পিংক ফ্লয়েডের সঙ্গীত

উপল বড়ুয়া

Music is a higher revelation than all Wisdom & Philosophy—Beethoven

পিংক ফ্লয়েডে একজন পাগল ছিলেন। তিনি সিড ব্যারেট। এমন পাগল খুব কমই থাকেন। যিনি ঘাসের ওপর যত্রতত্র বসে ছিঁড়তে থাকেন ঘাস। সবুজ নরম ঘাস। আর কাগজের প্লেন বানিয়ে বাতাসে ছুঁড়ে মারেন। পারফরম্যান্সের সময় এলএসডি নিয়ে গিটার বাজাতে বাজাতে হঠাৎ ঢুকে পড়েন বেসুরে। দর্শক মনে করে এই বেসুরটাও এক প্রকার এক্সপেরিমেন্ট। যেহেতু তিনি ব্যারেট, সিড ব্যারেট। স্টেজে দলের  অন্যান্য সদস্যরাও থেমে পড়েন তার এমন কারিকুরিতে। পাশে পরম বন্ধু রজার ওয়াটার্স মুচকি হেসে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। দেখেন, একজন রকস্টার ব্যারেটকে কিভাবে গিলে খাচ্ছে পাগলসব মানুষ।

The lunatic is on the grass

The lunatic is on the grass

 

The lunatic is in my head

You raise the blade, you make the change

You re-arrange me ’till I’m sane

You lock the door

And throw away the key

There’s someone in my head but it’s not me—[Brain Damage]

ব্যারেট-ওয়াটার্সরা প্রথম দিকে তাদের শো-গুলোতে বিভিন্ন নাম নিয়ে বাজাতেন। অনেক পরে একটা স্থায়ী নাম হয়। পিংক ফ্লয়েড। এবং সাইকেডেলিক ও প্রোগ্রেসিভ রক দুনিয়ায় নিয়ে আসেন অভিনব সব গান। তখন আরেক রক গুরু ‘দ্য লিজার্ড কিং’ খ্যাত জিম মরিসন তার ‘দ্য ডোরস’ নিয়ে তুঙ্গে। ‘কামন বেবে লাইট মাই ফায়ার’, ‘রাইডার্স অন  দ্য স্ট্রর্ম’, পিপল আর স্ট্রেঞ্জ হুয়েন ইউ আর স্ট্রেঞ্জার’—এমন অনন্যসব সাইকেডেলিক মিউজিকে হতাশাবাদী ও দুনিয়া বিমুখ শ্রোতাদের পাগল করে দিচ্ছেন। ব্যারেটের কথা উঠলেই আমার জিম মরিসনকে মনে পড়ে। দুজনের ভেতরে পাগলামি থাকলেও চরিত্র প্রকাশে দুজনই খুব আলাদা।

তারপর অদ্ভুত সব লিরিক ও মিউজিক দিয়ে ব্যারেট মানসিক রোগ নিয়ে পিংক ফ্লয়েড থেকে সরে পড়লেন। গুজব উঠলো, ‘ব্যারেট ইজ নো মোর’। রকস্টারদের জীবন যেরকম হয় আর কী। এলেন ডেভিড গিলমোর। আরেকজন ক্ষ্যাপা। ফ্লডিয়ানরা ভালবেসে ডাকে ‘বুড়ো চাচা’। আর এদিকে ওয়াটার্স, নিক ম্যাসন ও রিচার্ড রাইট তো আছেনই।

পিংক ফ্লয়েডের সবচেয়ে বড় জায়গাটা হলো গান নিয়ে তাদের প্রচুর এক্সপেরিমেন্টের বিষয়টা। গানে তারা উল্লেখযোগ্যভাবে ‘ফোলি’ সাউন্ড নিয়ে কাজ করেছেন। হেলিকপ্টারের ভোঁ শব্দ, গাড়ির হর্নের রাগী আওয়াজকেও গানের ভেতরে চূর্ণ করে মিশিয়ে দিয়েছেন। কিংবা ইউটিউবের বদান্যতায় আপনার নিশ্চয় সেই বিখ্যাত পম্পে’তে করা ‘ইকোস’টা শোনা আছে, যেন পুরোনো গ্ল্যাডিয়েটর ঘোড়া দাপিয়ে ছুটে যাচ্ছে যুদ্ধে। ডেল-এর মন্দিরে ঘণ্টা বাজার ধ্বনি শোনা যায়। পুরোহিতের আদি ভবিষদ্বাণী। তখন মাথা ঝিম ঝিম লাগে। উইডের তালে তালে কুচকাওয়াজ করতে করতে আমরা আরেকবার ঢুকে পড়ি একটা প্যারানয়েড জগতে।

There is no pain, you are receding

A distant ship smoke on the horizon

You are only coming through in waves

Your lips move but I can’t hear what you’re saying

When I was a child, I had a fever

My hands felt just like two balloons

 

I have become comfortably numb—[comfortably numb]

একটি ব্যক্তিগত দুঃখ নিয়ে বিষণ্ন সন্ধ্যায় একজন লোক জাবর কেটে চলেছে পুরোনো দিনের স্মৃতি। যাকে ডাকনাম দেওয়া যায় ‘শৈশব’। পৃথিবী বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী এতই ছোট হয়ে যাচ্ছে দিন দিন; নিঃশ্বাস নেওয়ায় কষ্টকর। বাংলা গানে এবং বাংলা কবিতায় বেশ কিছু পিংক ফ্লয়েড প্রভাবিত কাজ আছে। বিশেষ করে লিরিক প্রভাবিত। বলতে গেলে, ফ্লয়েড অত্যন্ত ইন্সপিরিশনাল ও প্রভোকেটিভ। এবং আমরা তো জানি, গানের কোনো সীমানা নেই। তার কেবল স্মৃতিই আছে। স্মৃতিই মূলত ইউনিভার্সাল ট্রুথ। সেই স্মৃতির দিকে ফেরার জন্যই মানুষ আরও কয়েকটা দিন বেঁচে থাকে। স্মৃতির দিকে ফিরতে চাওয়াটা একটা ঘোর। মানুষ আসলে একেকটা পতিত আত্মা। মাছের মতো যে অথৈ সমুদ্রের নোনা জলে দিকহীন সাঁতার কেটে চলেছে অবিরাম।

We’re just two lost souls
Swimming in a fish bowl
Year after year
Running over the same old ground
What have we found?
The same old fears
Wish you were here—[Wish You Were Here]

পিংক ফ্লয়েড জীবনের সত্যটা উদ্ঘাটন করার চেয়ে বা সমাধানের চেয়ে জীবন-নামক গোলকধাঁধাঁয় মানুষের যে ভূমিকা ও জার্নি তাকেই যেন ধরতে চায়। এই ধরতে গিয়ে মানুষের শৈশব, সময় বা সময়হীনতার দিকে ফেরার তাড়না থেকে এক প্রকার উদ্বাস্তুতা ভেসে ওঠে। পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসন ফরাসি দার্শনিক অঁরি বেঁগসর গতিতত্ত্ব অনুযায়ী মঞ্চে ভেসে উঠেন মুনওয়াকে। আর গিলমোর তুলে নেন ‘ল্যাপ স্টিল গিটার’। শুরু হয় আনন্দদায়ী যন্ত্রণা। গিটার আমাদের ডুবিয়ে মারে।

The grass was greener

The light was brighter

The taste was sweeter

The nights of wonder

With friends surrounded

The dawn mist glowing

The water flowing

The endless river

Forever and ever—[High Hopes]

পিংক ফ্লয়েডের পরিমিতিবোধ এবং নিক ম্যাসনের ড্রামের তালে তালে লিরিকের ঝংকার; মূলত এই শিহরণ থেকেই ওঠে আসে প্রচণ্ড অভিজ্ঞতা। পিংক ফ্লয়েডকে চিৎকার করে বলতে হচ্ছে না—যুদ্ধ থামাও। মানুষকে মুক্তি দাও। স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট নিপাত যাক। আন্দোলন হোক। শিক্ষার নামে মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া যাবে না। পিংক ফ্লয়েডের গান নর-নারীর প্রেম, প্রেস ক্লাব বান্ধব আন্দোলন, দেয়ালনির্ভর পোস্টার সাঁটানোর চেয়ে অধিক কিছু। সেখানে জোর নেই, জবরদস্তি  নেই। আছে কেবল গিটারের উন্মাদনা। যেহেতু গিটার নিজেই এক বিপ্লব। অসহায় মানুষ যেখানে খুঁজে পায় বেঁচে থাকার, কথা বলার নির্ভরতা।

We don’t need no education

We don’t need no thought control

No dark sarcasm in the classroom

Teachers leave them kids alone

Hey teacher leave them kids alone

All in all it’s just another brick in the wall

All in all you’re just another brick in the wall—[Another Brick In The Wall]

যে শিল্প নিজের জন্য সেটা তো মানুষের জন্য হয়ে উঠবেই। পিংক ফ্লয়েড ফিরিয়ে আনে করুণ আকুতি। সে বলে নিঃশ্বাস নাও। ছাড়ো। দেখো কেমন আদিম ও পবিত্র হয়ে উঠেছো তুমি। কেমন লাগে প্রতিদিন নোংরা ও সুন্দরের ভেতর বেঁচে থাকতে? মিউজিক পবিত্র জিনিস। যেমন আমরা। গ্রহণ করো। দুঃখই তোমার সুন্দরের প্রস্তাবনা। একটা লাশকাটা ঘর। একটা দৃশ্য ও সিম্বলিক অনুভূতি তোমাকে নিয়ে যাচ্ছে হিমমগ্ন গভীরে। মরণফাঁদ। শিকার। সফলতার চেয়ে সুখি হও। নিজের কাছে।

Breathe, breathe in the air

Don’t be afraid to care

Leave but don’t leave me

Look around and choose your own ground—[Breathe]

গিলমোর যখন তার গিটার থেকে ছেড়ে দিচ্ছেন স্মৃতিমগ্ন ‘ইকোস’ তখন বেদনার্ত স্বরে গানারদের গল্প করছেন ওয়াটার্স। এক গোলন্দাজ—যার স্বপ্ন নিহত হয়েছে যুদ্ধে। আর স্মৃতির ফাঁদ থেকে বের হতে পারছেন না তিনি। রাতের পর পর সেই স্বপ্ন পাগল করে দিচ্ছে।

Night after night, going ’round and ’round my brain

His dream is driving me insane—[The Gunner’s Dream]

কেবল তা নয়, ওয়াটার্স চান এক মুক্ত রাজহংস হতে। হতে চান, দেরি করে ঘরে ফেরা ট্রেন। কাঁদতে চান একাকীত্বে। জানতে চান, কখনো পাগল হয়ে গেলে তাকে কী খেলায় নেওয়া হবে? এত সহজভাবে ওয়াটার্স প্রশ্নগুলো তুলেছেন মনে হয়, এ তো আমাদের কথা, প্রতিটি মানুষের গল্প।

If I were alone, I would cry

And if I were with you, I’d be home and dry

And if I go insane

Will you still let me join in with the game?—[If]

তেমনি তিনি মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করছেন, বিপদে-আপদের করণীয় সম্পর্কে। একেকটি খণ্ড দৃশ্যের মতো মায়ের কাছে অনেক জিজ্ঞেসা নিয়ে বসে আছে সন্তান। মা জানেন ছেলের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব। আর দুঃখের দিনে স্বান্তনার স্বরে বলছেন, ‘চুপ থাক খোকা, খোকারে, কান্দিস না আর।’

‘অ মা, আমার কি দৌড়ানো উচিৎ প্রেসিডেন্টের তরে?

মা রে, আমার কি তবে বিশ্বাস রাখা উচিৎ সরকারে?

মা, তারা কি আমাকে দাঁড় করাবে ফায়ারিং লাইনে তয়?

আহারে, জীবন মানে কি মা তবে সময়ের অপচয়?

চুপ থাক খোকা, খোকারে, কান্দিস না আর’

Mother, should I run for president?

Mother, should I trust the government?

Mother, will they put me in the firing line?

Ooh, aah, is it just a waste of time?

 

Hush now, baby, baby, don’t you cry—[Mother]

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: গাণে গানে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

four + four =