ময়ূরাক্ষী সেন
বিয়ে একটি সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন। পরিবার গড়ার জন্য হোক, ধর্মীয় কারণে হোক কিংবা সামাজিক কারণে হোক; প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নারী-পুরুষকে বিয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিয়ের পর সাধারণত নারী-পুরুষ উভয়ের জীবনে পরিবর্তনে আসে। তবে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আসে একজন নারীর জীবনে। কারণ যেহেতু আমাদের দেশের নিয়ম অনুযায়ী একজন নারী তার ছোটবেলার ঘর ছেড়ে তার স্বামীর ঘরে চলে আসে সুতরাং তার পরিবর্তন বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক। নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে চলা নারীর জন্য চ্যালেঞ্জিং। হুট করে এই পরিবর্তনের সঙ্গে অনেকেই মানিয়ে নিতে পারে না। বিয়ের পর প্রত্যেকের জীবনে একটি পরিবর্তন আসে, কিন্তু সবার যে একই ধরনের পরিবর্তন আসবে তা সঠিক নয়। কিন্তু কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো:
দায়িত্ব বাড়ে
বিয়ের আগে নারী তার বাবা-মা কিংবা তার পরিবারের অন্যান্য অভিভাবকের উপর তার দায়িত্ব নিশ্চিন্তভাবে দিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু বিয়ের পর দৃশ্য খানিকটা পাল্টে যায়। তখন নিজের প্রতি যেমন দায়িত্ব বাড়ে তেমন অনেকের দায়িত্ব নিতে হয়। জীবনের অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত তখন নিজে নিজে নিতে হয়।
পেশা
যেহেতু বিয়ের পর একজন নারীর স্থান পরিবর্তন হয় এমনকি অনেক সময় শহর কিংবা দেশ পরিবর্তনেরও প্রয়োজন হয়। যা তার ক্যারিয়ার পরিকল্পনার পথে বাধা হতে পারে। আবার চাকরি এবং সংসার দুটোর মধ্যে ব্যালেন্স করাও চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়।
শারীরিক
বিয়ের পর দাওয়াত, অনুষ্ঠান এবং নতুন বাড়ির খাদ্যাভ্যাসের জন্য অনেক সময় নারীদের ওজন বেড়ে যায়। যার কারণে অনেক নারী হীনমন্যতায় ভোগে। এই হুট করে হওয়া শারীরিক পরিবর্তন তারা মেনে নিতে পারে না। ফলে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
সাংস্কৃতিক
একেক পরিবারে একেক রকম সংস্কৃতির এবং বিভিন্ন ধরনের নিয়মকানুন চর্চা করা হয়। বিয়ের পর হয়তো নারীর এমন সব নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হয় যার সঙ্গে সে কখনো অভ্যস্ত ছিল না।
ব্যক্তিগত
ছোটবেলা থেকে একজন নারী এক ধরনের অভ্যাসে বেড়ে ওঠে। কিন্তু যখন সে নতুন পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হয় তখন নিজের কিছু ব্যক্তিগত অভ্যাস বাদ দিয়ে সেই পরিবারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। অনেক দিনের অভ্যাস হঠাৎ ছাড়তে অনেককে হিমশিম খেতে হয়।
পরিচয়-আর্থিক
বাস্তবতা হলো একজন নারী বিয়ের আগে তার বাবার পরিচয়ে বড় হতে থাকে এবং বিয়ের পর তার স্বামীর। একজন নারীর ব্যক্তিগত আয় ও ক্যারিয়ার থাকলেও তার স্বামীর আর্থিক অবস্থা এবং পরিচয় তার উপর প্রভাব ফেলে। অনেক নারীর এই নতুন পরিচয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগে।
স্বাধীনতা
বিয়ের আগে একজন নারী হয়তো তার নিজের ইচ্ছামতো অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারতো। কিন্তু বিয়ের পর তার যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার স্বামী এবং পরিবারের কথা চিন্তা করতে হয়। তার যেকোনো কাজের জন্য একটি জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি হয়। যেকোনো মানুষই স্বাধীনতা ভালোবাসে, কিন্তু একজন স্বাধীনচেতা নারীর জীবনে যখন হঠাৎ করে কিছুটা বিঘ্ন ঘটে তখন সে সেটা মেনে নিতে পারে না।
সম্পর্ক
বিয়ের পর স্বামীর পাশাপাশি আরও অনেকগুলো নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রত্যেকের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা তার একটি দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। সম্পর্কগুলো তখন তাকে খুব দক্ষতার সঙ্গে বজায় রাখতে হয়।
করণীয়
বিয়ের পরে পরিবর্তন হবে এটি স্বাভাবিক। যেকোনো পরিবর্তনই শুরুতে কঠিন মনে হলেও ধীরে ধীরে তা সহজ হয়ে আসে। তবে এই পরিবর্তনকে সহজ করে নেওয়ার জন্য কিছু কৌশল জানা প্রয়োজন।
নিজেকে তৈরি করা
বিয়ে করার সিদ্ধান্ত তখনই নিন যখন আপনি নিজের প্রস্তুত। পরিবার কিংবা সমাজের জন্য বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। আপনি যদি মনে করেন পরিবর্তন এখন গ্রহণ করতে পারবেন তবেই বিয়ের প্রস্তুতি নিন। কারণ মনের বিরুদ্ধে বিয়ে হলে পরবর্তীতে মানিয়ে নেওয়া বেশ কষ্টকর। প্রথমে নিজের কাছে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। সমাজের ভয়ে কিংবা কারো চাপে কখনই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
নতুন পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক
বিয়ে মোটামুটি ঠিক হবার পর নতুন পরিবারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারেন। তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আপনাকে তাদের মানসিকতা বুঝতে সাহায্য করবে। আপনি সেভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবেন।
সব বিষয়ে জানানো
বিয়ের আগেই আপনার হবু সঙ্গী এবং তাদের পরিবারের কাছে আপনার সকল চাওয়া জানিয়ে রাখুন। যেমন আপনার ক্যারিয়ার প্ল্যান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এসব বিষয় তাদেরকে জানিয়ে রাখুন এবং তাদের পরিকল্পনা জানতে চান। যাতে এ সকল বিষয় নিয়ে পরবর্তীতে সমস্যার মধ্যে না পড়তে হয়।
মানসিক প্রস্তুতি
প্রথমে মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়া প্রয়োজন। বিয়ের পরে কি ধরনের সমস্যার মধ্যে আপনি পড়তে পারেন সে সম্পর্ক সঠিক ধারণা রাখা দরকার। চাইলে এই বিষয়ে অভিজ্ঞ কারো সঙ্গে কথা বলতে পারেন কিংবা হবু সঙ্গীর সঙ্গে আলোচনা করে নিতে পারেন। বিয়ের আগে সঙ্গীর সঙ্গে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন, তাহলে যেকোনো সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে যায়।
সমঝোতা
যেকোনো সম্পর্ক সুন্দর করার জন্য সমঝোতার প্রয়োজন। বোঝাপড়া ও কিছু ব্যাপারে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা না থাকলে বিয়েপরবর্তী জীবন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই আপনার সঙ্গীসহ শ্বশুর বাড়ির সকলের সঙ্গে একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করুন।
দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন
বিয়ের আগের মানুষ এবং বিয়ের পরের মানুষের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ্য করতে পারেন। কারণ একসঙ্গে দুটি মানুষ পাশাপাশি থাকলে অনেক পরিবর্তনের চোখে পড়বে। কিন্তু এটি খুবই স্বাভাবিক, তা খেয়াল রাখতে হবে। তাই সেক্ষেত্রে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা পরিবর্তন করতে হবে। তাহলেই সংসার জীবন স্বস্তির হবে।
সময় নিন
যেকোনো পরিবর্তনের অভ্যস্ত হতে কিছুটা সময় লাগে। তাই প্রথমেই তাড়াহুড়া করা যাবে না। ধৈর্য সহকারে নিজেকে অভ্যস্ত করার চেষ্টা করতে হবে এবং নিজেকে সময় দিতে হবে। আশে পাশের পরিবেশ বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
ভুল স্বীকার করুন
যেকোনো সমস্যা হলে প্রথমে অন্যকে দোষারোপ না করে নিজের কোনো সমস্যা থাকলে তা খুঁজে বের করুন এবং সমাধান করার চেষ্টা করুন। কারণ অন্যের আচরণ কখনই আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু ব্যবহার ও আচরণ সম্পূর্ণ আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে, তাই তা পরিবর্তন করার চেষ্টা করুন। তবে যদি কোনো বিষয়ে মনে করেন যে, আপনার কোনো দোষ নেই তাহলে তা পরিষ্কারভাবে সঙ্গীর সঙ্গে আলোচনা করুন। অনেক সময় যেকোনো ধরনের সমস্যা শুধুমাত্র আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
তবে মনে রাখতে হবে বিয়ের পরের জীবন কখনও সম্পূর্ণ নিখুঁত করা সম্ভব নয়। তর্কবিতর্ক, ভুল বোঝাবুঝি ও নানা ধরনের সমস্যা নিয়ে একটি সংসার গড়ে ওঠে। নতুন পরিবারের গেলে শুধুমাত্র আপনার একার দায়িত্ব নয় পরিবর্তন আনার, বিয়ের পরের জীবন সুন্দর করতে চাইলে নতুন পরিবারের সদস্যদের এবং আপনার সঙ্গী উভয়কেই বন্ধুত্বপূর্ণ হতে হবে। একে অপরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে একটি সংসার জীবন সুন্দর করে গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: অঙ্গনা