নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ করবে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

‘জেন্ডার সংবেদনশীল জ্বালানি ভবিষ্যতের জন্য কণ্ঠস্বর’ প্রতিপাদ্যে জাতীয় পর্যায়ের সম্মেলনের আয়োজন করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। ঢাকার সামরিক জাদুঘরে রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়।

প্রযুক্তি ও অর্থায়নের পাশাপাশি জ্বালানি রূপান্তরের সামাজিক দিক সমতা, অন্তর্ভুক্তি ও ন্যায্যতা নিয়ে এখনে আলোচনা হয়। পাশাপাশি তৃণমূলের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে নীতিমালা ও বিনিয়োগ সুপারিশে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্যে এমজেএফ-এর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, এমজেএফ গত ২৩ বছর ধরে তৃণমূল পর্যায়ে সেবা ও সুযোগ-সুবিধায় মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তিনি বলেন, জলবায়ু ঝুঁকি নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাব ফেলে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরে এসব বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে। বিশেষ করে গৃহস্থালি রান্নার মতো ক্ষেত্রে, যেখানে নারীদের দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিও বড়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

তিনি বলেন, “তাই জ্বালানি হবে পরিচ্ছন্ন, হবে সবুজ, হবে মানুষের কল্যাণে।” একইসঙ্গে তিনি বলেন, আগামীতে যে সরকারই গঠন করুক না কেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখতে হবে।

প্রথম অধিবেশন ‘নারীর ক্ষমতায়নের আলোকে জ্বালানি নীতি ও সুশাসন’-এ সভাপতিত্ব করেন এমজেএফ-এর রাইটস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স প্রোগ্রামসের পরিচালক বনশ্রী মিত্র নিয়োগী। তিনি আলোচনার কেন্দ্রে সকলকে উদ্দেশ করে একটি প্রশ্ন তোলেন, “ন্যায্য রূপান্তর কার জন্য?” তিনি বলেন, কোনো জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে কোনো রূপান্তরকে ন্যায্য বলা যায় না।

অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার মধ্যে কোনগুলো ‘আলোচনাযোগ্য’ এবং কোনগুলো আলোচনারও বাইরে, এটি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষ করে নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ ঘরোয়া রান্নার জ্বালানিকে আবশ্যিক প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বাংলাদেশভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি নির্দেশিকা, বিকেন্দ্রীভূত অর্থায়ন, কমিউনিটি গ্রিড এবং জনগণকে নিয়মিত অবহিত করার কথা বলেন। পাশাপাশি প্রতি ত্রৈমাসিকে ‘জেন্ডার জেট ড্যাশবোর্ড’ প্রকাশের প্রস্তাবও দেন।

বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশনের পরিবেশ ও জ্বালানি কর্মসূচির ব্যবস্থাপক তানজিনা দিলশাদ বলেন, জ্বালানি খাতে বাস্তবায়ন পর্যায়ের অনেক ভূমিকায় নারী এখনো কম প্রতিনিধিত্বশীল। তিনি বলেন, নারীবান্ধব নীতি প্রয়োজন, যেখানে ক্যারিয়ারের বিরতি স্বীকৃতি পাবে, কাঠামোগত বৈষম্য কমবে, এবং নারীরা কোনোরূপ বাধা ছাড়াই অংশগ্রহণ করতে পারবেন। তিনি শক্তিকন্যা উদ্যোগকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর ক্ষেত্রে তরুণ নারীদের যুক্ত হওয়ার একটি সহায়ক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ক্লিন (CLEAN)-এর প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, জ্বালানি সুশাসনকে আরও বিকেন্দ্রীভূত ও গণতান্ত্রিক করা প্রয়োজন। তিনি স্বল্প বা শূন্য সুদে ঋণসহ সাশ্রয়ী অর্থায়ন ব্যবস্থা এবং নারী নিয়োগে শক্তিশালী প্রণোদনার সুপারিশ করেন। পাশাপাশি তিনি বলেন, নারী নিয়োগের লক্ষ্য ১০ শতাংশের বেশি নির্ধারণ করে এগোতে হবে।

দ্বিতীয় অধিবেশন ‘পাওয়ার ইক্যুয়ালিটি বিজনেস’-এ সভাপতিত্ব করেন ইউএন উইমেনের জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও মানবিক সহায়তা কর্মসূচির বিশেষজ্ঞ দিলরুবা হায়দার। তিনি বলেন, দ্রুতগতির জলবায়ু সংকট নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জরুরি পথ হিসেবে সামনে আনছে। তবে এ খাতে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পুরুষদের সক্রিয় অংশগ্রহণও প্রয়োজন।

সুইডেন দূতাবাসের ইনক্লুসিভ ইকোনমিক ডেভেলপমেন্টের সেকেন্ড সেক্রেটারি ফ্রেড্রিকা নোরেন বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন থেকে শুরু করে অর্থায়নে প্রবেশাধিকার পর্যন্ত জেন্ডার সংবেদনশীল রূপান্তর বাস্তবায়নে সমাজের নানা স্তরে পরিবর্তন দরকার। তিনি নারীদের জন্য বিনিয়োগে প্রবেশাধিকার সহজ করা, জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি খাতভিত্তিক বিকেন্দ্রীভূত তহবিল গঠনের সুপারিশ করেন। একইসঙ্গে তিনি আরো বলেন, অর্থায়ন আলোচনা ও কাঠামোতে জেন্ডার সংবেদনশীলতাকে মূল উপাদান হিসেবে রাখতে হবে।

‘ফর দ্য লাইট’-এর প্রতিষ্ঠাতা নাভিদ হাসান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক উদ্যোক্তা ও মালিকানায় নারী এখনো অনেকটাই অনুপস্থিত। তিনি জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করতে লক্ষ্যভিত্তিক গ্রিন ফাইন্যান্সিং ও প্রশিক্ষণসহ আর্থিক নীতি শক্তিশালী করার কথা বলেন।

‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার’-এর সম্পাদক মোল্লাহ আমজাদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো কম এবং অনেক স্থাপিত সোলার প্যানেল পুরোপুরি ব্যবহার করা হচ্ছে না। তিনি নারীদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, সোলার সেঁচকে টেকসই ব্যবসায়িক মডেলে রূপ দেওয়া এবং স্থানীয় সরকারের সহায়তায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুপারিশ করেন।

তৃতীয় অধিবেশন ‘সংলাপ থেকে অঙ্গীকার: জেন্ডার সংবেদনশীল জ্বালানি ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহি’-তে সভাপতিত্ব করেন শাহীন আনাম।

ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর সদস্য সচিব শরীফ জামিল বলেন, আলোচনা থেকে এখন অঙ্গীকারে যেতে হবে। বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী ইশতেহারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকা জরুরি।

বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক ফাহিমা নাসরিন মুন্নি বলেন, নারীর অংশগ্রহণ নানা খাতে সীমাবদ্ধ, জ্বালানি খাতে নারীরা বিশেষভাবে ‘অদৃশ্য’। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পুরুষদের আধিপত্য এখনো প্রকট। জলবায়ু বাস্তবতায় অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন আরও বেড়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে জ্বালানি খাতে নারীরা যে সংকটে পড়েন, তা নিয়ে তার দল গুরুত্ব দিয়ে দেখবে।

এনসিপি-এর মুখ্য যুগ্ম সমন্বয়ক নাভিদ নওরোজ শাহ্ নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে কথা বলেন এবং আশাবাদ ব্যক্ত করেন, আগামী দিনে নারীর ক্ষমতায়ন জোরদারে দলটি কাজ করবে।

জাতীয় পার্টির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাতীয় সাংস্কৃতিক পার্টির সহ সভাপতি এবং ঢাকা-১০ আসনের মনোনীত প্রার্থী বহ্নি ব্যাপারী নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বায়োগ্যাসকে একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দলীয় আলোচনার ভেতরে থেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জেন্ডার সংবেদনশীলতার বিষয়টি এগিয়ে নিতে কাজ করবেন।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন বিভিন্ন নীতিনির্ধারক, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক, গণমাধ্যমকর্মী, রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং তরুণ ও নারী নেতৃত্ব। এ আলোচনায় গুরুত্ব পায়, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কীভাবে নতুন এক রূপান্তর ঘটাবে। নারী, ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যেন এক্ষেত্রে পিছিয়ে না পড়ে, সেটিও জোর দিয়ে দেখা হয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

four × 2 =