গয়নায় একুশের ছোঁয়া

নাহিন আশরাফ

যুগ যুগ ধরে নারীর সাজে প্রধান অনুষঙ্গ গয়না। গয়না নারীর সাজের পরিপূর্ণতা নিয়ে আসে। তাইতো শাড়ি বা পোশাকের পাশাপাশি নারীর রয়েছে গয়নার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ। অনেকে এমন সব গয়না পরিধান করে যা পোশাকের থেকেও বেশি নজর কাড়ে। একটা সময় নারীরা গয়না হিসেবে শুধু সোনার গয়নাই কিনতো। কিন্তু সোনার দাম বৃদ্ধি পাবার সঙ্গে সঙ্গে নারীদের সোনার গয়নার প্রতি আকর্ষণ কমে অন্যান্য মেটাল গয়নার দিকে আকর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাইতো গয়নাপ্রেমী নারীদের জন্য ডিজাইনাররা বিভিন্ন মেটালের ও নানা ধরনের নকশার গয়না তৈরি করছে। যেকোনো উৎসব আয়োজনে নারীদের একটি বাজেট থাকে শুধু গয়নার জন্য। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসগুলোতে পোশাকের পাশাপাশি নানা ধরনের গয়নার পসরা সাজিয়ে রাখতে দেখা যায়।

কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হয়ে যাবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী মাস ফেব্রুয়ারি। সারা বিশ্বে পালিত হবে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। বাঙালি যেহেতু উৎসবপ্রেমী, তাই সব উৎসবেই তারা নিজেকে সাজাতে ভালোবাসে। নারীরা একুশে ফেব্রুয়ারিতে শাড়ি, সালোয়ার কামিজ, কুর্তি, শর্ট কুর্তি, ফতুয়া, টপস ইত্যাদি পরিধান করে থাকে। তাদের সাজের একটি পর অংশ জুড়ে থাকে গয়না। ফ্যাশন হাউজগুলো একুশে ফেব্রুয়ারির বিশেষ পোশাকের কালেকশন রাখার পাশাপাশি একুশের মোটিফের গয়নার কালেকশনও রাখে। সাদা কালো, আড়ং, যাত্রা, বিশ্ব রঙ, রং বাংলাদেশ, সাদা-কালো, অঞ্জনস, অরণ্য, দেশাল, গাঁও গেরাম, কে ক্রাফট,  বাংলার মেলাসহ বিভিন্ন দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড তৈরি করে থাকে গয়না। এছাড়া বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক পেজেও পাওয়া যায় একুশে মোটিফের গয়না।

অমর একুশকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গায় নানা রকম মেলা বসে। সেসব স্থানেও একুশকে ঘিরে নানা ধরনের গয়নার কালেকশন পাওয়া যায়।

একুশে ফেব্রুয়ারির সাজে যেকোনো দেশীয় গয়না মানিয়ে যায়। কিন্তু এখন শুধুমাত্র একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করেও গয়না ডিজাইন করা হয়। একুশের মোটিফের গয়না যেন এ দিনটিকে আরো পরিপূর্ণ করে তোলে। দেশীয় পোশাকের সঙ্গে দেশীয় গয়নাই সবচেয়ে বেশি মানানসই। একুশের ঐতিহ্যকে ধারণ করে ফ্যাশন হাউজগুলো বিভিন্ন ধরনের গয়না তৈরি করে। কয়েক বছর ধরে ফ্যাশনের জগতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কাঠের গয়না। দামে সাশ্রয়ী ও বহন করতে সোজা বলে এটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তাছাড়া কাঠের গয়না সাজে নিয়ে আসে নান্দনিকতার ছোঁয়া। শাড়ি, কামিজ, ফতুয়া সব ধরনের পোশাকের সঙ্গেই কাঠের গয়না মানিয়ে যায়। একুশকে কেন্দ্র করে অ, আ, ক, খ সহ বিভিন্ন বর্ণমালার আদলে কাঠ কেটে কাঠের গয়না তৈরি করা হয়। এরপর রং করা হয়। একুশের মূল থিম সাদা কালো, তাই বেশিরভাগ গয়না সাদা ও কালো রংয়ের হয়। এ ছাড়াও লাল, সবুজ, হলুদ, নীলসহ বিভিন্ন রংয়ের গয়নাও তৈরি করা হয়। কারণ একুশে ফেব্রুয়ারিতে শুধু যে সাদা কালো পোশাক পরিধান করা হয় তা নয়, অনেকে বিভিন্ন রংয়ের পোশাক পরিধান করে থাকে। আবার অনেকে সাদা কিংবা কালো পোশাক পরিধান করলেও বাহারি রংয়ের গয়না পরতে ভালোবাসে।

বর্ণমালা ছাড়াও শহীদ মিনার, মানচিত্র, জাতীয় পতাকা, একুশ কিংবা গ্রামের কোনো দৃশ্যের থিমেও গয়না তৈরি করা হয়। এ সময় দেশীয় উপাদান দিয়ে বানানো গয়নার চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। কাঠের গয়নার পাশাপাশি দেখা যায় কাপড়ের গয়না। সাদা কালো কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয় কাপড়ের চোকার। কাপড়ের গয়না বানানোর জন্য বাটিক, সুতি, জামদানি ইত্যাদি ধরনের কাপড় বেছে নেওয়া হয়। এছাড়া ঐতিহ্যকে তুলে ধরার জন্য কাপড়ের গয়নাতে গামছা ব্যবহার করা হয়। সাদা কিংবা কালো একরঙা শাড়ির সঙ্গে গামছা দিয়ে তৈরি রঙিন কাপড়ের গয়না ভালো মানিয়ে যায়। এছাড়া অনেকে জামদানি থিমের গয়নাও পরিধান করেন।

প্রকৃতি থেকে উপাদান নিয়ে বানানো গয়নার অনেক জনপ্রিয়তা রয়েছে। যেমন কড়ি, কাঠ, পুঁতি ইত্যাদি। কাঠের গয়না কিংবা কাপড়ের গয়নাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য তার সঙ্গে পুতি, কড়ি ও বিভিন্ন ধরনের মেটাল যোগ করা হয়। এছাড়া কাপড়ের উপর করার হয় মিরর ওয়ার্ক যা গয়নাকে আরও বেশি গর্জিয়াস করে তোলে। এছাড়া গয়নাতে দেখা যায় প্রকৃতির ছোঁয়া। বীজ, পাখির পালক, আকাশের রং, গাছ, সাগরের স্রোত, মুক্তা, নদী, গাছ ইত্যাদি। কাঠের গয়নাসহ বিভিন্ন গয়নার উপর ডিজাইনাররা  হ্যান্ডপেইন্ট করে থাকে। হ্যান্ডপেইন্ট করা গয়না সাজকে করে তোলে নজরকাড়া। কাঠের উপর শহীদ মিনার কিংবা মানচিত্রও আঁকা হয়।

অনেকে বেছে নিচ্ছে পিতলের গয়না। সোনালি রংয়ের এসব গয়না দেশীয় সাজের সঙ্গে মানায়। পিতলের চিকন চোকার, ব্রেসলেট ও আংটি রয়েছে। পিতলকে আকর্ষণীয় করার জন্য পিতলের গয়নার উপর পাথর বসানো হয়। লাল, সবুজ, নীল ইত্যাদি রংয়ের বড় বড় পাথর দেখা যায় পিতলের গয়নায়। এছাড়া একুশে ফেব্রুয়ারির জন্য পিতল দিয়েও বর্ণমালার নকশায় নানা ধরনের গয়না তৈরি হয়। যেমন পিতলের ক, খ, অ, আ, ইত্যাদি অক্ষরের কানের ফুল কিংবা বড় সাইজের আংটি দেখা যায়। এছাড়া অনেকে খোঁপাতেও পিতলের গয়না পরিধান করে কিংবা স্লিভলেস ব্লাউজ পরলে পিতলের বাজু পরে। পিতলের গয়না বেশ দামি হয়। আড়ং, কে ক্রাফট, অঞ্জনসসহ বিভিন্ন দেশীয় ফ্যাশন হাউজে পাওয়া যায়। এছাড়া অনলাইনভিত্তিক পেইজ কারখানাতে রয়েছে পিতলের গয়নার বাহারি কালেকশন। গোল্ড প্লেটেড, সিলভার প্লেটেড গয়নাতেও দেখা যায় একুশের ছোঁয়া। আংটিতেও দেখা যায় একুশের ঐতিহ্য।

পোশাকের সঙ্গে মানানসই গয়না

তবে একুশের গয়না বাছাই করার ক্ষেত্রে অবশ্যই পোশাকের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। পোশাকের রং, গলা, হাতার কাজ, কাটিং প্যাটার্ন ইত্যাদি বিবেচনা করে গয়না বাছাই করতে হবে। যেমন বড় চোকার পরতে চাইলে বড় গলার পোশাক পরিধান করতে হবে। আবার সাদা কালো পোশাক পরলে কালো রংয়ের গয়না দেখতে ভালো লাগবে। পোশাকে অতিরিক্ত নকশা থাকলে হালকা গয়না বেছে নেওয়া উচিত। আবার একরঙা ও হালকা কাজের পোশাক পরিধান করলে ভারী গয়না পরা যেতে পারে।

বর্তমানে নারীরা শাড়ির চেয়েও কুর্তি বা শর্ট কুর্তি পরতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। একুশে ফেব্রুয়ারির দিন কুর্তি পরিধান করলে তার সঙ্গে কাঠের কিংবা মাটির গয়না বেছে নেওয়া যেতে পারে। যেকোনো ধরনের নকশা কিংবা রংয়ের সঙ্গে মানিয়ে যাবে পিতলের গয়না। এছাড়া গলায় চিকন পিতলের চোকার পরা যেতে পারে।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: ফ্যাশন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

four × 4 =