গানের সঙ্গে নকীব খানের ৫০ বছর

মৌ সন্ধ্যা

সোলসের ‘নদী এসে পথ’, রেনেসাঁর ‘হৃদয় কাদামাটির কোনো মূর্তি নয়’, ‘ভালো লাগে জোছনা রাতে’, ‘ও নদী রে’, ‘আচ্ছা কেন মানুষগুলো’, ‘তুমি কি আজ বন্ধু’, ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে এমন আরও অনেক নন্দিত গানের সুরকার নকীব খান।’ ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’ গানটির গীতিকারও তিনি। দেশের সঙ্গীত অঙ্গনের এক অন্যতম প্রিয় মুখ নকীব খান। দেখতে দেখতে গানের সঙ্গে পঞ্চাশটি বছর কাটিয়ে দিলেন এই গুণী মানুষটি। ২০২৪ সালে সঙ্গীত জীবনের ৫০ বছর পূর্ণ করেছেন নকীব খান।

পথচলা শুরু

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে জন্মস্থান চট্টগ্রামে নকীব খানের সঙ্গীতের যাত্রা শুরু হয়। বালার্ক ব্যান্ডে গায়ক, পিয়ানিস্ট ও শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। ১৯৭৪ সালে যোগ দেন সোলসে। এ ব্যান্ডে প্রায় ১০ বছর ছিলেন নকীব খান। বাবা মারা যাওয়ার পর চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে আসেন ঢাকায়। ১৯৮৫ সালে গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড রেনেসাঁ। সেই থেকে রেনেসাঁ নিয়েই শ্রোতাদের ভালোবাসা কুড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।

সুরকার

নকীব খানের পরিচিতি শিল্পী ও সুরকার হিসেবে। তবে নিজেকে সুরকার ভাবতেই বেশি পছন্দ করেন এই গানের মানুষটি। তিনি বলেন, আমার চিন্তা-চেতনার জায়গাটা সুরকার নকীব খানই দখল করে রেখেছে। এর চেয়ে বড় সত্যি হলো, আমি কখনও কণ্ঠশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখিনি; শ্রোতার কাছে সুরকার হিসেবেই নিজেকে তুলে ধরতে চেয়েছি।

গান চুরি করে সুর করা

নকীব খানের সুরকার হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছিলেন তার বড় ভাই জিলু খান। তার অনেকগুলো গান করেছিলেন তিনি। তাদের তিন ভাইয়ের যে ব্যান্ড ছিল, সেখানে জিলু খানের লেখা গানই বেশি গাওয়া হতো। এক সাক্ষাৎকারে নকীব খান বলছিলেন, ১৯৭৪ সাল, তখন চট্টগ্রাম গভর্নমেন্ট স্কুলে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আমি। ওই সময়ে হারমোনিয়াম বাজিয়ে জীবনের প্রথম গানের সুর করি। আমার বড় ভাই জিলু খান (জালাল উদ্দিন খান জিলু) ও হেনা (ইসলাম) ভাই বন্ধু ছিলেন। ভাইয়াকে তখন হেনা ভাই সুর করার জন্য কয়েকটা লিরিক দিয়েছিলেন। বড় ভাই এসব লিরিক ড্রয়ারে রেখেছিলেন। তিনি যখন বাসার বাইরে যান, অফিসে গেলেন; তখন মনে মনে ভাবলাম, আমি একটা সুর করার চেষ্টা করে দেখি না। ড্রয়ার থেকে ঝুঁকি নিয়ে চুরি করে একটা লিরিক নিলাম, এরপর সুর করলাম। বড় ভাই বাসায় আসার পর বললাম, একটা অন্যায় কাজ করছি। ড্রয়ার থেকে আপনার একটা গান চুরি করে নিয়ে সুর করছি। এরপর বড় ভাই বললেন, ‘তাই নাকি! তাই নাকি! কই দেখি, শোনাও তো।’ শোনানোর পর আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘অনেক দোয়া করি, খুব ভালো হয়েছে গানটা।’ এভাবেই নকীব খানের সুরকার হিসেবে পথচলা শুরু।

স্বপ্নের মতো ৫০ বছর

ফেলে আসা দিনগুলো কথা প্রতি মুহূর্তেই মনে পড়ে নকীব খানের। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার গল্প অনুপ্রাণিত করে তরুণ শিল্পীদের। এক গণমাধ্যমে নকীব খান বলেন, ফেলে আসা সময়ের অনেক ঘটনাই চলচ্চিত্রের মতো মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। ১৯৭২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সঙ্গীতের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে পারা সত্যি স্বপ্নের মতো। কখনও ভাবিনি, গানে গানে এতটা পথ পাড়ি দিতে পারব। এই দীর্ঘ পথচলায় শ্রোতার ভালোবাসাই ছিল অনুপ্রেরণা। যদিও সঙ্গীত বলয়ে বেড়ে উঠেছি, তারপরও কখনও শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখিনি। প্রায় পাঁচ দশক আগে বড় ভাইয়ের সঙ্গে বালার্ক ব্যান্ড করেছিলাম। জিলু খান, আমি এবং ছোট ভাই পিলু খান তিনজনই এই ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ব্যান্ডের অন্য সদস্যরাও ছিল আমাদেরই বন্ধু। তাই যা কিছু করেছি একান্ত নিজেদের ভালো লাগা থেকে। নানা ব্যস্ততায় ব্যান্ডের সদস্যরা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়লে বালার্ক ভেঙে যায়। কিন্তু ততদিনে আমি ও পিলু সঙ্গীতের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম। সৃষ্টির নেশা আমাদের পেয়ে বসেছিল। যে জন্য সোলসে যোগ দেই। ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’, ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’-এর মতো গানগুলো সৃষ্টির পর কাজের স্পৃহা বেড়ে গিয়েছিল। সঙ্গীত পেশা হিসেবে না নিলেও গান থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারিনি। তাই আমৃত্যু গানের সঙ্গেই নিজেকে জড়িয়ে রাখতে চাই।

সোলস ছেড়ে রেনেসাঁ

আশির দশকের বেশির ভাগ ব্যান্ডই পপ রক, মেটাল, হার্ড রক গানকে প্রাধান্য দেওয়া শুরু করেছিল। সোলস সদস্যরাও একই পথে হাঁটা শুরু করেছিলেন। এতে মেলোডি গানের যে তৃষ্ণা, সেটা কোনোভাবেই পূরণ হচ্ছিল না নকীব খানদের। নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতেই একই চিন্তাধারার কয়েকজন মিউজিশিয়ান এক হয়ে রেনেসাঁ ব্যান্ড তৈরি হয়। নকীব খান বলেন, আমরা যারা রেনেসাঁ গঠন করেছিলাম, তাদের সবার ইচ্ছা ছিল একটাই, কথানির্ভর মেলোডি গান করা। সে কারণে আমি আর পিলু যেমন সোলস ছেড়েছি, তেমনি ব্যান্ডের অন্যান্য সদস্যরাও তাদের পুরোনো দল ছেড়ে রেনেসাঁয় যোগ দিয়েছিলেন। গান হোক সামাজিক আন্দোলনের হাতিয়ার এই ছিল আমাদের চাওয়া। তাই রোমান্টিক গান যেমন তৈরি করেছি, তেমনি নানা বিষয় নিয়েও গান করতে পিছিয়ে আসিনি আমরা। ‘আজ যে শিশু’, ‘বেঁচে থাকা নিয়ে যাদের যুদ্ধ’, ‘তৃতীয় বিশ্ব’, ‘বাংলাদেশ তোমার বয়স হলো কত’, ‘একুশ শতকের গ্রাম-বাংলা’ এমন অনেক গানেই বিষয় বৈচিত্র্য তুলে ধরার চেষ্টা ছিল। এ কারণেই ব্যান্ডের নাম রাখা হয় রেনেসাঁ যার অর্থ নবজাগরণ।

বিনয়ী

নকীব খান বরাবরই দারুণ বিনয়ী মানুষ। এত এত চমৎকার গান উপহার দেওয়ার পরেও শিল্পমনের অতৃপ্তি কাজ করে তার মনেও। তিনি বলেন, ‘গানের জন্য অনেক মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছি। এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমি মনে করি আরও অনেক কিছু করার বাকি। এখনো মনে হয়, আমার শ্রেষ্ঠ কাজটা করতে পারিনি। মনে হয়, কিছুই করতে পারিনি। সবচেয়ে সেরা সৃষ্টি যদি হয়ে যায়, তাহলে আর কিছুই তো করার থাকে না। আমার কাছে এখনো মনে হয়, অনেক কিছু বাকি। সঙ্গীত তো একটা বিশাল মহাসমুদ্র, সেখান থেকে আমরা শুধু একটা নুড়ি কুড়িয়েছি। আর কিছুই না।’

অপ্রকাশিত গান

নকীব গানের সুর করা অনেক গান এখনও অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। এই গানগুলো নিয়ে ভাবেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে নকীব খান বলেন, অনেক গান আমি সুর করেছি, কিন্তু প্রকাশ করতে পারিনি। কারণ অর্থনৈতিক। আগে যেমন মিউজিশিয়ান নিয়ে একটা গান রেকর্ড করতে গেলে কিছু খরচ হতো। এখন তো তা অনেক ব্যয়বহুল। সাধারণত আগে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গান তৈরির খরচ বহন করত। আমাদের দেশে হয়েছে কী, ওই ব্যাপারগুলো ঠিকমতো পাই না। যার ফলে অনেক ক্রিয়েশন মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারিনি। এটা আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট।

৫০ বছরে আয়োজন

বেশ জমকালো আয়োজনে নকীব খানের ক্যারিয়ারের ৫০ বছর পূর্তির  উদযাপন করা  হয়েছে। গত ১৭ জানুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত ইয়ামাহা ফ্লাগশিপ সেন্টারে নকীব খানকে ঘিরে ভিন্ন এক গল্প, কবিতা ও গানের আসর সাজিয়েছে নূরস ইভেন্ট। আয়োজনটির শিরোনাম ছিল ‘সেলিব্রেটিং মেলোডিয়াস ৫০ ইয়ারস অব নকীব খান’। আয়োজনে হাজির থেকে নকীব খান গেয়ে শোনান তার জনপ্রিয় কিছু গান ও  ক্যারিয়ারের  উল্লেখযোগ্য গল্প। এর সঙ্গে আরও ছিল কবিতা পরিবেশনা। কবিতা পরিবেশন করেন দুই কবি সুমী নূর ও মেঘলা। পুরো আয়োজনটি উপস্থাপনা করেন গায়ক ও সুরকার আশফাকুল বারী রুমন। আয়োজক সুমী নূর বলেন, ‘আমাদের এটি ছিল ষষ্ঠ আয়োজন। আগের প্রতিটি আয়োজনেও আমরা কবিতাকে প্রাধান্য দিয়ে গানের সঙ্গে বাংলা সাহিত্য তুলে আনার চেষ্টা করেছি। এবারও তা-ই করেছি। আর কিংবদন্তি নকীব খানের সঙ্গীতজীবনের ৫০ বছরের উদযাপন করতে পেরে আমরা খুবই আনন্দিত।’ এ আয়োজনের টিকিট মূল্য রাখা হয়েছেছিল ১ হাজার ২০০ টাকা।

তরুণদের উদ্দেশ্যে

অনেক নতুন শিল্পীরাও এখন খুব ভালো গান গাইছেন। এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকেই। তাদের উদ্দেশ্যে নকীব খান বলেন, ‘আমাদের নতুন প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে, স্টার হওয়া খুব সোজা। সত্যিকার অর্থে শিল্পী হওয়া, দীর্ঘ সময় মানুষের মনে বেঁচে থাকা কঠিন ব্যাপার। শিল্পী হওয়ার জন্য সাধনা করতে হবে, কষ্ট করতে হয়। সেই সাধনা যার মধ্যে থাকবে না, সে কখনোই স্থায়ী হবে না। এখনকার যারা কম্পোজ করছে, তারা বেশিমাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর। যেটা হয় কী, ওরা প্রযুক্তির দাস হয়ে গেছে। উল্টো হওয়া উচিত, প্রযুক্তিকে তাদের দাস বানাতে হবে। নিজস্ব যে সৃজনশীলতা আছে, এটাকে বেজ করে প্রযুক্তির টুলস ব্যবহার করবে। মাথায় রাখতে হবে, শর্টকাট বলে কিছু নাই। স্টার হওয়া সোজা, শিল্পী হওয়া কঠিন।’

শেষ কথা

সঙ্গীত জীবনের পঞ্চাশ বছর পার করে এখনও সবুজ নকীব খান। তারুণ্যে ভরপুর এই মানুষটি এখনও হাঁটতে চান তরুণদের সঙ্গেই। তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় চাই, নতুনরা আসুক। আমার শুরুটা যখন হয়েছিল তখন তপন চৌধুরী, সামিনা, ফাহমিদা নবীরা নতুনই ছিল। কুমার বিশ্বজিতেরও প্রথম গান আমার করা। আমি সব সময় নতুনদের সঙ্গে কাজ করতে চাই।’

সবশেষে তার জন্য প্রার্থনা দীর্ঘজীবী হন নকীব খান, জীবনের শেষ বেলা পর্যন্ত সঙ্গে থাকুক গান।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: সুরের মূর্চ্ছনা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ten + 2 =