নীলাঞ্জনা নীলা
একটা সময় ফাগুন খুব ঘটা করে পালন না হলেও বেশ কয়েক বছর ধরে ফাগুনকে কেন্দ্র করে থাকে নানা রকম আয়োজন। ফাগুনে প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও সাজাতে ভালোবাসে মানুষ। তাই তো ফাগুনের দিন ফুল না ফুটলেও মানুষের সাজ দেখেই বোঝা যায় বসন্ত এসে গেছে। জেনে নেওয়া যাক কেমন হতে পারে বসন্তের সাজ।
বেশ কয়েক বছর ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মেকআপে এসেছে ভিন্নতা। ফাগুন মানে নানা রকম রংয়ের খেলা তাই পোশাকে রংয়ের ছোঁয়া থাকলেও মেকআপে গাঢ় রং কিংবা ভারী মেকআপ কেউ করতে চায় না। এখন ট্রেন্ডে রয়েছে মিনিমান মেকআপ। সবাই হালকা মেকআপ করতেই পছন্দ করে। তাছাড়া ফাগুনকে ঘিরে নানা রকম আয়োজন থাকলেও সেদিন ছুটি থাকে না সুতরাং অফিস কিংবা ক্লাস সবই থাকে চলমান। তাই সাজের ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্র কিংবা ক্লাসের কথাও মাথায় রাখা হয়। যদি সেদিন শুধু থাকে ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা তাহলে আবার মেকআপ কিংবা সাজ একটু ভারী নেওয়া যেতে পারে।
বসন্তের সাজ শুরু করার আগে অবশ্যই ভালো করে ত্বকের যত্ন নিতে হবে। মেকআপ ভারী হোক কিংবা হালকা যাই হোক, সাজসজ্জা শুরু করার আগে ত্বক তৈরি করে না নিলে মেকআপ বসতে চাইবে না। বসন্তে খুব বেশি গরম না থাকলেও খানিকটা রোদ পড়া শুরু করবে। এই গরম, এই ঠান্ডার খেলায় সাজসজ্জার দিকে সতর্ক থাকতে হবে। প্রথমে নিজের ত্বকের সঙ্গে মানানসই একটি ফেসওয়াশ দিয়ে ভালো করে মুখ ধুয়ে টোনার ব্যবহার করেতে হবে। টোনার আপনার ত্বককে রিফ্রেশ করে তুলবে।
ত্বক প্রস্তুত করার জন্য প্রথমে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে। ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের ফলে ত্বকের রুক্ষতা ও মলিনতা কমে আসবে। কারণ বসন্তে আবহাওয়ার কারণে অনেকের ত্বক রুক্ষ হয়ে থাকবে তাই ভালো করে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা জরুরি। এর পরের ধাপ হল সানস্ক্রিন। অনেকেই বাইরে রোদ না থাকলে সানস্ক্রিন এড়িয়ে যায় কিন্তু তা ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। আবহাওয়া যেমনই হোক সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হবে।
বসন্তের দিন যদি চান আপনার ত্বক থাকুক গ্লোয়ি, তাহলে কয়েকদিন আগে থেকেই ঘরোয়া উপায়ে রূপচর্চা শুরু করতে পারেন। ত্বকের পোড়া দাগ কমাতে টমেটোর রস কিংবা শসার রস ভীষণ উপকারি। এছাড়া আলুর রসও ত্বকের কালো দাগ কমিয়ে দেয়। তেলতেলে কিংবা রুক্ষ যেকোনো ত্বকের জন্যই মধু ভীষণ উপকারী। তাই ব্যবহার করতে পারেন মধু। ঘুমানোর আগে মুখে কিছুক্ষণ দুধের সর লাগিয়ে ১০ মিনিট পর তা ধুয়ে ফেলুন। এতে ত্বকের তেল অনেকটা কমে যাবে। এছাড়াও ত্বকের যত্নে ব্যবহার করতে পারেন অ্যালোভেরা। কিন্তু কখনই গাছ থেকে সরাসরি অ্যালোভেরা ব্যবহার করা উচিত নয়। অ্যালোভেরার রসের সঙ্গে মধু, টমেটো কিংবা দই ব্যবহার করতে পারেন। দই এবং মধু ব্যবহারের ফলে ত্বকের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয়ে যায়। ঘরোয়া উপায়ে রূপচর্চা করতে না চাইলে সেলুনে গিয়ে প্রোটিন ট্রিটমেন্টও নিতে পারেন। প্রোটিন ত্বকের জন্য বেশ উপকারী। প্রোটিন ট্রিটমেন্ট আপনাকে গ্লোয়ি স্কিন দিবে। তবে ত্বকের যত্নে হোক কিংবা মেকআপ প্রথমে নিজের ত্বকের ধরন বুঝে নেওয়া জরুরি। ত্বকের ধরন বুঝে পণ্য এবং মেকআপ কেনা উচিত। ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে স্কিন কেয়ার পণ্য এবং মেকআপ পাল্টে ফেলা উচিত। দীর্ঘদিন ধরে একই পণ্য ব্যবহার করলে অনেক সময় পণ্যের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। সেদিকে খেয়াল না রেখে ব্যবহার করার ফলে ত্বকে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বসন্তের মেকআপ
সঠিকভাবে ত্বক প্রস্তুত করে নেওয়ার পর শুরু করতে হবে মেকআপ। বসন্তের সারা দিনের পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে মেকআপ নিতে হবে। যদি আপনাকে ক্লাস বা অফিসে যেতে হয় তাহলে মেকআপ হবে এক ধরনের, আবার যদি শুধুই ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা থাকে তাহলে আরেক ধরনের।
তবে এখন বেশিরভাগ মানুষ হালকা মেকআপ পছন্দ করে। খুব বেশি ড্রামাটিক মেকআপ না করে মিনিমাল মেকআপ করে থাকে। মিনিমাল মেকআপ ক্লাস-অফিসে যেমন মানানসই তেমনি যেকোনো অনুষ্ঠানেও তা ভালো লাগে। তাই বসন্তের দিন পোশাক রঙিন পরিধান করলে মেকআপ করতে পারেন মিনিমাল।
মেকআপের শুরুতেই প্রাইমার ব্যবহার করে নিন। প্রাইমারের পর ব্যবহার করতে পারেন ফাউন্ডেশন। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে ফাউন্ডেশন যেন খুব বেশি ব্রাইট না হয়। আপনার ত্বকের সঙ্গে যেন ফাউন্ডেশনের মিল থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
কিন্তু মিনিমাল মেকআপে অনেকেই ফাউন্ডেশন এড়িয়ে যান। ফাউন্ডেশনের জায়গায় ব্যবহার করা হয় বিবি ক্রিম। ফাউন্ডেশন রেগুলার মেকআপে ব্যবহার করা না গেলেও বিবি ক্রিম রেগুলার মেকআপে ব্যবহার করা যায়। বিবি ক্রিম ব্যবহারের ফলে মেকআপ থাকে ন্যাচারাল। মুখে দাগ কিংবা পিগমেন্টশন ঢেকে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করুন কনসিলার। পুরো মুখে কনসিলার না দিয়ে শুধুমাত্র যেসব জায়গায় দাগ আছে সেসব জায়গায় কনসিলার ব্যবহার করুন। এরপর ফেস পাউডার ব্যবহার করুন। ফেস পাউডার ব্যবহারের ফলে মুখের বাড়তি তেল ব্যালেন্স হবে। যাদের ত্বক অতিরিক্ত অয়েলি তাদের কোনোভাবেই ফেস পাউডার এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। পরবর্তীতে পিচ কিংবা হালকা গোলাপি রংয়ের ব্লাশন ব্যবহার করুন। গালের পাশাপাশি হালকা করে নাকেও ব্লাশন দিন। দিনের মেকআপ হলে হাইলাইটার ব্যবহার এড়িয়ে যেতে পারেন। কিন্তু রাতের গ্লোয়ি মেকআপের জন্য গাল ও নাকে হাইলাইটার ব্যবহার করতে পারেন। একটা সময় মনে করা হতো যত বেশি মেকআপ ব্যবহার করা হবে তত সুন্দর লাগবে। কিংবা অতিরিক্ত সাদা হয়ে যাওয়াই মেকআপ। কিন্তু এখন মেকআপ মানে আপনার স্বাভাবিক সৌন্দর্য বজায় রাখা এবং অনেক কম মেকআপ পণ্য ব্যবহার করা।
আইলুকের ক্ষেত্রে একটা সময় পোশাকের রংয়ের সঙ্গে মিল রেখে আইশেড ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এখন তেমন ড্রামাটিক আইলুক করা হয় না। ব্লাউন কিংবা হালকা গোল্ডেন রং দিয়েই আই মেকআপ করা হয় যা সব ধরনের পোশাকের সঙ্গেই মানিয়ে যায়। হালকা ব্রাউন কিংবা পিচ রং দিয়ে আইলুক করে চোখের নিচে কাজল ব্যবহার করতে পারেন, কাজল আপনার লুকে বাঙালিয়ানা যোগ করবে। এরপর মোটা করে মাশকারা ব্যবহার করে চোখের মেকআপের ইতি টানতে হবে। চাইলে আইলাইনারও ব্যবহার করতে পারেন। মেকআপ ট্রেন্ড যেমনই থাকুক আপনি কেমন করে নিজেকে সাজাতে চান তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আপনার উপর। তাই আপনি যদি পোশাকের রংয়ের সঙ্গে মিল রেখে ভারী আইলুক করতে চান তাহলে তা রাতের অনুষ্ঠানের জন্য করতে পারেন। বসন্তের আইলুকের ক্ষেত্রে হালকা হলুদ কিংবা লাল আইশ্যাডো ব্যবহার করা যেতে পারে।
আপনার সাজে কি ধরনের লিপস্টিক ব্যবহার করবেন তা নির্ভর করছে আইলুকের উপর। আইলুক যদি ভারী কিংবা ড্রামাটিক হয় তাহলে নুড শেডের লিপস্টিক বেছে নিতে পারেন। কিন্তু আইলুক হালকা হলে লাল কিংবা মেরুণের মতো গাঢ় রংয়ের লিপস্টিক ব্যবহার করতে পারেন। লিপস্টিক ব্যবহারের আগে অবশ্যই লিপ লাইনার ব্যবহার করে নিতে হবে। গ্লোয়ি লিপস চাইলে লিপগ্লস ব্যবহার করতে পারেন।
সম্পূর্ণ মেকআপ শেষ করে মেকআপ সেটিংস স্প্রে করে দিতে হবে। এতে মেকআপ দীর্ঘস্থায়ী হবে।
বাইরে বের হওয়ার সময় মেকআপ টাচআপের জন্য ফেস পাউডার, লিপস্টিক ও কাজল সঙ্গে রাখতে হবে।
লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: আরশী