বসন্তে সেজে উঠুক ঘর…

ময়ূরাক্ষী সেন

বসন্ত দরজাতে কড়া নাড়ছে। কিছুদিনের মধ্যেই প্রকৃতি জানান দিবে বসন্ত আগমনের। বসন্ত ঘিরে এখন বাঙালির থাকে নানা রকম আয়োজন। থাকে নানা রকম সাজসজ্জা, ঘোরাফেরা খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি। প্রকৃতি তার রূপ পাল্টে নতুন করে হয়ে ওঠে রঙিন। বসন্তের রং ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মন ও তার সাজসজ্জায়। গাছে যদি ফুল নাও ফুটে তাও মানুষ নিজের সাজ দিয়ে সকলকে বুঝিয়ে দেয় বসন্ত এসে গেছে। বসন্তে প্রকৃতি নিজের রূপে সেজে নেয়। প্রকৃতির সেজে উঠলো আপন রঙে, আপনিও সেজে উঠলেন। কিন্তু এই বসন্তে কেন আপনার ঘর সেজে উঠবে না নতুন করে? জেনে নেওয়া যাক কেমন করে বসন্তের রং আসবে আপনার ঘরেও।

ফুলে ফুলে

বসন্তে ফুল হতে পারে ঘর সাজানোর সহজ ও প্রধান অনুষঙ্গ। বসন্তের সময় বিভিন্ন ফুলের দোকান ভরে যায় নানা রঙের ফুলে। আপনার পছন্দের ফুল দিয়ে ঘরের সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি করতে পারেন তেমনি ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে যাবে মিষ্টি সুগন্ধ। ফুল দিয়ে ঘর সাজাতে চাইলে ফুলদানির দিকেও নজর রাখতে হবে। আপনি যদি চান ফুলই হবে ঘরের প্রধান আকর্ষণ তাহলে ফুলদানি রাখবেন সাদামাটা। কিন্তু ফুলদানি যদি খুব জমকালো নকশার হয় তাহলে তাতে অল্প ফুল রাখা উচিত। এতে একটি ভারসাম্য বজায় থাকবে। ফুল দিয়ে ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে আপনার পছন্দমতো যেকোনো ফুলই ব্যবহার করতে পারেন। প্রাকৃতিক ফুল রাখলে নিয়মিত পানি পরিবর্তন করতে হবে, তা না হলে সেখানে ডেঙ্গু মশা হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।

ফুল দীর্ঘদিন তাজা রাখতে পানির মধ্যে সামান্য লবণ মিশিয়ে দিতে পারেন। ফুলের ডাটা নিয়মিত কাটতে হবে। ফুলদানি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ঘরের আসবাবপত্রের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। হরেক রকমের বাহারি ফুল রাখতে চাইলে একরঙা ফুলদানি বেছে নিন। মাটি, সিরামিক, বাঁশ, বেত, প্লাস্টিক, কাচ, মেটাল পিতলসহ বিভিন্ন ধরনের ফুলদানি বাজারে পাওয়া যায়। আবার চাইলে বড় কোনো মাটির পাত্রে পানি রেখে তার মধ্যে বিভিন্ন রকমের ফুলের পাপড়ির ছিটিয়েও সাজিয়ে রাখতে পারেন। গোলাপের পাপড়ি কিংবা নয়ন তারা ফুল ব্যবহার করতে পারেন। আবার ঘরের যেকোনো একটি কোণে বেলি, রজনীগন্ধা, দোলনচাঁপা কিংবা গাঁদা ফুল রেখে দিতে পারেন। আবার চাইলে যেকোনো ধরনের পাতাবাহার দিয়েও ঘর সাজানো সম্ভব। কাচের জারে কিংবা মাটির পাত্রে মানিপ্লান্ট জাতীয় গাছ রেখে দিতে পারেন, এতে ঘরে থাকবে সবুজের ছোঁয়া। অনেকে কৃত্রিম ফুল কিংবা গাছ দিয়েও ঘর সাজিয়ে থাকে। বাজারে নানা নকশার বাহারি কৃত্রিম গাছ ও পাতা পাওয়া যায়। কৃত্রিম ফুল কিংবা পাতা দিয়ে ঘর সাজালে তা পরিষ্কার রাখা জরুরি। কারণ ফুলের মধ্যে ধুলা জমে গেলে দেখতে ভালো লাগে না। কৃত্রিম ফুল, পাতা ডিটারজেন্ট দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

দেয়াল

সুন্দর করে দেয়াল সাজানোর মাধ্যমে নিমিষে ঘরের রূপ বদলে ফেলা সম্ভব। বাজারে এখন দেয়াল সাজানোর জন্য হরেক রকমের ফ্রেম পাওয়া যায়। বসন্ত উপলক্ষ্যে প্রাকৃতিক দৃশ্যের একটি বড় ফ্রেম দিয়ে আপনার ড্রয়িং রুম সাজিয়ে নিতে পারেন। কিংবা নকশী কাঁথার গ্রামীণ দৃশ্য দিয়ে দেয়াল সাজাতে পারেন। দেশীয় উপকরণ দিয়ে দেয়াল সাজাতে চাইলে কুলা কিংবা হারিকেন দেয়ালে ঝুলিয়ে দিতে পারেন। ইচ্ছে করলে ফ্রেমে পরিবারের ভালো মুহূর্তের ছবি দিয়েও দেয়াল সাজাতে পারেন। অনেকেই দেয়াল সাজানোর জন্য ব্যবহার করেন ওয়াল পেপার। এতে রং করার ঝামেলা ছাড়াই দেয়ালের রূপ পালটে যায়।

আলো

হালকা উষ্ণ আলো আপনার ঘরে নিয়ে আসবে স্নিগ্ধতা। বসন্তকে রঙিন করে তুলতে ঘরে ব্যবহার করতে পারেন বিভিন্ন ধরনের আলো। ঘর সাজাতে সিলিং লাগোয়া ছোট আকারের ঝাড়বাতি বেছে নিতে পারেন। বসার ঘরের আমেজ পালটে দিতে পারে ঝাড়বাতি। তবে বসার ঘর ছোট হলে ঝাড়বাতি ব্যবহার না করাই ভালো। সেক্ষেত্রে ঘরের কোণে রেখে দিতে পারেন বাঁশের কিংবা বেতের ল্যাম্প, যা ঘরকে করে তুলবে নান্দনিক। খাবার টেবিলের সিলিংয়ে ঝুলিয়ে দিতে পারেন বেতের ঝাড়বাতি। বেড রুমে ব্যবহার করতে পারেন মরিচ বাতি, মাটির প্রদীপ কিংবা হরেক রকম নকশার মোমবাতির আলো।

চাদর, পর্দা ও কুশন

বসন্তের দিন ঘর সাজাতে বেডরুমের জন্য হলুদ, কমলা, লাল, মেরুন, সবুজের মতো রঙিন বিছানার চাদর বেছে নিন। যা আপনার ঘরকে করে তুলবে উজ্জ্বল। বিছানার চাদর উজ্জ্বল রাখলে চেষ্টা করতে হবে চাদরে প্রিন্ট যাতে কম থাকে। আবার উজ্জ্বল রং না রেখে যদি ঘরে স্নিগ্ধতা চান সেক্ষেত্রে হালকা নীল, আকাশি, সাদার রঙের চাদর ব্যবহার করতে পারেন। চাদরের সঙ্গে মিল রেখে ঘরের পর্দা নির্বাচন করুন। দেশীয় উপকরণ দিয়ে ঘর সাজালে জানালায় বেতের পর্দা ব্যবহার করতে পারেন। কুশনের ক্ষেত্রেও উজ্জ্বল রং বাছাই করতে হবে। সোফায় কিংবা খাটের কর্নারে কয়েকটি রঙিন কুশন ঘরের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করবে।

খাবার টেবিল

বসন্তের দিন অতিথি আপ্যায়নে খাবার টেবিলটিও পরিপাটি করে সাজানো প্রয়োজন। রঙিন টেবিল রানার ব্যবহার করতে পারেন। বাজারে জামদানি মোটিফ, নকশী কাঁথা ইত্যাদির টেবিল রানার পাওয়া যায়। খাবার টেবিলের মাঝখানে একটি বেতের ঝুড়িতে বিভিন্ন রকম ফল রাখতে পারেন। কিংবা টেবিলের মাঝখানে রাখতে পারেন ফুলদানিতে প্রাকৃতিক ফুল বা পাতাবাহার গাছ। খাবার পরিবেশন করার ক্ষেত্রে লাল, হলুদ, সবুজ রঙের সিরামিক প্লেট, গ্লাস, বাটি ব্যবহার করতে পারেন। খাবার টেবিলে এমন চেয়ারের ব্যবস্থা রাখুন যা বসতে আরামদায়ক হবে। খাবার টেবিলের সিলিংয়ে ঝুলিয়ে দিতে পারেন বাঁশের বাতি।

বসার ঘর

ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে বসার ঘরকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। কারণ অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে আড্ডা এ ঘরেই চলে। বসার ঘরের সোফা রঙিন কুশন দিয়ে সাজিয়ে দিতে পারেন। এছাড়া মেহমানদের জন্য বসার বিছিয়ে দিতে পারেন শীতল পাটি। এতে যেমন বেশি মানুষের বসার জায়গার ব্যবস্থা হয়ে যাবে তেমন ঘরে গ্রামীণ সংস্কৃতিও ফুটে উঠবে। বসার ঘরে কাচের টেবিলের উপর বেতের ঝুড়িতে কয়েকটি ফুল সাজিয়ে রাখতে পারেন। রজনীগন্ধা কিংবা দোলন চাঁপার মতো সাদা ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখলে ঘরে মিষ্টি সুগন্ধ ছড়াবে। বসার ঘর সাজাতে যে খুব দামি শোপিস ব্যবহার করতে হবে তা নয়, মাটির শোপিস দিয়েও আপনার ঘর সুন্দর করে সাজিয়ে তুলতে পারেন।

খুঁটিনাটি

যেকোনো উৎসবকে কেন্দ্র করে ঘর সাজানো অনেকের কাছে ঝামেলা এবং ব্যয়বহুল বলে মনে হয়। কিন্তু কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করে খুব সহজে এবং সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যায় এমন দেশীয় উপকরণ দিয়ে আমরা ঘর সাজিয়ে ফেলতে পারি। ঘর সাজাতে দামি জিনিসের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু রুচিবোধ ও ব্যক্তিত্বের। ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র শোপিস কিংবা আসবাবপত্রের দিকে নজর না দিয়ে অন্যান্য ছোটখাটো বিষয় নজর দেওয়া জরুরি। যেমন ঘর যত সুন্দর করে সাজানো হোক না কেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না থাকলে তা ভালো লাগবে না। তাই খেয়াল রাখবেন ঘরের কোণায় ধুলা বালি জমে আছে কি না, থাকলে তা সুতির কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করে ফেলতে হবে।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: িইন্টেরিয়র

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

nineteen + 20 =