নারীর নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা

ইমদাদ ইসলাম

সমাজে প্রতিটি মানুষ সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ নং অনুচ্ছেদের মাধ্যমে বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদটি বাংলাদেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা সাম্য ও সমতার নীতি প্রতিষ্ঠা করে। অনুচ্ছেদ ২৮(১) এ উল্লেখ করা হয়েছে, কেবল ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, নারী-পুরুষ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র কোনো বৈষম্য করবে না। অনুচ্ছেদ ২৮ এর ২ এবং ৩ এ বলা হয়েছে, রাষ্ট্র ও গণজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার থাকবে। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, নারী-পুরুষ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিককে কোনো সাধারণ বিনোদন বা বিশ্রামস্থল বা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ বা ভর্তির ক্ষেত্রে কোনো অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্ত আরোপ করা যাবে না। অনুচ্ছেদ ২৮ এর ৪ এ উল্লেখ করা হয়েছে, এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই নারী বা শিশুদের অনুকূলে অথবা নাগরিকদের কোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য রাষ্ট্রকে কোনো বিশেষ বিধান প্রণয়ন করা থেকে বিরত রাখবে না।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ নং অনুচ্ছেদের মাধ্যমে বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া সত্ত্বেও এখনো অনেক নারী বৈষম্যের স্বীকার। দেশের মোট জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী , তাঁরা বহু ক্ষেত্রে প্রান্তিক। সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে এ সব প্রান্তিক নারীদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে নানারকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা সত্ত্বেও এখনো অনেকেই সচেতন হননি। সমাজে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক নারীদের জন্য সরকার যে কাঠামোগত সুরক্ষা ও সেবা দিচ্ছে তা নিয়ে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক নারীদের সচেতন করার লক্ষ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের জেলা তথ্য অফিসগুলো নিয়মিত উঠোন বৈঠক ও মহিলা সমাবেশ করে থাকে। বিশেষ করে  উঠোন বৈঠকগুলোর আযোজন করা হয় সমাজে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক নারীদের এলাকায় । এসব উঠোন বৈঠকের সময়ও নির্ধারনের সময় গুরুত্বের সাথে  প্রান্তিক নারীদের অবসর সময়ের বিষয় বিবেচনা করা হয় এবং তাদের ব্যাপক উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। জেলা সমাজ সেবা অফিসার বা জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এসব উঠোন বৈঠক ও মহিলা সমাবেশে বক্তব্য রাখেন এবং উপস্থিত নারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়ে তাদের সচেতন করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। এ অনুষ্ঠানগুলো খুবই ফলোপ্রসূ হয়ে থাকে। এছাড়াও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ তথ্য অধিদফতর পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক নারীদের সচেতন করার লক্ষ্যে জনপ্রিয় প্রচার কৌশলের সাহায্য নিয়ে বিভিন্ন প্রচার প্রচারণা করে থাকে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতার এবং টেলিভিশনও প্রচার প্রচারণা করে থাকে।

আমাদের মধ্যে একটা ধারণা আছে প্রান্তিক নারী মানে কেবল দূরবর্তী এলাকার নারী। আসলে তা না পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক নারী মানে কেবল দূরবর্তী এলাকার নারী নয়, বরং যাঁরা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক বঞ্চণার মধ্যে আছেন তারাও প্রতিবন্ধী নারী, জাতিগত সংখ্যালঘু, দরিদ্র, বয়োবৃদ্ধ সবাই এই শ্রেণিতে পড়ে। প্রান্তিক নারীদের সমস্যা বহুমাত্রিক। চা বাগানের শ্রমিক, দৌলতদিয়ার যৌনকর্মী, প্রতিবন্ধী নারী, চরাঞ্চলের নারী, নৃগোষ্ঠী, দলিত বা হিন্দু নারী সবার সমস্যা এক রকম না। তাদের সমস্য যেমন ভিন্ন সমাধানও হবে ভিন্ন ভিন্ন। সচেতনতার অভাবে অনেকেই সরকারি বিভিন্ন সুবিধা নিতে পারেন না।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমাজসেবা অধিদপ্তর সবচেয়ে বড়ো নিরাপত্তাবলয় পরিচালনা করছে। গত বছর সমাজসেবা অধিদপ্তর ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে, চলতি বছরে বরাদ্দ আরও বেশি। আমাদের বড়ো সংকট রাষ্ট্র এখনো ভাতাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরোতে পারেনি। ভাতা ও ভিত্তি সব সমস্যার সমাধান নয়। সংবিধান অধিকার দিয়েছে, কিন্তু সংকট রয়েছে সামাজিক মন, চেতনা ও গ্রহণযোগ্যতায়। ডোম, হাজাম বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজকে ব্রিটিশ আমলের মতোই নিচু শ্রেণির কাজে ধরে রেখে নিয়মিত ভাতার জালে আটকে রাখা হচ্ছে, যাতে তাঁদের অনগ্রসরতা টিকে থাকে। এখনো নারীরা ম্যানহোল পরিষ্কার করেন পুরো শরীর পানিতে নামিয়ে ,এটা কাঠামোগত বৈষম্যের নির্মম চিত্র। নারী শ্রমিকের মজুরিবৈষম্য এখনো আইনি কাঠামোয় জায়গা পায়নি।

তবে ভাতাকে চূড়ান্ত সমাধান মনে করা ঠিক না এটি স্বীকৃতির প্রতীক। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও উপবৃত্তিসহ অনেক সরকারি উদ্যোগ রয়েছে। অনগ্রসর জনগোষ্ঠী, চা শ্রমিক সবাই সরকারের কাঠামোগত সুরক্ষার আওতায় আছে। সরকার সরাসরি তাঁদের কাছে ভাতা পৌঁছে দিচ্ছি, যাতে নারীরা নিজেরাই অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পান। ভাতার বাইরেও সরকারের বিভিন্ন সেবামূলক ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি আছে ,যেমন পল্লী সমাজসেবা, পল্লী মাতৃকেন্দ্র, শিশু পরিবার, যৌন শোষণের শিকারদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন এবং সারা দেশে সেফ হোম। এগুলো নারীর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের জন্য অপরিহার্য। সরকার ভাতার সঙ্গে বিকল্প জীবিকা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও নারী নেতৃত্ব গড়ার কর্মসূচি চালু করেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বেও নতুন সুযোগ আছে। প্রান্তিক নারীদের নির্যাতন বা বৈষম্যের বিষয়গুলো তাৎক্ষণিকভাবে মোকাবিলার জন্য ইউনিয়ন সোশ্যাল ফোর্স রয়েছে। বাস্তবতা হলো দেশে শুধু বয়স্ক ভাতাভোগীই ৬১ লাখ, বিধবা ভাতা আরও প্রায় ৩০ লাখ। এত জনসংখ্যার দেশে সীমিত সম্পদ দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো পরিচালনা করাও কঠিন।

নারীর অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও প্রবেশগম্যতার ঘাটতি একটি বড়ো বাধা। বিচারব্যবস্থায় পৌঁছানো, সরকারি সেবা পাওয়া,এসব জায়গায় অভিগম্যতা এখনো দুর্বল। নারীদের শিক্ষায়, পুষ্টিতে, তথ্য ও বিচারব্যবস্থায় প্রবেশগম্যতা, পরিবহণ সুবিধা এসব কাঠামোগত অধিকার নিশ্চিত করা গেলে সমস্যার অনেকটা সমাধান করা যেতো। সরকারের নানা রকম চেষ্টা সত্ত্বেও শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক প্রভাব তাদের মৌলিক অধিকার ও যোগ্য শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে। সরকারি সেবা পেতে গেলে ‘অনগ্রসর শ্রেণি’ নামে উল্লেখ থাকলেও প্রকৃত দলিত নারীরা সঠিক সুবিধা পাচ্ছে না; কারণ সচেতনতার অভাবে এসব তথ্য তারা জানেই না। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে প্রান্তিক নারীরা নানারকম বাধার মুখে পড়ে, অথচ তাঁদের অধিকাংশই জানেন না, কোথায় তাঁদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুবিধা আছে বা কীভাবে সেগুলোতে প্রবেশ করা যায়। আইনি সহায়তা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের অনেকেই জানে না যার কারণে সুবিধা নিতে পারছে না।

পাহাড় কি সমতল সব জায়গায় প্রান্তিক নারীদের আর একটা বড়ো সমস্যা হলো তারা প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে থাকে। বৈষম্য এবং নির্যাতনের শিকার হলে তারা প্রতিকার বা বিচার চাইতে পারে না। ফলে সেখানে একটি অদৃশ্য ভয়ের এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। কোন নারী বৈষম্যের বা নির্যাতনের শিকার হলে বিচার চাইতে আদালতে যাবেন, তিনি তা চিন্তাও করতে পারেন না; বরং মনে করেন যে আমি যখন নির্যাতনের শিকার হলাম, বৈষম্যের শিকার হলাম, আমি বরং চেপে যাই, যাতে লোকজন কম জানে। এই ভয়ের সংস্কৃতি এবং বিচারহীনতা সংস্কৃতি থেকে যত দিন পর্যন্ত আমরা ঐ সব প্রান্তিক নারীদের বেরিয়ে আনতে না পারব, তত দিন আইনি সেলটার যতই থাকুক বৈষম্যের অবসান হবে না।

নারী পরিচিতি নিজেই একটি প্রান্তিক পরিচিতি, তবে সব নারীর প্রান্তিকতা সমান নয়। লিঙ্গ, ধর্ম, গোষ্ঠী ও শারীরিক সুস্থতা বা প্রতিবন্ধিতার ভিন্নতা মিলেই এক একটি ব্যক্তিসত্তা ও ব্যক্তিবিশেষের প্রান্তিকতার স্বরূপ নির্ধারিত হয়। দেশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্টভাবে কাঠামোগত প্রান্তিক অবস্থানে থাকা জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারীদের উন্নয়নে প্রবেশগম্যতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তাদের সমাজের মূল স্রোতে আনতে হবে। নারীর বিচার বিভাগে প্রবেশগম্যতা, শ্রম সংস্কার, নারী অধিকার এগুলো নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে। সামাজিক সুরক্ষাসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রান্তিকতার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নীতি অনুসরণ করা দরকার। প্রতিবন্ধী নারীর ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত সহায়তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে, যেন তাদের বিচার, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে প্রবেশে বাধা না আসে। হিন্দু ও দলিত নারীদের অধিকার রক্ষায় আইন সংস্কার এবং বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা জরুরি। নারীর সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, দক্ষতা বৃদ্ধি করা, শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রাধিকার দেওয়া, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে তাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্বশিল ভূমিকা পালন করতে হবে । আর এর মাধ্যমে আগামীর নতুন বাংলাদেশ একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র পরিণত হবে।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, খাদ্য মন্ত্রণালয়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

15 + sixteen =