বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে কাজটা কঠিন: বিপপা

বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছি, নতুন সরকারকে সর্বোচ্চ সহায়তা করতে চাই। তবে বকেয়া না পেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখা খুবই কঠিন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ)।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে বিআইপিপিএ প্রেসিডেন্ট কে এম রেজাউল হাসনাত এমন মন্তব্য করেছেন। বিআইপিপিএ’র পক্ষ থেকে অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছে, বকেয়া না পেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে না।

এক প্রশ্নের জবাবে বিআইপিপিএ’র সাবেক প্রেসিডেন্ট ইমরান করিম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় (২০২৪ সালের জুনে) বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বকেয়া ছিল ৪ মাসের বিলের সমান। বর্তমানে বকেয়ার পরিমাণ এখন ৮ থেকে ১০ মাসে গিয়ে ঠেকেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালে বকেয়া কমিয়ে ৩ মাসে নামিয়ে এনেছিল এরপর আর বিল দেয়নি। মাঝে মাধ্যে ১০ দিন ১৫ দিনের করে বিল দিয়েছে। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বকেয়া বিল ১৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

তিনি বলেন, বকেয়ার কারণে ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে সমস্যা হচ্ছে। অনেক কোম্পানি ব্যাংক ঋণের কিস্তি দিতে পারছে না। আমরা যদি তেল আমদানি করতে না পারি তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে কি করে। বিদেশি কোম্পানির বিল ঠিকই দেওয়া হয়েছে, অথচ আমরা দেশীয় উদ্যোক্তারা বকেয়া পাচ্ছি না। এটাকে চরম বৈষম্য বলা যেতে পারে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমরা নতুন সরকারকে সর্বোচ্চ সহায়তা করতে চাই। তবে সাধ এবং সাধ্যের মধ্যে যদি সমন্বয় না হয়, তাহলে কতক্ষণ সম্ভব হবে! এক সময়তো ব্যাংকও আমাদের এলসি দিতে চাইবে না।

বিআইপিপিএ’র সভাপতি কে এম রেজাউল হাসনাত বলেন, জুলাইয়ের পর থেকে বিল পরিশোধ কমিয়ে দেওয়া হয়। বিল না দিয়ে উল্টো তারা জরিমানা আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়। এটা ইচ্ছেকৃতভাবে করা হয়েছে, যাতে নতুন সরকারের সময় লোডশেডিং নিয়ে ঝামেলা তৈরি হয়। একই বিষয় নিয়ে বিদেশি ও দেশি বিদ্যুৎ কোম্পানির মধ‍্যে বৈষম‍্য করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানোর জন্য ডিজিএফআই থেকে ফোন করা হতো। আমরা বকেয়া পরিশোধের জন্য একাধিক দফায় চিঠি দিয়েছি। বন্ধ করতে চাইলেই নানা রকম হুমকি দেওয়া হতো।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমরা আগেই বলেছি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমাদেরকে নতুন সরকারের মুখোমুখী দাঁড় করিয়েছে। যদি তাই না হবে তাহলে ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র কয়েকদিন আগে অন্যায়ভাবে এলডি (জরিমানা) কর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কেন?

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসেছিলাম তারা ব্যক্তিগতভাবে বলেছে এলডি কর্তন করার সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি। যেহেতু অর্থ মন্ত্রণালয় ঘুরে আদেশ এসেছে, বাস্তবায়ন না করলে তারা ফেঁসে যেতে পারেন, এই ভয়ে তারা অসহায়। এলডি ছাড় দিলে দুদকের ঝামেলায় পড়তে হতে পারে তাদের।

ইমরান করিম বলেন, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিল দিতে না পারলে বিপিডিবির বিদ্যুৎ চাওয়ার অধিকার রহিত হবে। যখন উৎপাদন সীমিত করা হয়েছে, সেই সময়ে এলডি ((জরিমানা) কর্তন করা হয়েছে। একই রকম পরিস্থিতিতে চীনা প্রতিষ্ঠান বরিশাল পাওয়ার কোম্পানির ২৭০ কোটি জরিমানা করা হয়। পরে সেই টাকা ফেরৎ দেওয়া হয়েছে। অথচ আমাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে এক রকম আচরণ করে, আর আমাদের সঙ্গে ভিন্ন রকম আচরণ করা হচ্ছে। অথচ চুক্তির শর্ত হুবহু একই।

তিনি বলেন, নিজের মাঠে অফ ফিল্ড, কবে আমাদের জন্য ফিল্ড তৈরি হবে। বিদেশি কোম্পানির বিল ৩ থেকে ৪ মাসের বেশি বকেয়া রাখা হয় না। আমাদের ৮ থেকে ১০ মাসের বকেয়া। অনেক বিদ্যুৎ কোম্পানি রয়েছে যারা ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। তেল, খুচরা যন্ত্রপাতি ধার দেনা করে চলতে হচ্ছে।

আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আমরা বেসরকারি উদ্যোক্তারা ৫০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করি, অথচ একটি নীতিমালা করা হলো আমাদের ডাকাই হয়নি। পৃথিবীতে মনে হয় এমন নজীর পাওয়া যাবে না।

এলডি প্রসঙ্গে নিজেদের রক্ষার জন্য আইনী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে বলেন, আমরা আশা করি আদালত এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সঠিক বিচার করবে।

বারাকা গ্রুপের চেয়ারম্যান ফয়সাল চৌধুরী বলেন, আমরা বিদেশে কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করেছি বিদ্যুতে। বকেয়ার কারণে ২ বছর ধরে কোন লভ্যাংশ দিতে পারছি না। নীল নকশার অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমাদের সঙ্গে বৈরি আচরণ করেছে। তারা নতুন সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে।

নির্বাচনের আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিআইপিপিএ’র পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বকেয়া না পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখা কঠিন। ওই প্রসঙ্গে নবনির্বাচিত বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, তারা যদি এটা বলে তাহলে ব্ল্যাকমেইলের সামিল হবে।

মন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে বিআইপিপিএ’র প্রেসিডেন্ট বলেন, বকেয়ার জন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র না চালাতে পারার বিষয়টি নতুন সরকারের কাছে ব্ল্যাকমেইল মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে এটা সরকারকে চাপে ফেলার চেষ্টা নয়। যে কোনো ভাবে উৎপাদন ধরে রাখতে চেষ্টা করে হচ্ছে। তাও পরিস্থিতি সরকারকে জানিয়ে রাখা হচ্ছে। ব‍্যাংক থেকে ঋণপত্র খুলতে না পারায় তেল কেনা যাচ্ছে না, এটাই সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 10 =