টি২০ বিশ্বকাপ ২০২৬ সমীক্ষা

নানা বিতর্কের মাঝে অনেকটা নিরুত্তাপ শুরু হলো ভারত, শ্রীলংকায় টি২০ বিশ্বকাপ ২০২৬। প্রথম দিনে গ্রূপ এ দুটি এবং গ্রূপ সি একটি মোট তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। কলম্বোতে অনুষ্ঠিত গ্রূপ এ প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানকে ঘাম ঝরিয়ে নেদারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৩ উইকেটে জয় পেতে হয়েছে। কলকাতা ইডেন গার্ডেনসে বাংলাদেশের পরিবর্তে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলায় প্রায় দর্শক শূন্য স্টেডিয়ামে ৩৫ রানের দাপুটে জয় পেয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। মুম্বাইতে স্বাগতিক এবং টুর্নামেন্ট ফেভারিট ভারতের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলে ২৯ রানে হেরেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ঘাম ঝরিয়ে ম্যাচ জিতেছে পাকিস্তান

কলম্বোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে চিরকালের অনিশ্চিত পাকিস্তান নিজেদের ব্যাটিং ধসের কারণে নেদারল্যান্ডসের কাছে ম্যাচ হারতে বসেছিল। প্রথমে ব্যাটিং করা ডাচ দলের ১৪৭ রানের জবাবে একসময়ে ২/৯৮ অবস্থানে ব্যাটিং মড়ক ধরে পাকিস্তান ১১৪ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে লজ্জাজনক পরাজয়ের হুমকিতে পড়েছিল। সৌভাগ্য অলরাউন্ডার ফাহিম আশরাফ ১৯তম ওভারে চার ছক্কার ঝরনা ঝরিয়ে পরাজয়ের করালগ্রাস থেকে দলকে রক্ষা করে। ১৯.৩ ওভারে ১৪৮/৭ করে ৩ উইকেটের কষ্টার্জিত জয় পায় পাকিস্তান।

নেদারল্যান্ডস: ১৪৭ অল আউট ( স্কট এডওয়ার্ডস ৩৭, বাস ডি লিডি ৩০, সালমান মির্জা ৩/২৪, সাঁইযুম আইয়ুব ২/৭, আবরার আহমেদ ২/২৩, মোহাম্মদ নেওয়াজ ২/৩৮)

পাকিস্তান ১৪৮/৭ ( সাহেবজাদা ফারহান ৪৭,ফাহিম আশরাফ ২৯*, সাইয়ুম আইয়ুব ২৪, বাবার আজম ১৫, পল ভ্যান মাকারীন ২/২০, আরিয়ান ২/৩৩)

পাকিস্তান ৩ উইকেটে জয়ী।

টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ। প্রথম ব্যাটিং করে ডাচরা ১৪৭ রানের মোটামুটি চ্যালেঞ্জিং স্কোর করেছিল। পাকিস্তান বোলিং খুব পেনিট্রেটিভ ছিল বলবো না। এই বোলিং নিয়ে পাকিস্তান টুর্নামেন্টে বেশি দূর যাবে বলে ভরসা হয় না। শাহীন আফ্রিদি বা সালমান মির্জাকে খুব আগ্রাসী মনে হয়নি। জানিনা পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে খেলবে কিনা। যদি খেলে, ভারতের তুখোড় ব্যাটিং কিন্তু পাকিস্তান বোলিংকে তুলোধুনো করবে। পাকিস্তানের ব্যাটিং জবাব শুরুতে ভালোই ছিল। সাহেবজাদা ফারহান (৪৭) আর সাঁইযুম আয়ুব (২৪), বাবর আজম সক্রিয়তায় একপর্যায়ে রান ছিল ২/৯৮। মনে হচ্ছিলো হেসে খেলে ম্যাচ জিতে নিবে পাকিস্তান। কিন্তু হটাৎ ঝড়ে লন্ড ভন্ড হলো পাকিস্তান ব্যাটিং। ৯৮ থেকে ১১৪ মাত্র ১৬ রানে একে একে বিদায় নিলো ফারহান, উসমান, বাবর, নেওয়াজ, শাদাব খান। ম্যাচ হেরে যাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। এই পর্যায়ে এসে ফাহিম আশরাফ বেপরোয়া ব্যাটিং করে ১১ বলে তিন ছয় আর দুই চারে অপরাজিত ২৯ রান করে জয় ছিনিয়ে আনলো। ১৪৮/৭ করে ৩ উইকেটের জয় পেলো পাকিস্তান।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ স্কটল্যান্ডকে সহজে হারালো

মূল সূচি অনুযায়ী বাংলাদেশের খেলার কথা ছিল বাংলাদেশের ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে। পশ্চিম বাংলা তথা কলকাতায় দারুন জনপ্রিয় বাংলাদেশকে রাজনৈতিক কারণে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ায় মুখ ফিরিয়ে নেয় দর্শক। সীমিত দর্শকের সামনে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৩৫ রানের সহজ জয় পেয়ে কাঙ্ক্ষিত জয় পেয়েছে দুই বারের টুর্নামেন্ট জয়ী ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড: ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১৮২/৫ ( শিমরন হেটমায়ার ৬৪, ব্রেন্ডন কিং ৩৫, শেরফান রাদারফোর্ড ২৬, রভমান পাওয়েল ২৪, ব্রাড কুরি ২৩/২)

স্কটল্যান্ড ১৪৭ অল আউট (রিচি ব্যারিংটন ৪২, টম ব্রুস ৩৫,রোমারিও শেফার্ড ৫/২০,জেসন হোল্ডার ৩/৩০)

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩৫ রানে জয়ী।

সবার জানা এই গ্রূপে অন্যতম জনপ্রিয় দল ছিল বাংলাদেশ। রাজনীতির দূষিত প্রভাবে বাংলাদেশকে এবারের বিশ্বকাপ বিসর্জন দিতে হওয়ায় শেষ মুহূর্তে সুযোগ পায় স্কটল্যান্ড। এবারের টুর্নামেন্টের অন্যতম ডার্ক হর্স ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভালো খেলে দাপুটে জয় তুলে নিয়ে টুর্নামেন্টে শুভ সূচনা করে। বাংলাদেশ থাকলে হয়ত পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারতো। প্রথমে ব্যাটিং করে ক্যারিবিয়ানরা শুরুতে সতর্কতার সঙ্গে খেলে ব্রেন্ডন কিং (৩৫) আর অধিনায়ক শাই হোপের (১৯) প্রথম উইকেট জুটিতে ৫৪ রানের  শুভ সূচনা করেছিল। পরবর্তীতে মিডেল অর্ডারে শিমরন হেটমায়ার (৩৬ বলে ৬৪) আর রোভম্যান পাওয়েলের (১৪ বলের ২৪) ৮১ রানের তৃতীয় উইকেট জুটির কল্যানে ১৮২/৫ ম্যাচ জয়ী সংগ্রহ করে। টুর্নামেন্টে কিছুটা অপ্রস্তুত স্কটল্যান্ডের এই স্কোর অতিক্রম করে  ম্যাচ জয়ের সামর্থ ছিল না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেস বোলিং অল রাউন্ডার্স রোমারিও শেফার্ড (৫/২০) আর জেসন হোল্ডার (৩/৩০)  তোপে স্কটল্যান্ড  ইনিংস ১৪৭ রানে গুটিয়ে যায়। স্কচ  অধিনায়ক ব্যারিংটন (৪২) আর ব্রুস (৩৫) প্রতিরোধ গড়ে তুললেও ম্যাচ জয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল না।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই দলে সত্তর দশকের বিশ্ব সেরা খেলোয়াড় না থাকলেও অনেক কার্যকরী ম্যাচজয়ী খেলোয়াড় আছে। গ্রূপ অফ এইটে অনেক দলের জন্য মাথা ব্যাথার কারণ হবে। যদি সেমি ফাইনাল খেলে অবাক হবো না।

মুম্বাইতে ভারতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র

টুর্নামেন্ট ফেভারিট ভারতের সঙ্গে প্রথম ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু চোখে চোখ রেখেই লড়াই করেছে। বড় ম্যাচ জয়ের অভিজ্ঞতা থাকলে ভারতের ১৬১/৯ তাড়া করে জয়ী হওয়া অসম্ভব ছিল না।ভারতের বিশ্বসেরা ব্যাটিং লাইন আপ যুক্তরাষ্ট্রের বোলিং মোকাবেলায় এক পর্যায়ে ৭/১১৮ ধুঁকছিল। অধিনায়ক সূর্য কুমার পরাজিত (৮৪ ) ছাড়া অন্য কেউ স্বস্তিতে ব্যাটিং করেনি। ঈশান কিষান (২০), অভিষেক শর্মা (০), তিলক ভার্মা (২৫), শিভাম ডুবে (০), রিঙ্কু সিং (৬), হার্দিক পান্ডিয়া (৫) রানে আউট হয়ে ভারত হেড কোচ গম্ভীরের মাথা ব্যাথার কারণ হয়েছে সন্দেহ নেই। দক্ষিণ আফ্রিকান অরিজিন আমেরিকান ভ্যান স্ক্যালভিকের (৪/২৫) দুর্দান্ত পেস বোলিং হকচকিয়ে দিয়েছিলো ভারত ব্যাটসম্যানদের। ভারতীয় আমেরিকান হার্মিত সিং (২/২৬) ভালো বোলিং করেছিল। দলের বিপর্যয় একাই সামলে নিয়েছে স্কাই। ১০ চার আর চার ছয়ে সাজানো ৪৯ বলে করা অপরাজিত ৮৪ রান ভারতকে লড়াই করার পুঁজি এনে দেয়।

দুর্ভাগ্য যুক্তরাষ্ট্রের। মিডল অর্ডারে সঞ্জয় কৃষ্ণমূর্তি (৩৭), শুভাম রঞ্জনে (৩৭) এবং মিলান্দ কুমার (৩৪) উইকেটে স্থিতু হয়েও ম্যাচ জয়ী ইনিংস খেলতে পারেনি। সিরাজ (৩/২৯), আর্শদীপ (২/১৮), আক্সার প্যাটেল (২/২৪) উঁচু মানের বোলিং মোকাবেলা করে ম্যাচ জয় করা যুক্তরাষ্ট্রের সামর্থ্যে কুলোয়নি। নিজেদের নির্ধারিত ওভারে ১৩২/৮ করে ২৯ রানে পরাজয় বরণ করে যুক্তরাষ্ট্র।  যাই হোক প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে লড়াই করেই হেরেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই টুর্নামেন্টে অন্য দলগুলোর জন্য সতর্ক সংকেত দিয়েছে।

ভারত ১৬১/৯ ( সূর্যকুমার ৮৪*, তিলক ভার্মা ২৫, ঈশান কিষান ২০, ভ্যান স্কাল ভিক ৪/২৫, হার্মিত সিংহ ২/২৬)

যুক্তরাষ্ট্র ১৩২/৮ সঞ্জয় কৃষ্ণমূর্তি (৩৭), শুভাম রঞ্জনে (৩৭) এবং মিলান্দ কুমার (৩৪) এবং মোহাম্মদ সিরাজ ৩/২৯, অর্শদীপ সিংহ ২/১৮, আক্সার প্যাটেল ২/২৪)

ভারত ২৯ রানে জয়ী।

মূলত যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী হয়ে আসা ক্রিকেটারদের সমন্বয়ে গড়া যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু শক্তিশালী দলে পরিণত হচ্ছে। সরকারি প্রণোদনা পেলে ক্রিকেট এবং ক্রিকেটারদের জন্য একটি বিকল্প কর্মসংস্থান হবে। হয়ত ১০ বছর পর ক্রিকেটের খোল নলচে পাল্টে যাবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

10 − 9 =