয়ে আনেন গুণী ছাত্রীকে।

ঘরেই হাতেখড়ি, বাইরে তালিম

মায়ের কাছে সঙ্গীতে হাতেখড়ি হলেও পরে উৎপলা সেন তালিম নেন সুধীরলাল চক্রবর্তীর কাছে। তবে সুধীর চক্রবর্তী বাংলাদেশে থাকেননি। ১৯৪০-৪১ সালের দিকে পাড়ি দেন কলকাতায়। গুরুর সঙ্গে বিচ্ছেদ পর্ব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি উৎপলার। এর কিছুদিন পর পরিবারসহ তিনিও ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় থিতু হন। এদিকে কলকাতায় ভাগ্য খোলে সুধীরলালের। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান তিনি। বেতার সিনেমা রেকর্ড সব জায়গায় নাম লেখাতে থাকেন। গুরুর যখন রমরমা অবস্থা তখন বসে ছিলেন না ছাত্রী উৎপলাও। তিনিও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইতে থাকেন।

গুরুর হাতে নতুন শুরু

গুরু সুধীরলালের হাত ধরেই প্রথম গান রেকর্ড হয় উৎপলার। সে ১৯৪৩ সালের ঘটনা। ‘দূরে গেলে মরে মনের হবে না জানি’ শিরোনামের সে গানে সুর দিয়েছিলেন সুধীরলাল। কথা লিখেছিলেন বিষ্ণু রঞ্জন ভাদুড়ি। ওই গান দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে সঙ্গীত অঙ্গনে যাত্রা শুরু করেন  গায়িকা। শুরুর দিকে ভক্তিমূলক গানে উৎপলার উৎসাহ ছিল বেশি। তবে গণ্ডিবদ্ধ থাকেননি। এর অল্প কিছুদিন পরেই ডাক পড়ে সিনেমা থেকে। ‘মাই সিস্টার’ নামে একটি সিনেমায় গান করার সুযোগ পান। জনপ্রিয়তা অর্জন করতে বেশি সময় লাগেনি। সিনেমাটিতে তার গাওয়া গান শ্রোতাপ্রিয় হয়েছিল।

মুগ্ধ এক ইঞ্জিনিয়ার

উৎপলা যখন শ্রোতার মন ভরিয়ে দিচ্ছেন, তখন তাকে মনে ঠাঁই দেন কর্পোরেশনের এক ইঞ্জিনিয়ার। নাম রেনু সেন। উৎপলা সেনের উচ্ছলতা মুগ্ধ করেছিল বেনুকে। তাই শুভ কাজে দেরি করেননি। বিয়ে করেন তারা। বিয়ের পর সংসারে মন দিলেও সঙ্গীতের সঙ্গে সম্পর্ক আগের মতোই ছিল। স্বামী বেনুরও যথেষ্ট সহযোগিতা ছিল। ফলে সংসার ও সঙ্গীত দুটোই এক সঙ্গে চলতে থাকে উৎপলার। তবে তার স্বামী বেশি আয়ু পাননি। ততদিনে এক সন্তানের মা গায়িকা। স্বামীর মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন একা ছিলেন। তবে তার একা জীবন মেনে নিতে পারছিলেন না তার শাশুড়ি। পুত্রবধূকে অন্যত্র বিয়ে দিতে চেষ্টা করছিলেন। অল্প বয়সে বৈধব্য বরণ করাটা নারীর জন্য যে কি কষ্টকর তাও উপলব্ধি করেছিলেন উৎপলার শাশুড়ি। এখানেই তিনি ব্যতিক্রম। অল্প বয়সে সন্তান হারিয়ে কোথায় ছেলের স্ত্রীকে অপয়া বলে আখ্যা দেবেন তা না, উল্টো নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দিয়েছিলেন বিয়ে। পাত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন উৎপলার সহশিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায়কে।

যে কথাগুলো বলা দরকার

এখানে একটু কথা আছে। সতীনাথ ছিলেন উৎপলার গুরু। ১৯৫২ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গায়িকার গুরু সুধীরলাল। গুরুর মৃত্যুতে মুষড়ে পড়েছিলেন উৎপলা। তবে ভেঙে পড়েননি। শোক কাটিয়ে সতীনাথের কাছে পাঠ নিতে থাকেন সঙ্গীতের। ধীরে ধীরে গুরু শিষ্যের মধ্যে তৈরি হয় ভালো একটি বোঝাপড়া। তার সুর করা একাধিক গান জনপ্রিয়তা অর্জন করে উৎপলার কণ্ঠে। ফলে একসঙ্গে কাজের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। পেশাগত সম্পর্কটি মোড় নেয় ব্যক্তিগত দিকে। ধীরে ধীরে সতীনাথের প্রতি ভীষণ রকম দুর্বল হয়ে পড়েন উৎপলা। এ সময় এগিয়ে আসেন তার শাশুড়ি।

ইচ্ছা জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন সতীনাথ

এদিকে আগের ঘরে আশীষ নামে এক পুত্র সন্তান ছিল উৎপলার। ছেলেকে নিয়েই সতীনাথের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। সতীনাথও আপত্তি করেননি বরং নিজের ছেলে হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। স্ত্রীর আগের ঘরের সন্তানের জন্য জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন নিজের শখ পর্যন্ত। মেয়ে সন্তানের কণ্ঠে বাবা ডাক শোনার বড় শখ ছিল সতীনাথের। কিন্তু আশীষের দিকে চেয়ে নিজের ইচ্ছা ত্যাগ করেন। নিজের সন্তান হলে আশীষের ভাগে যদি ভালোবাসা কম পড়ে! তাই ভেবে কখনও বাবা হননি। স্ত্রী উৎপলা ও তার সন্তানের সুখের সবটাই ব্যবস্থা করেছিলেন সতীনাথ। আগের পক্ষের ছেলেকে নিজ হাতে রান্না করে পর্যন্ত খাইয়েছেন। এমনকি আশিষকে যখন বিয়ে করান পুত্রবধূ পারমিতাকেও গ্রহণ করেছিলেন মেয়ে হিসেবে। বলেছিলেন মেয়ে এলো ঘরে। সব মিলিয়ে সুখের ছিল উৎপলা সেনের ঘর। কিন্তু কথায় আছে সুখ বেশিদিন সয় না ভাগ্যে। বিখ্যাত এই গায়িকার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ১৯৯২ সালের ১৩ ডিসেম্বর সুখের যবনিকা ঘটে এ গায়িকার। সেদিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সতীনাথ। এটি ছিল উৎপলা সেনের গায়িকা সত্ত্বারও মৃত্যু। কেননা এরপর আর কণ্ঠে সুর তোলেননি উৎপলা। সতীনাথের চলে যাওয়ার পর তার ভালোবাসার স্থান আর কেউ পূর্ণ করতে পারেনি। যতটা যত্নে তিনি রেখেছিলেন উৎপলা সেনকে ততটা যত্ন আর কেউ নিতে পারেনি তার।

সঙ্গীতে উৎপলা-সতীনাথ

ব্যক্তিগত জীবনের মতো পেশাগত জীবনও জমেছিল উৎপলা ও সতীনাথের। ষাটের দশকে দুজনের গান এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে তাদের বলা হতো বাংলা গানের উত্তম সুচিত্রা। এ জুটির একটি জনপ্রিয় গান ‘ভাগ্যের চাকাটা তো ঘুরছে, ভাগ্যের চাকাটা তো ঘুরবে’। ১৯৮০ সালে ‘ভাগ্যচক্রে’ নামের একটি ছবিতে গেয়েছিলেন উৎপলা ও সতীনাথ। সিনেমা ফ্লপ হলেও নিরাশ করেননি উৎপলা ও সতীনাথ। তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল গানটি।

শেষ বার আলোচনায়

শেষবার উৎপলা সেন আলোচনায় এসে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। সতীনাথের মৃত্যুর পর গান থামিয়ে দেওয়ায় আলোচনা ছিলেন না তিনি। চাপা পড়ে গিয়েছিল তার নাম। শরীরে কর্কট রোগ বাসা বাঁধলে চিকিৎসকের কাছে আসেন। চেহারা দেখেও চিকিৎসক চিনতে পারেননি। তবে চোখ আটকে গিয়েছিল উৎপলা সেন নামে। চমকে গিয়েছিলেন ডাক্তার। এই সেই উৎপলা সেন। নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না চিকিৎসক। খবর পাঁচ কান হতে সময় নেয়নি। চারদিকে চাউর হয়ে যায় তার অসুস্থতার কথা। অনটনের কথা। শিল্পীরাও বসে থাকেননি। ২০০৫ সালে এক হন কলকাতার সব সঙ্গীতশিল্পীরা। নির্মলা মিশ্র থেকে লোপামুদ্রা মিত্র সবাই এগিয়ে আসেন প্রখ্যাত এ কণ্ঠশিল্পীর জন্য। চারিটি শো করে তোলা হয় টাকা। কিন্তু তাতে কি আর ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ মেটে। ফলে শেষ পর্যন্ত অনাদরেই কেটেছে দিনগুলো। কাবু করে দিয়েছিল তাকে। খেয়ে নিয়েছিল আয়ু শক্তি। ফলে পিজি হাসপাতালের বেডে ২০০৫ সালের ১৩ মে কষ্টে ও অবহেলায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গায়িকা।

উৎপলার ভক্ত উত্তম-সুচিত্রা

ডাক সাইটে সব মানুষের সঙ্গে উৎপলার সখ্যতা ছিল। মহানায়ক উত্তম কুমার তো ছিলেন তার ‘আমি তোমায় ছাড়া আর কিছু হায় ভাবতে পারি না’ গানটির ভক্ত। ক্লান্ত শরীরে শুটিং শেষে বাড়ি ফিরে মাঝে মাঝেই উৎপলা সেনকে ফোন করে বলতেন উৎপলা গানটা শোনাও না। কিশোরকুমার তো করেছিলেন পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম। বলেছিলেন, দিদি, আপনার ‘এক হাতে মোর পূজার থালা’ গানটা আমার বাড়ির লাইব্রেরির কালেকশনে আছে। মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের বড় ইচ্ছা ছিল তার গানে ঠোঁট মেলানোর। বিশেষ করে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানটি। তবে সেটি সত্য হয়ে ধরা দেয়নি। হিন্দি সিনেমায় তার কণ্ঠ দাপট দেখালেও বাংলা সিনেমায় কেন যেন কোণঠাসা হয়েছিলেন। তবে অল্পস্বল্প যেটুকু কাজ করেছেন সবগুলোই এক একটা মুক্তা যেন। সিনেমায় বেশ কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছেন উৎপলা। যা আইকনিক হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া ও ‘বিরহী সরে থেকো না’ এবং ‘বহুদিন পরে ভ্রমর এসেছে পদ্ম বনে’ গান দুটি উৎপলার গাওয়া জনপ্রিয় বাংলা গান।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: সুরের মূর্চ্ছনা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

eleven + two =