ঢাকায় দেখার আছে অনেক কিছু

নিবিড় চৌধুরী

ঢাকাবাসীর ঘোরাঘুরির জন্য সময় বের করা কঠিন বটে। সারাদিন অফিসের খাটাখাটনির পর কোথাও একটু ঘুরতে বের হতে হয়তো অনেকের ইচ্ছে করে না। সকাল ৯টার অফিস ধরার জন্য ৭টায় ঘুম থেকে উঠে আপনাকে ৮টায় বেরিয়ে পড়তে হয়। ৮-৯ ঘণ্টার অফিস শেষে যখন বাড়ি ফেরার জন্য বের হন তখন দেখা যায়, গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দিন পার। সূর্যদেব ততক্ষণে অস্তে গেছেন। এরপর বাস পেলেন তো, ঝুলে ঝুলে বাড়ি পৌঁছাতে জান কাবাব। শীতকাল হলে যা একটু সওয়া যায়। তবে গরমকালে লোকাল বাসে জ্যামের মধ্যে বসে থাকা নরকের সমান। তারপরও এমন নরকেই যেন কিসের এক আনন্দ। মানুষের ভিড়ে মিশে গিয়ে ভুলে থাকা যায় নিজের অনেক দুঃখ। সেই দুঃখ আরেকটু কমে যায় যদি ছুটির দিনে কোথাও একটু বন্ধু পরিজন নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন। সবার নিজস্ব কিছু জায়গা থাকে। ব্যক্তিগত জায়গা থেকে আমিও আজ তেমন কিছু জায়গার নাম বলব। ইতিমধ্যে ওসব জায়গায় হয়তো আপনি গিয়েছেন।

ছুটির দিনে অবশ্য সকালটা আমার কাটে বাসায়। দুপুর বা বিকেলে বেশিরভাগ সময় যাই হাতিরঝিলে। ঝিলের ওয়াটারবাসে চড়ে ঘোরাও দারুণ উপভোগ্য। কিংবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দুই পা ছড়িয়ে ঘাসে বসে বাদাম খেতে খেতে দেখা হয় ভাসমান জীবনের দৃশ্য। টিএসসি হয়ে শাহবাগ, কনকর্ড বা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ওপরে বাতিঘরে বই দেখে সময় কাটানোর মধ্যেও বিশেষ আনন্দ পাওয়া যায়। সময় একটু বেশি হলে নাজিরাবাজার-চানখারপুলে গিয়ে সোহাগ বা মিতালি হোটেলে বসে চাপ-পরোটা চিবিয়ে ঘরে ফেরা, এ জীবনে সেটাও কম কিসে! তবে সারাটা দিন যদি একটা জায়গায় কাটাতে চান, সেটি হলে আপনাকে তেমন জায়গা বেছে নিতে হবে। আজ আমরা সেসব জায়গায় যাব ঘুরে ঘুরে, পড়তে পড়তে।

বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চিড়িয়াখানা

ন্যাশনাল বোটানিক্যাল গার্ডেন বা জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান দেশে উদ্ভিদ প্রজাতি সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এই উদ্যান মিরপুরে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার পাশে অবস্থিত। ১৯৬১ সালে প্রায় ২০৮ একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় উদ্যানটি। ঢাকার আরেকটি উদ্যান বলধা গার্ডেন প্রশাসনিক দিক দিয়ে এই উদ্যানেরই অংশ। জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উদ্ভিদ উদ্যান। প্রতিবছর প্রায় ১৫ লক্ষ দর্শনার্থী উদ্যানটিতে বেড়াতে আসেন। ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে মিরপুর ১ এ নেমে চলে যেতে পারেন বোটানিক্যাল গার্ডেনে। প্রবেশ মূল্য (প্রাপ্ত বয়স্ক) ৩০ টাকা। এখানের পরিবেশ বেশ মনোরম। চারদিকে বিভিন্ন প্রকার গাছ ও উদ্ভিদের সমারোহ। বড় অংশজুড়ে রয়েছে শাল-গজারির সারি। ছোট এক বন বললেও ভুল হবে না। তবে মানুষের অসচেতনায় কিছু অসৌজন্যমূলক দৃশ্যও চোখে পড়ে, যা বেশ দৃষ্টিকটূ। বোটানিক্যাল গার্ডেনে বর্তমানে ১১৭টি গোত্রভুক্ত ৯৫২ প্রজাতির গাছপালা রয়েছে। এর মধ্যে ২৫৬টি প্রজাতির ৩৫ হাজার বৃক্ষ, ৩১০ প্রজাতির ১০ হাজার গুল্ম, ৩৭৮ প্রজাতির ১২ হাজার বিরুৎ ও লতা জাতীয় উদ্ভিদ। ছুটির দিনে এখানে প্রচুর ভিড় হয়।

বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশে রয়েছে চিড়িয়াখানা। প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা। ১৮৬ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত মিরপুর চিড়িয়াখানায় বর্তমানে ১৯১ প্রজাতির প্রায় ৪৯৭২টি প্রাণী রয়েছে। স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে রয়েছে হাতি, চিতা, গন্ডার, জেব্রা, ভোঁদড়, হায়েনা, হরিণ, জিরাফ, ইম্পালা, কালো ভাল্লুক, জলহস্তি, সিংহ, বানর ও শিম্পাঞ্জি। ৯১ প্রজাতির পাখির মধ্যে আছে ময়ূর, রিয়া, আফ্রিকান গ্রে প্যারোট, কেসোয়ারি, উটপাখি, এমু, টিলস, ফিঞ্চ, ছাতারে, প্যাঁচা, শকুন ও ঈগল। এখানের দুটি হ্রদে প্রতি শীতে অতিথি পাখির মেলা বসে। একদিন প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকতে চাইলে চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের মতো পরিবেশ ঢাকা শহরে আর কোথাও পাবেন না।

সাদুল্লাপুরের গোলাপ বাগান

মিরপুর বেড়ি বাঁধ হয়েই আপনি যেতে পারেন সাদুল্লাপুরের বিখ্যাত গোলাপ বাগানে। সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত এই বাগান। পুরো গ্রামটিই নানা রঙের নানা প্রজাতির ফুল দিয়ে ঘেরা। বিশেষ করে প্রচুর গোলাপ হয় এখানে। ছুটিতে লোকজনও গ্রামীণ পরিবেশ উপভোগ করতে আর গোলাপের সুবাস নিতে ছুটে আসেন। নদী পথে তুরাগ পাড়ি দিলেই পৌঁছে যাবেন সাদুল্লাপুর। ঢাকার মতো নগরের পাশে এমন এক গ্রাম দেখে একটু খটকা অবশ্য লাগেই।

জিন্দা পার্ক

জিন্দা পার্ক নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত একটি বিনোদন পার্ক ও অবকাশ যাপন কেন্দ্র। পার্কটির আয়তন ১০০ বিঘা। পূর্বাচল থেকে সহজে আপনি এই পার্কে যেতে পারবেন। যেতে যেতে দেখতে পাবেন ঢাকা শহরে এখনো টিকে থাকা সবুজের একাংশ। এই পার্কের ভেতরের লাইব্রেরিতে শ্যুটিং হয়েছিল আফরান নিশো অভিনীত বাংলাদেশের অন্যতম ওয়েব সিরিজ ‘কাইজার’। পার্কের ভেতরে প্রবেশের জন্য আপনাকে নিতে হবে ১০০ টাকার টিকিট।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্যই প্রথমবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। সাভারে গিয়ে আরেকটি কাজ করেছিলাম। ঘুরে এসেছিলাম বাংলাদেশের ইতিহাসের অমর সাক্ষী জাতীয় স্মৃতিসৌধ। স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও নিহত বেসামরিক বাঙালি ও অবাঙালিদের স্মৃতির উদ্দেশে এই স্মারক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। স্মৃতিসৌধে রয়েছে সাতটি স্তম্ভ, যা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের প্রধান সাতটি আন্দোলনের নিদর্শন বহন করে। দেশের ইতিহাসের সঙ্গে কিছু সময় কাটাতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন স্মৃতিসৌধে।

জাতীয় জাদুঘর

ইতিহাস কথা বলে। ইতিহাসকে চোখের সামনে দেখতে পাওয়াও কম কিসে! তার জন্য ঘুরে আসতে পারেন শাহবাগ মোড়ে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে। এখানে নৃতত্ত্ব, চারুকলা, ইতিহাস, প্রকৃতি এবং আধুনিক ও প্রাচীন বিশ্বসভ্যতা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলাদা ৪৫টি গ্যালারি রয়েছে। এছাড়া এখানে একটি সংরক্ষণাগার, গ্রন্থাগার, মিলনায়তন, সিনেপ্লেক্স এবং চলচ্চিত্র গ্যালারিও রয়েছে। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি পাঁচদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে জাতীয় জাদুঘর। প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রবেশ মূল্য ৪০ টাকা।

আহসান মঞ্জিল ও লালবাগ কেল্লা

এই দুই ঐতিহাসিক স্থাপনা ঢাকার সাক্ষী হয়ে আছে কয়েক শ বছর ধরে। পুরান ঢাকার ইসলামপুরের কুমারটুলী এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত আহসান মঞ্জিল। এটি পূর্বে ছিল ঢাকার নবাবদের আবাসিক প্রাসাদ ও জমিদারির সদর কাচারি। বর্তমানে এটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর প্রতিষ্ঠাতা নওয়াব আবদুল গনি। ১৮৫৯ সালে আহসান মঞ্জিলের নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৮৭২ সালে। ১৯০৬ সালে এখানে এক অনুষ্ঠিত বৈঠকে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়।

লালবাগ কেল্লা মোঘল আমলের বাংলাদেশের একমাত্র ঐতিহাসিক নিদর্শন। এটি নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে কষ্টি পাথর, মার্বেল পাথর আর  নানা রঙের টালি। লালবাগ কেল্লা ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শনে এমন কিছুর সংমিশ্রণ পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিক এই দুর্গ দেখতে গুলিস্তান, শাহবাগ বা কার্জন হলের সামনে থেকে রিকশা, সিএনজি অটোরিকশাতে উঠে বসলেই হবে। প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য টিকিট ফি মাত্র ১০ টাকা।

নভোথিয়েটার

প্রকৃতি ও ইতিহাসের পাশাপাশি এবার একটু ঘুরে আসা যাক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দুনিয়া থেকে। বিজয় সরণিতে অবস্থিত নভোথিয়েটার। এখানে নভোমণ্ডল সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য এবং নভোমণ্ডলের ধারণা পাওয়ার জন্য কৃত্রিম নভোমণ্ডল তৈরি করা আছে। বুধবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি ছয়দিনই যাওয়া যাবে নভোথিয়েটারে। প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য প্রবেশ মূল্য ১০০ টাকা।

এছাড়াও ঢাকা শহরে দেখার মতো রয়েছে অনেক কিছু। বুড়িগঙ্গার পাড়, রমনা পার্ক, চন্দ্রিমা উদ্যান,  বায়তুর রউফ মসজিদ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, কেরানীগঞ্জের সারিঘাট, শীতলক্ষ্যার পাড়, ধামরাইয়ের ষাইট্টা বটগাছ, পূর্বাচলের নকশি পল্লি, উত্তরখানের বাওথার, কবি-লেখকদের স্মৃতিবিজড়িত বাংলাবাজারের বিউটি বোর্ডিং, টিকাটুলির রোজ গার্ডেন, বলধা গার্ডেন, বাহদুর শাহ পার্কসহ আরও অনেক দর্শনীয় স্থানে বেরিয়ে পড়তে পারেন ছুটির দিনে। খরচ যে খুব বেশি হবে এমন নয়। তবে পুরো দিনটি কাটাতে পারবেন চোখ ও মনকে আনন্দ দিয়ে।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: কোথায় কি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

18 − seven =