কিংবদন্তি রহমান শবনম

মাসুম আওয়াল

বাংলা সিনেমার এক অমর জুটির নাম রহমান-শবনম। সেই ষাটের দশকের সাড়া জাগানো নায়ক-নায়িকা ছিলেন তারা। রূপালী পর্দায় এই জুটিকে দর্শক আপন করে নিয়েছিলেন। তাই একসঙ্গে তারা হাজির হলেই হলে সিটি পড়তো। সিনেমা সফল হত। রঙবেরঙে এবারে থাকছে এই অমর জুটিকে নিয়ে চলচ্চিত্রের সোনালি দিনের কথা।

কে তারা

সাদা-কালো চলচ্চিত্রের যুগের বাংলাদেশের কিংবদন্তি অভিনেতা রহমান। তার পুরো নাম আবদুর রহমান। তিনি ১৯৩৭ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড়ে জেলার আটোয়ারী উপজেলার রসেয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সম্ভ্রান্ত পরিবারের কেউ সে সময়ে চলচ্চিত্র অভিনয় করার কথা চিন্তাও করতে পারতে না। একদিন বাবাকে না বলে বাড়ি থেকে লুকিয়ে ঢাকায় চলে আসেন রহমান। সময়টা ১৯৫৭ সাল। ২১ বছর বয়সে অভিনয়ের নেশায় ঢাকায় এসে তার সঙ্গে দেখা হয় আরেক কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা ক্যাপ্টেন এহতেশামের (আবু নুর মোহাম্মাদ এহতেশামুল হক)। তার পরিচালিত ‘এ দেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে রহমানের। ছবিটি ১৯৫৯ সালে মুক্তি পায়। তারপর আর তাকে থেমে থাকতে হয়নি।

অন্যদিকে ঢাকার মেয়ে শবনম। ১৯৪২ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশের ঢাকায় অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের এক জমিদার বংশে জন্ম নেন তিনি। তার পরিবারের কেউ চলচ্চিত্রের মানুষ ছিলেন না। এই পরিবারের কেউ সিনেমার নায়িকা হবেন সেটা ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার। শবনম ছোটবেলায় ছিলেন ভীষণ দুরন্ত, নাচের প্রতি ভীষণ টান ছিল তার। মেয়ের শিল্পের প্রতি ঝোঁক তেমন পছন্দ করতেন না মা। তবে বাবার অনুপ্রেরণা ছিল সব সময়। শবনমের বয়স যখন ১৫ বছর, হঠাৎ একদিন এক  নৃত্যের অনুষ্ঠানে শবনমের বাবার বন্ধু  খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তার নাচ দেখে মুগ্ধ হন। এরপর এই পরিচালক তার  ‘এদেশ তোমার আমার’ একটা গানের দৃশ্যে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। সেই সিনেমায় শুধু গানের দৃশেই দেখা মেলে শবনমের। এরপরে  ‘রাজধানীর বুকে’ নামে আরেকটি সিনেমাতেও একটি গানের দৃশ্যে অভিনয় করেন। এই সিনেমা মুক্তির পরেই দর্শকদের নজর কাড়তে সক্ষম হন শবনম। ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় তার। এরপরই মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘হারানো দিন’ সিনেমায়  মুখ্য ভূমিকায় অভিনয়ের অফার আসে। ১৯৬১ সালে এই সিনেমা দিয়েই একক নায়িকা হিসেবে পথচলা শুরু হয় তার। সুপার হিট হয় ‘হারানো দিন। আর পূর্বের নাম ঝর্ণা বসাক বদলে হয়ে যান শবনম।

প্রথম সিনেমা

ঢাকাই সিনেমায় তখনও কোনো জনপ্রিয় জুটি গড়ে ওঠেনি। এদেশের চলচ্চিত্রের তারকা তৈরির কারিগরখ্যাত দুই সহোদর নির্মাতা এহতেশাম-মুস্তাফিজ জুটির হাত ধরে এলেন দুই নতুন মুখ। রহমান-শবনমের প্রথম সিনেমা ‘রাজধানীর বুকে’। যদিও এই সিনেমায় নাচের কয়েকটি দৃশ্যে অভিনয় করেছিলেন শবনম। এরপর বড় পরিসরে মুস্তাফিজের ‘হারানো দিন’ সিনেমায় রহমান-শবনম জুটি বেঁধে অভিনয় করেন। এই চলচ্চিত্রে ‘মালা’ চরিত্রে শবনম আর ‘কামাল’ চরিত্রে রহমান। ছবিটি ১৯৬১ সালে মুক্তি পায়। এ ছবির মাধ্যমে রহমান-শবনম জুটি খ্যাতির চূড়ায় আসন করে নেন। সে সময় তাদের উর্দু সিনেমাতেও অভিনয় করান এহতেশাম-মুস্তাফিজ। ১৯৬২ সালে এহতেশামের ‘চান্দা’ আর ১৯৬৩ সালে মুস্তাফিজের ‘তালাশ’ সিনেমাতেও জুটি ছিলেন রহমান-শবনম। এমনই একের পর এক সিনেমায় জুটি হয়ে তার কিংবদন্তি হয়ে আছেন আজও।

জুটির যত সিনেমা

রহমান-শবনম জুটির সিনেমার তালিকাটি বেশ দীর্ঘ। ১৯৬০ সালে এহতেশাম পরিচালিত ‘রাজধানীর বুকে’ ছবিতে প্রথম জুটি বেঁধে অভিনয় করেন তারা। সিনেমাটি সুপারহিট হয়ে গেলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় রহমান-শবনম জুটি। এরপর বাংলা ও উর্দু, দুই ভাষার সিনেমাতে এই জুটি সমান দর্শকপ্রিয়তা পায়। রহমান-শবনমের সফল সিনেমার মধ্যে রয়েছে হারানো দিন, চাহাত, দো সাথী, চলো মান গায়ে, তালাশ, চান্দা, দরশন, আমার সংসার প্রভৃতি। চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, রহমান ও শবনম অভিনীত সর্বাধিক জনপ্রিয় ছবি ‘তালাশ’।

পশ্চিম পাকিস্তানেও সফল

একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে রহমান ঢাকা ছেড়ে চলে যান পাকিস্তানে। তারপর তার স্ত্রী কন্যারাও চলে গেলেন করাচিতে। বছর দুই করাচিতে কাটিয়ে অবশেষে লাহোরে গিয়ে ১৯৭৪ সালে ‘ফাহাদ’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এই সিনেমাতেও নায়ক ছিলেন রহমান ও নায়িকা শবনম। ‘ফাহাদ’ সিনেমাটিও সুপারহিট হয় পশ্চিম পাকিস্তানে।

স্মরণ

সোনালি দিনের নায়িকা শবনম এখনো সব সময় মনে রাখেন প্রিয় সহকর্মী রহমানের কথা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “রহমানের সঙ্গে সিনেমা করতে গিয়ে পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আমাকে ভীষণ সম্মান করতেন। আমিও তাকে খুব সম্মান করতাম। ভাই বোনের মতো সম্পর্ক ছিল আমাদের মধ্যে। তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই সুন্দর সম্পর্ক ছিল। আমার স্বামী রবিনও তাকে খুব পছন্দ করতেন। রহমান ছিলেন বিনয়ী নায়ক। সুন্দর করে কথা বলতেন সবসময়। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে পুরোপুরি শিল্পী বনে যেতেন। রাজধানীর বুকে  সিনেমায় আমাদের জুটিকে দর্শকরা দারুণভাবে গ্রহণ করে। এই সিনেমার গান ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো’, সে সময়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। আজও গানটির আবেদন কমেনি। এরপর হারানো দিন সিনেমায় জুটি হয়ে অভিনয় করি আমরা। এই সিনেমার একটি গান ‘মন যে দোলে’ সিনেমাপ্রেমীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা পায়। আমরা জুটি হিসেবে দাঁড়িয়ে যাই। সহশিল্পী হিসেবে রহমান খুবই সহযোগিতা করতেন। কীভাবে একটি দৃশ্য ভালো করা যায়, কীভাবে একটি সিনেমা ভালো হবে, এ বিষয়গুলো তিনি ভাবতেন, আলোচনা করতেন। সহশিল্পীদের সঙ্গে সবসময় ছিলেন আন্তরিক।”

পরিচালনায়

রহমান পরিচালিত সাদাকালো সিনেমা ‘দরশন’ মুক্তি পায় ১৯৬৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। রোমান্টিক ও মিউজিক্যাল ঘরানার চলচ্চিত্রটির কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় ছিলেন নায়ক রহমান। রহমানের স্ত্রী কুমকুম প্রযোজিত এ চলচ্চিত্রটি রাঙ্গামাটির পাহাড়ি এলাকার চমৎকার লোকেশনে চিত্রায়িত হয়। গান ও দৃশ্যায়নের জন্য ‘তুমারে লিয়ে ইস দিল মে’ গানটি সাড়া ফেলে। গানের দৃশ্যে দেখা যায়, লেকে নৌকা চালাতে চালাতে গান গাইছেন রহমান। নৌকার অন্য সওয়ারি শবনম। ‘ইয়ে মওসম ইয়ে মাস্ত নাজারে’ গানটিও একইভাবে নৌকায় একাকী গাইছেন রহমান। শবনম একটি বাড়ির লনে আধুনিক আউটফিটে বসে আছেন। কোনো পাহাড়ি  গ্রামে বেড়াতে এসে গরিব নৌকাচালক রহমানের প্রেমে পড়েন ধনীর মেয়ে শবনম। চলচ্চিত্রের কাহিনিও তা-ই। শহুরে মেয়ে বেবি ও গ্রামের ছেলে হীরার প্রেম কাহিনি নিয়ে এই সিনেমা। সব শ্রেণির দর্শক মন ভীষণভাবে নাড়া দেয় রহমান-শবনম জুটির অনবদ্য প্রেমের ছবি ‘দরশন’। পাকিস্তানের দুই অংশে বাংলা কিংবা উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে রহমান শবনম জুটি দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। এই জুটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনেও জনপ্রিয় ও সার্থক জুটি হয়ে ওঠে।

এক নজরে রহমান

১৯৬৫ সালের ১৬ এপ্রিল মুক্তি পায় ‘বাহানা’। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জহির রায়হান ছবিটি নির্মাণ করেন। এই চলচ্চিত্র ব্যাপক জয়প্রিয়তা এনে দেয় নায়ক রহমানকে। তার আগের চলচ্চিত্র ‘মিলন’ ব্যাপক জয়প্রিয় ছিল তৎকালীন দুই পাকিস্তানে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণ ‘দেবদাস’ নির্মাণ করেন। সেখানে নায়ক রহমান চুনিলালের চরিত্রে অভিনয় করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। ১৯৮১ সালে দিলীপ বিশ্বাস পরিচালিত ‘অংশীদার’ চলচ্চিত্রেও তিনি দুর্দান্ত অভিনয় করেন। রহমান অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র ছিল অশোক ঘোষ পরিচালিত নব্বইয়ের দশকে মুক্তি পাওয়া ‘আমার সংসার’।

রহমান অভিনীত উল্লেখ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো উর্দুতে ‘চান্দা’, ‘তালাশ’, ‘মিলন’, ‘বাহানা’, ‘ইন্ধন’, ‘দর্শন’, ‘জাঁহা বাজে সেহনাই’, ‘গোরি’, ‘প্যায়াসা’, ‘কঙ্গন, ‘দোস্তি’, ‘নাদান’; বাংলায় ‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘রাজধানীর বুকে’, ‘এই তো জীবন’, ‘হারানো দিন’, ‘যে নদী মরু পথে’, ‘দেবদাস’।

রহমান ছিলেন পাঁচ কন্যার জনক। তিন কন্যা আমেরিকা প্রবাসী, এক কন্যা লন্ডনে এবং সর্বকনিষ্ঠ কন্যা থাকেন ঢাকায়। শেষজীবনে ঢাকাতেই কাটে তার অসুস্থ জীবন। হুইল চেয়ারই হয় তার চির সঙ্গী। এই অসুস্থ কিংবদন্তি অভিনেতার খবর নিতেন না চলচ্চিত্রে কেউ। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচসাসসহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হন রহমান। ২০০৫ সালের ১৮ জুলাই ঢাকায় এই কিংবদন্তি দাপুটে অভিনেতার জীবনাবসান ঘটে।

এক নজরে শবনম

১৯৬১ সালে বাংলা চলচ্চিত্র ‘হারানো দিন’র মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন শবনম। ১৯৬২ সালে উর্দু চলচ্চিত্র ‘চান্দা’ ছবির মাধ্যমে তৎকালীন সমগ্র পাকিস্তানে রাতারাতি তারকাখ্যাতি পান এ দু’টি ছবিই তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ঢাকা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। পরবর্তী বছরে ‘তালাশ’ সমগ্র পাকিস্তানে মুক্তি পেলে ঐ সময়ের সর্বাপেক্ষা ব্যবসাসফল ছবির মর্যাদা লাভ করে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে শবনম পাকিস্তানের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে চিহ্নিত হন। পেশাজীবি মনোভাবের কারণে তিনি ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানের করাচীতে স্থায়ীভাবে বাস করতে থাকেন। সত্তর দশকের শুরুতে শবনম ললিউডে (লাহোর) পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করেন। তিনি নায়িকা হিসেবে পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পে ধ্বস নামার পূর্বে আশির দশকের শেষ পর্যন্ত প্রবল প্রতাপে একচ্ছত্র প্রাধান্য বিস্তার করেছিলেন। সম্ভবত বিশ্বে তিনিই একমাত্র চলচ্চিত্র অভিনেত্রী যিনি ৬০-এর দশক থেকে ৮০-এর দশক পর্যন্ত তিনটি দশক ধারাবাহিক ও সফলভাবে রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয় করে অগণিত দর্শক-শ্রোতার মন জয় করেছিলেন।

শেষ কথা

শিল্পী হয়ে ওঠা অনেক কঠিন। প্রচুর পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করে শিল্পী হতে হয়। রহমান-শবনমের মতো শিল্পী কালে কালে আসে। চিরদিন তারা আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: জুটি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 × 4 =