ফরাসি আইনপ্রণেতারা ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি বিল পাস করেছেন। শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম থেকে সুরক্ষা দিতে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর জোরালো সমর্থনে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খবর বাসস
প্যারিস থেকে এএফপি জানায়, সোমবার থেকে মঙ্গলবার রাতভর দীর্ঘ অধিবেশনের পর ফরাসি পার্লমেন্টের নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ১৩০-২১ ভোটে বিলটি অনুমোদন করে। আইনে পরিণত হওয়ার আগে বিলটি এখন ফ্রান্সের উচ্চকক্ষ সিনেটে যাবে।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মাখোঁ এই ভোটকে ফরাসি শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষায় ‘একটি বড় পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেন।
এই আইন অনুযায়ী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি উচ্চবিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। ডিসেম্বর মাসে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করা অস্ট্রেলিয়ার পর ফ্রান্স হবে দ্বিতীয় দেশ, যারা এ ধরনের পদক্ষেপ নিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার যত বেড়েছে, ততই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের বিকাশে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে উসকে দিচ্ছে।
শনিবার প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘আমাদের শিশু ও কিশোরদের আবেগ বিক্রির জন্য নয় বা নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়, তা হোক মার্কিন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বা চীনা অ্যালগরিদমের মাধ্যমে।’
কর্তৃপক্ষ চায়, নতুন অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই এই বিধান কার্যকর হোক।
নিম্নকক্ষে মাখোঁর রেনেসাঁ পার্টির নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী গাব্রিয়েল আতাল বলেন, তিনি আশা করছেন ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই সিনেট বিলটি পাস করবে, যাতে ১ সেপ্টেম্বর থেকে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা যায়।
তিনি আরও জানান, এরপর যেসব বিদ্যমান অ্যাকাউন্ট বয়সসীমা মানছে না, সেগুলো নিষ্ক্রিয় করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর হাতে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় থাকবে।
তরুণ কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর স্ক্রিন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি আতাল বলেন, এই পদক্ষেপ এমন কিছু শক্তির বিরুদ্ধেও কাজ করবে, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ‘মন দখল করতে চায়’।
তিনি বলেন, ‘এক মাসের মধ্যেই ফ্রান্স ইউরোপে পথিকৃৎ হতে পারে: আমরা আমাদের তরুণদের ও পরিবারগুলোর জীবন বদলাতে পারি এবং হয়তো স্বাধীনতার প্রশ্নে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎও বদলে দিতে পারি।’
ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য নজরদারি সংস্থা আনসেস চলতি মাসে জানিয়েছে, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিশোরদের, বিশেষ করে মেয়েদের, ওপর একাধিক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। যদিও সংস্থাটি বলেছে, কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির একমাত্র কারণ এগুলো নয়। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সাইবার বুলিং এবং সহিংস কনটেন্টে সংস্পর্শে আসা।
আইনে বলা হয়েছে, ‘অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পরিচালিত সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কিং সেবায় ১৫ বছরের কম বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।’ তবে এই খসড়া আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে অনলাইন বিশ্বকোষ ও শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্মগুলোকে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে একটি কার্যকর বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ইউরোপীয় পর্যায়ে এ ধরনের একটি ব্যবস্থার ওপর কাজ চলছে।
কট্টর বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবোড-এর আরনো সাঁ-মার্তাঁ এই নিষেধাজ্ঞাকে ‘ডিজিটাল পিতৃত্ববাদ’ এবং প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় ‘অতিরিক্ত সরলীকৃত’ সমাধান বলে সমালোচনা করেন।
সোমবার নয়টি শিশু সুরক্ষা সংগঠন আইনপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানায়—শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ‘নিষিদ্ধ’ না করে বরং প্ল্যাটফর্মগুলোকেই দায়বদ্ধ করা হোক।
মাখোঁ শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চবিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন। ২০১৮ সালে ফ্রান্স ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী এলিজাবেথ বোর্ন সোমবার এই নতুন ব্যবস্থার বিষয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেন। ফ্রান্স ২ টেলিভিশনকে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি এতটা সহজ নয়। আগে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে, মধ্যবিদ্যালয়গুলোতে বর্তমান নিষেধাজ্ঞাটি সঠিকভাবে কার্যকর হচ্ছে।’