বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) সূচকে গত ১১ মাসে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড (জেজিটিডিএসএল) সর্বনিম্ন সিস্টেম লসের মাধ্যমে সবচেয়ে সফল গ্যাস সরবরাহকারী হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। অপরদিকে সবচেয়ে বেশি সিস্টেম লসের মুখোমুখি হয়েছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি। খবর বাসস
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আগের ১১ মাসে গড়ে ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ গ্যাস সিস্টেম লসের মুখোমুখি হয়েছে তিতাস গ্যাস। অপরদিকে জালালাবাদের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ।
পেট্রোবাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানী লিমিটেড (এসজিসিএল)-এর গড় সিস্টেম লস ১১ মাসে ১ দশমিক ২৫ শতাংশ, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানী লিমিটেড (পিজিসিএল)-এর ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেড (কেজিডিসিএল)-এর ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেড (বিজিডিসিএল)-এর ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ সিস্টেম লস হয়েছে।
এছাড়া, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানী লিমিটেড (জিটিসিএল)-এর সিস্টেম লস হয়েছে ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এটি মূলত গ্যাস সঞ্চালনের দায়িত্ব পালন করে।
আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, গ্যাস বিতরণে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ২০ থেকে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ সিস্টেম লস গ্রহণযোগ্য। পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাসস’কে বলেন, আমরা গ্যাসের সিস্টেম লস সহনীয় পর্যায়ে আনতে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে বিতরণ ও ট্রান্সমিশন পয়েন্টে গ্যাসের সিস্টেম লস পরিমাপের জন্য অনেক গ্যাস মিটার স্থাপন করেছে।
রাজধানীর মিরপুর এলাকার এক গৃহস্থালি গ্যাস ব্যবহারকারী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘সিস্টেম লসের কারণে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। এ বিষয়ে ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বাসস’কে বলেন, ‘সিস্টেম লস অবশ্যই কমাতে হবে। বিইআরসি তিতাস গ্যাসের বিশাল নেটওয়ার্ক বিবেচনায় দুই শতাংশ প্রযুক্তিগত ক্ষতি অনুমোদন করে। তবে, এর বেশি হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। এর চেয়ে বেশি সিস্টেম লস কোম্পানির অদক্ষতার ইঙ্গিত দেয়।’
পেট্রোবাংলার উপ-মহাব্যবস্থাপক ও মুখপাত্র তারিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘পুরনো পাইপলাইন নেটওয়ার্ক, টেকনিক্যাল সিস্টেম লস এবং গ্যাস বিতরণ কোম্পানি থেকে চুরিসহ বিভিন্ন কারণে এ সিস্টেম লস ঘটে।’
তিনি জানান, ‘গ্যাসক্ষেত্র থেকে ট্রান্সমিশন লাইনের মাধ্যমে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে সরবরাহ করা হয় এবং পরে ছয়টি বিতরণ কোম্পানির লাইন দিয়ে তা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায়।’
তারিকুল ইসলাম খান আরো বলেন, ‘বর্তমানে সারা দেশে অবৈধ সংযোগ, অবৈধ পাইপলাইন এবং মিটার টেম্পারিংয়ের বিরুদ্ধে একাধিক মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গ্যাস অপচয় কমানো গেলে চলমান ডলার সংকটের মধ্যে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে। তাদের অভিযোগ, বিপুল পরিমাণ গ্যাস অবৈধ সংযোগ ও মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে চুরি হচ্ছে। আর শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ গৃহস্থালি ব্যবহারকারীরা নিয়মিতভাবে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় অগ্রহণযোগ্য সিস্টেম লসের কারণে বিরক্তি প্রকাশ করছেন।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাসস’কে বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গড় গ্যাস সিস্টেম লস ছিল ৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ। গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে কাজ করেছেন এমন একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে তিতাস গ্যাস ও বাখরাবাদ গ্যাস প্রতিদিন বিপুল গ্যাস ক্ষতির মুখোমুখি হয়।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, ৩ জানুয়ারি ২৪ ঘণ্টায় দেশে এলএনজি-সহ ২ হাজার ৬৩৫ দশমিক ৫ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ হয়, যেখানে চাহিদা ছিল ৩ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি।
তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা সম্প্রতি অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে প্রচারণা জোরদার করেছেন। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিটি সিস্টেম লস ধীরে ধীরে কমিয়ে ৫ থেকে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপ প্রস্তুত করছে।
কর্মকর্তারা আরো বলেন, তাদের সিস্টেম লস পুরোপুরি দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে হয়েছে বলা যাবে না, বরং পুরনো পাইপলাইন নেটওয়ার্কে লিকেজকেও দায়ী করা উচিত। তিতাস গ্যাসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পাইপলাইন মেরামতের জন্য একটি দরপত্র (বিডিং) প্রক্রিয়া চলছে।