অলকানন্দা মালা
দীর্ঘদিনের অভিনয় ক্যারিয়ার শবনম পারভীনের। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে মুক্তি পেয়েছে তার অভিনীত সিনেমা ‘হুরমতি’। এতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে দেখা গেছে তাকে। ‘হুরমতি’সহ বিভিন্ন বিষয়ে শবনমের সঙ্গে রঙবেরঙের আলাপ জমেছিল।
অনেকে মন্তব্য করছেন, নায়িকা হতেই ‘হুরমতি’ বানিয়েছেন…
আমার সিনেমায় অভিষেক হয়েছে নায়িকা হিসেবে। পরে নিজেই বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে কাজ করেছি। চরিত্রাভিনেত্রী হয়েছি। কেননা একজন শিল্পী যখন বিভিন্ন চরিত্রে কাজ করবে তখন তার অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরবে এবং বৈচিত্র্য বাড়বে। আমি সবসময়ই বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
বয়স নিয়েও কটাক্ষ করছেন অনেকে…
অনেকে বলছেন ওনার বয়স এত হয়েছে অত হয়েছে। কিন্তু আর্টিস্টের কোনো বয়স আছে? অমিতাভ বচ্চন যদি এত বছর বয়সে ‘পা’ সিনেমা করতে পারেন, এই বয়সেও যদি ‘গাজরারে’ গানে ঐশ্বরিয়া রায়ের সঙ্গে নাচতে পারেন তাহলে আমি পারব না কেন। অন্য দেশে কেউ কিছু করলে আমরা খুব বাহবা দেই। আর যখন একই কাজ নিজের দেশের কেউ করে তখন তাকে ট্রল করা হয়। আমি এ ধরনের ট্রলের শিকার হব কখনও ভাবিনি। ছবিটি বানিয়ে এত বেশি ট্রলের শিকার হয়েছি। যারা আমাকে নিয়ে কখনও লেখেন না তারা ট্রলটা ঠিকই করলেন। অবশ্য এতে আমার কিছু যায় আসে না।
যারা ট্রল করছে তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার আছে?
অনেকেই আমার ছবিটি না দেখেই সমালোচনা করছেন। সবাইকে অনুরোধ করেছি, আবারও করব, ছবিটি আবার যখন চালাব সবাই একটু দেখবেন। দেখে তারপর সমালোচনা করবেন।
‘হুরমতি’ বানানোর ভাবনা এলো কিভাবে?
হুরমতির চরিত্রটি হতে পারত ১৬ বছরের মেয়ের, ৪০ বছরের বা ৩৫ বছরের নারীর। কিন্তু তাতে কিছু সমস্যা ছিল। হয়তো ১৬ বছরের নারী হলে মানুষ বিষয়টি মেনে নিত না। কেননা একজন নারী স্বামীর নির্যাতন সহ্য করে অনেক বছর সংসার করেছে। সে যার আশ্রয়ে যায় সে তাকে বিক্রি করে দেয়। অর্থাৎ তাকে পণ্য করা হয়। নারীদের আমরা পণ্য হিসেবেই ব্যবহার করি। সে হোক ১৬ বছর কিংবা ৬০-৭০ বছরের। আমি শুনেছি আমার বাড়ির পাশে ৩৫ বছরের পুরুষ ১২০ বছরের বৃদ্ধাকে ধর্ষণ করেছে। চিন্তা করতে পারেন? কিন্তু এটা হয়েছে। এরকম অহরহ হয়। এ ধরনের কনসেপ্টের ওপর ছবিটা বানিয়েছি।
প্রযোজনায় কবে থেকে?
অনেকেই জানেন না ২৭ বছর আগে একটি প্রোডাকশন হাউজ খোলা হয়েছিল যার নাম ‘শবনম প্রোডাকশন হাউজ’। ১৯৯১ সালের ঘটনা। আমি তাদের বলছি, যারা বলছেন হুরমতির কেন বুড়ো বয়সে এসে ভীমরতি ধরল। বাড়ি ঘর বেচে কেন সিনেমা বানাল। আরে ভাই আগে তো আমার সম্পর্কে খবর নেবেন তারপরে কথা বলেন। আমি আগে থেকেই সিনেমা বানাই। এটা নতুন কিছু না।
বাড়ি বিক্রি করে সিনেমা বানান। লাভ-লোকসান নিয়ে ভাবেন না?
ব্যবসায় লাভ লোকসান আছে, খেলায় হারজিত আছে। আমি এটাকে ওইভাবে দেখি না। কিন্তু অনেকেই মনে করছেন, এবারই হয়তো প্রথম বাড়ি বেচে সিনেমা বানিয়েছি। আর আমার এত শখ কেন হলো।
আর কোন কোন জমি বিক্রি করেছেন?
‘কুখ্যাত জরিনা’ সিনেমাটি রিলিজের সময় আমি উত্তরার জমি অল্প দামে বিক্রি করি। ২০০০ সালে ‘ভয়ংকর নারী’ সিনেমাটির সময় আমার হাতে টাকা ছিল না। তখনও আব্বার দেওয়া জায়গা বিক্রি করেছি। তখন তো কেউ লেখেননি। আর এখন এসে লিখছেন। অথচ এখন তো লেখার কথা ছিল মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে নিয়ে। কেননা এর আগে কখনও দেখিনি একসঙ্গে তিনটা ছবি মুক্তি পেয়েছে। এটা অনিয়ম। ঈদের মধ্যে একাধিক ছবি মুক্তি পায়। এর বাইরে না।
জমিগুলো আজ থাকলে…
সিনেমা বানাতে গিয়ে যে জমিগুলো বিক্রি করেছি সেগুলো না বিক্রি করলে আজ আমার কয়েকশ কোটি টাকা থাকত। আমার বাবার বাড়ি মানিকগঞ্জ শহরে। সেখানে এক শতাংশ জমির দাম এখন এক কোটি টাকা। কমার্শিয়াল এরিয়ায়। আমি সিনেমার জন্য ওই জমি বিক্রি করেছি। এ জন্য কত মার খেয়েছি! সেগুলো বলতে চাই না।
দীর্ঘদিন অভিনয় করছেন। প্রত্যাশানুযায়ী প্রাপ্তি এসেছে?
একজন শিল্পীর আকাক্সক্ষা অনেক বেশি। সহসা হার মানতে চায় না। সে কখনও চিন্তা করে না এটাই তার শেষ অভিনয়। আমিও তেমন। ভালো থেকে ভালো কাজ করার চেষ্টা করছি।
বাবা আপনাকে ত্যাজ্য করেছিলেন…
প্রথম যখন আমি সিনেমায় এলাম বাবা আমাকে ত্যাজ্য করে দিলেন। আমি বহু বছর বাবাকে বাবা বলে ডাকিনি। আমি সিনেমায় এসেছি বলে বাবাও কোনোদিন আমার বাসায় রাতে থাকেননি। যেদিন বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন আমার বাসায় আজ রাতে ঘুমাবেন, সেদিন রাতে আমার বাসায় ডাকাত পড়ল। আমার চোখের সামনে তারা বাবাকে মেরে ফেলল। ২০০৮ সালের ঘটনা এটি। একবারও তো কেউ সেটা নিয়ে লিখল না। দুঃখ এখানেই।
কাউকে অনুসরণ করেন?
আমাকে যারা ফিল্মে এনেছেন তারা নায়িকা হিসেবে এনেছিলেন। আমি পরে চরিত্র নির্ভর কাজ করার চেষ্টা করেছি। কারণ আমি অরুনা ইরানির মতো ইমেজ তৈরি করার চেষ্টা করেছিলাম। এখনও করে যাচ্ছি। ওই জায়গাতে নিজেকে সফল মনে করি। কারণ আমি একই সময়ে ১৬ বছর ধরে ‘ইত্যাদি’তে অভিনয় করছি। সামনাসামনি অনেকে বলেন, আপনি নানি না হতেই নানি হয়ে গেলেন! এটা কেমন কথা! আমি বলি অভিনয় তো অভিনয়। নায়িকা যে হতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। আমার কথা ছিল, সবাই যেন আমাকে চিনেন। আমি সফল। আপনি আমাকে ট্রল করলেই কি না করলে কী। আর করলে আমারই ভালো। আমার আরও প্রচার হচ্ছে।
যে লক্ষ্য ছিল শবনমের…
প্রথম কথা ছিল সিনেমায় যেতেই হবে, এসেছি। এরপর লক্ষ্য ছিল একটা অবস্থানে যেতে হবে, মানুষ যেন আমাকে চিনেন।
একাধিক অভিনেতার বিপরীতে কাজ করেছেন। অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
সবাই আমার সহকর্মী। একজন সহকর্মীর সঙ্গে যেভাবে কাজ করা হয় সেভাবেই করেছি। আলাদা করে ভাবিনি।
ছবিটি কবে নির্মাণ করেছেন?
ছবিটি আমি ২০১৯ সালে বানাই। মুক্তির সময়ও ঠিক হয়েছিল। কিন্তু করোনার কারণে হলগুলো বন্ধ হয়ে যায়। আর মুক্তি দেওয়া হয়নি। করোনার পর বিভিন্ন সময় চাইলেও পরিস্থিতির কারণে মুক্তি দিতে পারিনি। এ বছরের জুলাইয়ে মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তখন থেকেই তো দেশে অস্থিতিশীলতা শুরু হলো। তাই সম্ভব হয়নি। এখন আমি ছবি রিলিজ করেছি। এদিকে ফারুকী সাহেব তিনটি ছবি মুক্তি দিয়েছেন। এজন্য রাগ করে ছবিটি আবার ঘরে তুলে রেখেছি। সবার ছবি চালান শেষ হোক, তারপরে আবার আমি চালাব।
ছবিটিকে কেন ব্যতিক্রম মনে করছেন?
আমার ছবিটি ব্যতিক্রমধর্মী। এর আগে নির্মিত ‘ভয়ংকর নারী’ও ব্যতিক্রমধর্মী ছিল। আমি খল চরিত্রে অভিনয় করি। সেসময় সবাই বলেছেন, শবনমের মাথা খারাপ হয়েছে। কোথায় রাজীব ভাই, হুমায়ুন ফরিদীকে নিয়ে ছবি বানাবে। তা না করে নিজেই ভিলেন হয়ে বসে আছে। আমি কিন্তু সিনেমাটি সফল করে ছেড়েছি। এবারও আশা করেছিলাম সাফল্য হয়তোবা আসবে।
বর্তমান ব্যস্ততা নিয়ে বলুন…
দুটি ছবি নিয়ে কথা হচ্ছে। কয়েকটা নাটক আছে।
আপনি নাটক বানিয়ে পরিচালক হিসেবে নাম দিয়েছেন অন্যের। কেন?
পরিচালনা আমার পেশা না। আমি ডিরেক্টর হয়েছি কারণ বড় বড় চ্যানেলে আমার নাটকগুলো গেছে। চ্যানেল আইসহ অনেকে চালিয়েছে। কিন্তু দিনশেষে আমি তো অভিনেত্রী। আমাকে অভিনয়টাই করতে হবে। আমি ওটাকেই প্রাধান্য দিয়েছি। তাই পরিচালক হিসেবে নিজের নাম দেইনি।
লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: আলাপচারিতা