বইমেলায় নতুন মাত্রা জুলাইয়ের গল্প

জৌলুশ হারিয়েছে লিটিলম্যাগ ও শিশুচত্বর

মাহবুব আলম

বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলা অতীত ঐতিহ্য মেনে ১ ফেব্রুয়ারির পড়ন্ত বিকেলে শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে অতীতের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী সরকার প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই মেলার উদ্বোধন করেছেন। উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বলেছেন, এবারের বইমেলা নতুন তাৎপর্য নিয়ে এসেছে। এবারের বইমেলার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়- জুলাই গণঅভ্যুত্থান। নতুন বাংলাদেশ নির্মাণ। মেলার এই প্রতিপাদ্য বিষয়কে কেন্দ্র করে লেখক প্রকাশকরা জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বিষয়ে যথাসম্ভব বই আনার চেষ্টা করেছেন। বাংলা একাডেমির তথ্য কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলায় ৭৩৮টি নতুন বই এসেছে। এই নতুন বইয়ের মধ্যে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বই দুই শোর কাছাকাছি। সেই হিসাবে মেলার প্রথম সপ্তাহে আসা বইয়ের এক চতুর্থাংশ বই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে। এই বিষয়ে বিভিন্ন প্রকাশক ও লেখকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে আরো অনেক বই আসবে। তবে এ সংখ্যা কত হবে এই নিয়ে কিছু জানা যায়নি।

২৪-এর গণঅভ্যুত্থান নিয়ে এ পর্যন্ত যে বই এসেছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- আল মাসুদ হাসান উজ্জামানের ছাত্রনেতার অভ্যুত্থান (প্রথমা প্রকাশনা), আসিফ নজরুলের শেখ হাসিনার পতন (প্রথমা প্রকাশনা), হাসান হাফিজের জয়গাথা জুলাই বিপ্লব, মাহবুব আলমের দুনিয়া কাঁপানো জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান (মৃদুল প্রকাশনা), মঙ্গল শেখের জুলাইয়ের অশেষ পাখিরা (ঐতিহ্য), আহমেদ ফয়েজের সংবাদপত্রে জুলাই অভ্যুত্থান (আদর্শ), কবি সাজ্জাদ শরীফ সম্পাদিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্বাক্ষর (প্রথমা), আলী রীয়াজের আমিই রাষ্ট্র: বাংলাদেশের ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরাতন্ত্র (প্রথমে), মো. মতিউর রহমানের ১০০ শহীদের গল্প, মেজবা ফুয়াদের চব্বিশের বাংলাদেশ, ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের আয়না ঘর, আব্দুল্লাহ আল মাসুদ-এর ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান স্মৃতিচারণ ও ইতিহাস, মো. মতিউর রহমানের জুলাই বিপ্লব, মাহবুবুর রহমান শাহীনের নতুন বাংলাদেশের আদ্যোপান্ত, মো. নাজিম উদ্দিন এর জুলাইয়ের গল্প, মহিউদ্দিন বিন জুবায়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ওবায়দুল্লাহ শায়েকের চব্বিশের স্বাধীনতা, বকুল আশরাফের রক্তাক্ত জুলাই, নজরুল ইসলামের কোটা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান, আহমেদ মতিউর রহমানের জনতার অভ্যুত্থান, রফিকুল আহসান মিনারের অভ্যুত্থান।

এছাড়াও মেলার প্রথম ৭ দিনে যেসব উল্লেখযোগ্য নতুন বই এসেছে সেগুলো হচ্ছে- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও জনমুক্তির প্রশ্ন (প্রথমা), মতিউর রহমানের গোলাম আম্বিয়া খান রুহানি (প্রথমা), নোবেল বিজয়ী কোরিয়ার লেখিকা হান বাং এর দ্যা ভেজিটেরিয়ান বইটি বাংলা ভাষার প্রকাশিত হয়েছে। বইটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন সাবাবা মুর্শিদ। বইটি প্রকাশিত হয়েছে তরফদার প্রকাশনী থেকে। কবি প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে শহীদ কাদরীর গদ্য সংগ্রহ, প্রথমা থেকে জাবেদ হুসাইন অনুদিত দস্তোয়ভোস্কির জুয়াড়ি লেখার আখ্যান, সময় প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে জিএম রশীদ এর দ্রোহের গ্রাফিতি: ২৪ এর গণঅভ্যুস্থান ও দীপু মাহমুদের নিঃসঙ্গ নটী, তরফদার প্রকাশনী থেকে মাহবুব আলমের ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ, আগামী থেকে প্রকাশিত হয়েছে ফরহাদ মাজহারের গণপ্রতিরক্ষা, ছায়াবিথী থেকে এসেছে মাহবুব আলমের সাংবাদিতায় চার দশক।

অতীতের মতো এবারও সর্বাধিক বই এসেছে কবিতার। এর পরের অবস্থানে রয়েছে উপন্যাস। সাম্প্রতিক সময়ের পাঠকের আগ্রহ বেড়েছে ইতিহাস ঐতিহ্য ও রাজনীতির বিষয়ক বইয়ের প্রতি। এ বিষয়ে মেলার শুরুতে কোনো রকম মন্তব্য করা বেশ কঠিন। তবে একাধিক প্রকাশকের মন্তব্য করেছেন এবার ইতিহাস ঐতিহ্য ও রাজনীতির বইয়ের চাহিদা বাড়বে। কেনো বাড়বে কেনো এমন ধারণা করছেন। এই প্রশ্ন করা হলে তিন চার জন প্রকাশক বলেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সময় অতীতে এমনটা দেখেছি। তাই ধারণা করছি।

তবে অধিকাংশ প্রকাশক শিশুদের বই নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, শিশুতোষ বইয়ের লেখক নেই বললেই চলে। এখন শিশুতোষ বই হিসেবে যা প্রকাশিত হচ্ছে তা কোনো মতেই মানসম্মত নয়। তবে আসার কথা হলোÑ এবার শিশু চত্বরে স্টলের সংখ্যা বেড়েছে। গতবার এই সংখ্যা ছিল ৬৮। এবার বেড়ে হয়েছে ১০৯। শিশু চত্বর ঘুরে দেখা গেছে জুলাই আগস্ট নিয়ে শিশুদের উপযোগী বেশ কিছু বইও প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে গ্রাফিতি নিয়ে বই। এ বিষয়ে অবশ্য কবি নাসির আহমেদ বলেছেন, শিশুদের যে বইগুলো বেরোচ্ছে সেগুলো একেবারে সম্পাদনাহীন অবস্থায়। তিনি এ বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আর এক লেখক কবি শহীন চৌধুরী বলেন, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবার আগে শিশুদের মনোজগতে স্বপ্ন তৈরি করে দিতে হবে। এর প্রধান মাধ্যম বই। আর সেই বই হতে হবে নির্ভুল। তবে শিশুদের জন্য গ্রাফিতির বই বেরিয়েছে। এর প্রশংসা করে শহীন চৌধুরী বলেন গ্রাফিটির বইগুলো শিশু-কিশোরদের উদ্দীপ্ত করবে। শিশুদের জন্য প্রকাশিত একটি বই হচ্ছে গণভবনে ভূত। এই বইটা বেশ চলছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট স্টলের বিক্রেতা।

জুলাইয়ের গল্প

বইমেলার মূলমঞ্চে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা পাশাপাশি এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে জুলাইয়ের গল্প। ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে এই নতুন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শুরুর দিন অর্থাৎ প্রথম দিন জুলাইয়ের গল্প বলার কার্যক্রমে অংশ নেন শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের বাবা শাহরিয়ার খান পলাশ ও মা সানজিদা খান। এই আলোচনার সঞ্চালক ছিলেন জুলাই আগস্ট গণঅভ্যুত্থান সেলের সেল সম্পাদক হাসান ইমাম। ৭ ফেব্রুয়ারি এই আলোচনায় অংশ নেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ।

মূল মঞ্চের আলোচনা

প্রতি বছরের মতো এবারও মূল মঞ্চে প্রতিদিন বিষয়ভিত্তিক আলোচনা কবিতা পাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিষয়ভিত্তিক যে আলোচনাগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে সেগুলো হচ্ছেÑ হায়দার আকবার খান রনো’র আজীবন বিপ্লব পিয়াসী, কুমুদিনী হাজং জুলাই তারা, তারনা, একজন হারুন উর রশিদ ও মাকিদ হায়দার।

হায়দার আকবার খান রনোর উপর অনুষ্ঠিত আলোচনার মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সোহরাব হাসান। আলোচনায় অংশ নেন আব্দুল্লাহ আল ক্কাফি রতন, জলি তালুকদার, অনন্যা লাবনী, এতে সভাপতিত্ব করেন দীপা দত্ত।

কুমোদিনী হাজং এর উপর মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন পাভেল পার্থ। আলোচনার অংশ নেন মতিলাল হাজং, পরাগ রিছিল। সভাপতিত্ব করেন আবু সাঈদ খান। মাকিদ হায়দারের ওপর প্রবন্ধ পাাঠ করেন চঞ্চল আশরাফ। আলোচনায় অংশ নেন সৈয়দ হাবিব, আসিফ হায়দার। সভাপতিত্ব করেন আতাহার খান। হারুন উর রশীদ এর উপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রফিক উস মুনীর চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেন আবদুস সেলিম ও মোহাম্মদ হারুন উর রশীদ। সভাপতিত্ব করেন খলিকুজ্জামান।

লেখক বলছি মঞ্চ

এবারের বইমেলায় অন্যতম আকর্ষণ লেখক বলছি মঞ্চ। এই মঞ্চে প্রতিনিধি দিন সন্ধ্যায় লেখক কবি সাহিত্যিকরা তাদের নিজেদের বই গল্প কবিতা নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা করেন। প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন উপস্থিত দর্শক ও পাঠকদের। এক কথায় লেখক পাঠকের মতবিনিময় ও সমন্বয় হচ্ছে। ইতিমধ্যে যে সকল লেখক তাদের নিজেদের কাব্যগ্রন্থ ও গল্প উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন কবি মজিদ মাহমুদ। মজিদ মাহমুদ কবি হিসাবে বিশেষ পরিচিতি হলেও ছোট গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লেখক হিসাবেও খ্যাতি অর্জন করেছেন। ইতিমধ্যে তার কয়েকটি বই বিদেশি ভাষায় অনূদিত হচ্ছে। গত ডিসেম্বরে তার বহু আলোচিত মেমোরিয়াল ক্লাব ইংরেজি ভাষায় নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত হয়েছে। খুব শিগগিরই সিঙ্গাপুরে এই বইয়ের প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়াও লেখক বলছি মঞ্চে যারা আলোচনায় অংশ নিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম চঞ্চল আশরাফ, আতাহার খান, কবি জহরান নাঈম, কথা সাহিত্যিক পাপড়ি রহমান, শিশু সাহিত্যিক আশরাফ হেলাল প্রমুখ।

জৌলুশ হারিয়েছে লিটিলম্যাগ চত্বর

লিটিলম্যাগ চত্বর নিয়ে প্রগতি লেখক সংঘের অন্যতম সংগঠক সাখাওয়াত টিপু বলেছেন, চত্ত্বরটি আগের মতই অবহেলিত। ৩ ফেব্রুয়ারি এই চত্বরে গিয়ে দেখা যায় মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান স্টল খুলে বসেছে আর পুরো চত্বর খালি, শূন্য। এ বিষয়ে ভ্রমন গদ্য স্টলের এক বিক্রয় কর্মীকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান আমাদের এখনো ব্যানার দেওয়া হয়নি। আমরা বসবো কি করে? আর বুঝবোই বা কি করে আমাদের স্টল কোনটি। উল্লেখ্য, এই চত্বরে বাংলা একাডেমি নিজেরাই ব্যানার করে টাঙিয়ে দেয়। এবং সেইভাবে ব্যানার দেখে লিটিলম্যাগের সংগঠকরা স্টল সাজিয়ে বসেন।

এ বিষয়ে আরো জানা গেছে, এবছর লিটিলম্যাগ চত্বরে স্টলের সংখ্যা ১৩০টি যা গত বছরের চাইতেও ৪০টি কম। কার্যত এই চত্বর ব্যানার সর্বোচ্চ অলস পড়ে আছে। অথচ এক সময় এই চত্বরে সব সময় আড্ডা বিতর্ক চলত বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত। এখন নেই সেই আড্ডা, নেই কোনো বিতর্ক, নেই নেই ঐতিহ্য। সবকিছু যেন ধূসর।

এই বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক লিটিলম্যাগ সংগঠক বলেন, আসলে লিটিলম্যাগগুলোর নিয়মিত প্রকাশনা নেই। তারা ছাড়া যেসব প্রকাশনা তাও গতানুগতিক। তাই স্বাভাবিকভাবেই লেখকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অপর একজন তিনিও নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, একসময় প্রথাবিরোধী আন্দোলনে লিটিলম্যাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু সেদিন আর নেই। তাছাড়া পৃষ্ঠপোষকতার প্রচণ্ড অভাব। সব মিলিয়ে লিটিলম্যাগ আগের সেই গতি হারিয়ে ফেলেছে। আর এই সুযোগটাই নিচ্ছে বাংলা একাডেমি। তারা এ ক্ষেত্রে দেখাচ্ছে চরম অবহেলা। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে এক সময় লিটিলম্যাগ হারিয়ে যাবে। যা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। জাতির জন্য বয়ে আনবে দুর্ভোগ।

গ্রন্থকন্যা ও নারীবান্ধব প্রশ্ন

বইমেলায় প্রতিবছর বিভিন্ন স্টলে খণ্ডকালীন কর্মী হিসেবে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা কাজ করে। ওদের সুন্দর মুখের হাসি দর্শক ক্রেতাদের আকর্ষণ করে। এদের বলা হয় গ্রন্থকন্যা। এরা যে স্রেফ কিছু বাড়তি আয়ের জন্য এই খণ্ডকালীন কাজটি করেন তা কিন্তু সব ক্ষেত্রে নয়। এ বিষয়ে গ্রন্থকন্যাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে, ওরা এর মধ্যে আনন্দ ও বিনোদন দুটোই খুঁজে পান। তার উপর কিছু আয়ও হয়। এটা ওদের বাড়তি পাওনা। তবে ওদের সকলের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে বাংলা একাডেমির বইমেলা আজও নারীবান্ধব হয়ে ওঠেনি। নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশরুম নেই। নেই স্বস্তিদায়ক অবস্থাও। এমনকি অনেকে ইভটিজিংয়ের শিকারও হন। অথচ গ্রন্থকন্যারা মেলার জৌলুস বাড়িয়ে দেন। যাই হোক এই বিষয়টা দেরিতে হলেও বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ উপলব্ধি করেছে বলেই মনে হয়। তাই আগামীতে এ বিষয়ে বিশেষ মনোযোগী হবে এটা সকলের প্রত্যাশা।

সেলফি

বইমেলার অন্যতম একটি আবশ্যিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সেলফি। এ বিষয়ে এক স্টলে নারী বিক্রয় কর্মী অর্থাৎ গ্রন্থকন্যা মাঝবয়সী এক নারীকে অনুরোধ করে বলেন, সেলফি তোলার পাশাপাশি দু’চারটা বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টান। এক আধটা কিনুন প্লিজ। ৩ ফেব্রুয়ারি ছায়াবিথীর স্টলে আমার চোখের সামনে এই ঘটনা ঘটে। ঘটনাটা এরকম যে ৩-৪ জন সাজুগুজু মহিলা হাঁটতে হাঁটতে স্টলের সামনে এসে একটা করে বই তুলে নিয়ে সেলফি তুলে বই রেখে চলে যাচ্ছেন। এই সময় এক নারী বিক্রয় কর্মী ওই মহিলাদের ওই অনুরোধ করেন। এ বিষয়ে একাধিক স্টলের বিক্রয় কর্মীর অভিজ্ঞতা হলো অনেকেই বিশেষ করে মহিলারা বই নিয়ে সেলফি তুলে বই রেখে হাঁটা দেন। ভুল করেও কেউ বইয়ের পাতা উল্টে দেখে না।

মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে অরাজকতা

আগের মতোই এবারও মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে অরাজকতা অব্যাহত আছে। এখানে ন্যূনতম শৃঙ্খলা নেই। অনেকটা চর দখলের মতো মঞ্চ দখল করে লেখক প্রকাশকরা তাদের সদ্য প্রকাশিত বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করছেন। অতীতে মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে একাধিক টিভি ক্যামেরার উপস্থিতি থাকলেও এখন আর থাকে না। এখন অধিকাংশ টিভি ও তাদের নিজেদের সুবিধা মতো মেলার মাঠ থেকে সরাসরি লেখক প্রকাশকদের সাক্ষাৎকার নেন। নেন পাঠক, দর্শক ও প্রকাশকদের মন্তব্য। এটা নিঃসন্দেহে ভালো দিক। তবে মোড়ক উন্মোচন মঞ্চের প্রতি এই অবহেলা বেশ দৃষ্টিকটূ বলেই অনেকের মন্তব্য।

শুধু মোড়ক উন্মোচন মঞ্চেই নয় ধুলা নিয়ন্ত্রণেও খুব ঢিলেঢালা ভাব। ধুলা নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটালেও তা পর্যাপ্ত নয়। সব জায়গায় সর্বত্র পানির ছিটানো হচ্ছে না। বিশেষ করে মেলায় প্রবেশ দ্বারগুলোতে একেবারে পানি দেওয়া হচ্ছে না। ফলে মেলা ধুলায় ধুলিময় অবস্থা। এটা মেলার ব্যবস্থাপনার বড় রকমের ত্রুটি। অবশ্য মেলা কর্তৃপক্ষ এবার শুরু থেকে একের পর এক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। চাপের কাছে নতি স্বীকার করে অনেক সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। যেমন শুরুতে মেলার স্টল প্যাভিলিয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা কার্যকর করতে পারেনি। শুরুতে ফ্যাসিবাদের সহযোগী লুটেরা প্রকাশকদের চিহ্নিত করে কালো তালিকাভুক্ত করে তাদের প্যাভিলিয়ন বাতিল করে স্টল বরাদ্দে সিদ্ধান্ত নেয়। সেইসঙ্গে কিছু প্রকাশকদের প্যাভিলিয়নের স্থান কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত নেয় যারা অতীতে স্টল নিয়েছে তাদের তিন স্টল দেয়া হবে, দেয়ও। কিন্তু চাপের মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে কর্তৃপক্ষ সরে আসে। এটা রীতিমতো হাস্যকর কাণ্ড করেছে কর্তৃপক্ষ। যেমনটা করেছে বাংলা একাডেমির পুরস্কারের ক্ষেত্রে। তবে একটা ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা লক্ষণীয় হলো নতুন বইয়ের প্রচারের ক্ষেত্রে। তালিকা ধরে তালিকা অনুযায়ী প্রচার করছে।

মেলার উদ্বোধন নিয়ে প্রশ্ন

অমর একুশের বইমেলার উদ্বোধন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকার প্রধান এই মেলায় উদ্বোধন করে আসছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বমোট ২১ বার মেলার উদ্বোধন করেছেন। দেশ-বিদেশে সাধারণত এই ধরনের মেলার উদ্বোধন করেন কোন প্রখ্যাত লেখক শিল্পী কবি। আমাদের দেশেও এই দাবি আছে। অতীতে একবার একজন নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখককে দিয়ে মেলা উদ্বোধনের কথা বলা হলেও অজ্ঞাত কারণে তা সম্ভব হয়নি। এবার অনেকে আশা করেছিল সরকার প্রধানের মেলা উদ্বোধনের রীতি ভাঙবে। এবার কোনো একজন কবি সাহিত্যিক বা লেখক এই মেলার উদ্বোধন করবেন। কিন্তু না তা হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে কিনা এই নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তারপর আমাদের বইপ্রেমিকদের দাবি একুশের বইমেলার উদ্বোধন করানো হোক কোনো বর্ষিয়ান কবি লেখক ও শিল্পীকে দিয়ে। এ বিষয়ে এক নবীন লেখকের মন্তব্য, এজন্য হয়তো আমাদের আরো কয়েক যুগ অপেক্ষা করতে হবে।

প্যাভিলিয়ন

প্যাভিলিয়ন নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। ২০১৪ সালে বাংলা একাডেমি মেলার পরিধি বাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নেওয়ার পর থেকে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ শুরু হয়। শুরুর দিকে কয়েকজন বড় প্রকাশককে প্যাভিলিয়ন দেওয়া হলেও পরে অনেক ভূঁইফোড় লুটেরা প্রকাশককে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেওয়া শুরু হয়। এখন ৩৫ থেকে ৩৬টি প্যাভিলিয়ন হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এগুলো কি আদৌ প্যাভিলিয়নের চরিত্র ধারণ করে? এগুলোকে কি প্যাভিলিয়ন বলা চলে ও দুই-তিনটি বাদে? না, বলা চলে না। প্যাভিলিয়নের নামে কার্যত এরা ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের মতো বইয়ের পশরা সাজিয়ে বসে। প্যাভিলিয়নের নামে এগুলো গ্রাম্য হাটের উন্মুক্ত দোকান।

লেখক পাঠকদের মন্তব্য

এবার দেখা যাক মেলা নিয়ে লেখক পাঠকরা কে কি বলছেন। এই সময়ের বেশ আলোচিত ব্যক্তিত্ব প্রগতি লেখক সংঘের সংগঠক শাখাওয়াত টিপু বলেছেন, এবারের বইমেলা খানিকটা গোছানো ও সুন্দর। স্টল বিন্যাসও ভালো হয়েছে। তবে শিশুদের স্টল ও লিটিলম্যাগ কর্নার গতানুগতিক আগের মতোই অবহেলিত। আর এক লেখক সাংবাদিক কবি শাহিন চৌধুরী বলেন মেলায় স্টল বিন্যাস ভালো হলেও ধুলা নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি ব্যর্থ। প্রবীণ সাংবাদিক নাজমুল হাসানের মন্তব্য ধুলায় ধুলাময় এই মেলায় আসাই দুষ্কর।

সত্যিই তো ধুলায় ধুলাময় পুরো বইমেলা। এটা আর যাই হোক ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। ধুলা নিয়ন্ত্রণ কোনো কঠিন বা খুব ব্যয়সাধ্য নয়। এজন্য যা প্রয়োজন তা হলো সিদ্ধান্ত ও আন্তরিকতা। আসলে আমাদের জাতীয় চরিত্রের প্রতিফলনই ঘটেছে মেলায়। তাইতো মেলা লোকে লোকারণ্য হলেও বিক্রি সেই তুলনায় কিছুই না। বই কেনার বা বই পড়ার অভ্যাস গড়ে না তোলা পর্যন্ত এটা অব্যাহত থাকবে। তাইতো সৈয়দ মুজতবা আলীর সুন্দরীর কথায়, বই ওতো একটা আছে। মুজতবা আলীর সেই যুগ থেকে আমরা এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি। কবে বেরিয়ে আসতে পারবো তা কেউ জানে না।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: প্রচ্ছদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

sixteen + 5 =