বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া

মুশফিকুর রহমান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব নেবার (২০ জানুয়ারি ২০২৫) পর প্যারিস জলবায়ু চুক্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কয়েকটি চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক অর্থনীতির দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক চুক্তিগুলো থেকে প্রত্যাহার করার ফলে কি প্রভাব পড়তে পারে তা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া, বিশ্লেষণ অব্যাহত রয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতির শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ, রাষ্ট্রনায়কগণ যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্টের নেওয়া প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া, মতামত জানাচ্ছেন।

জনতুষ্টিমূলক বিভিন্ন কাজকর্মের জন্য ইতিমধ্যে খ্যাতি অর্জন করা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নেওয়া সিদ্ধান্তসমূহ কখন আবার পুনঃবিবেচনায় উৎসাহিত হয়ে উঠবেন তা নিয়েও আলাপ আলোচনা চলছে ।

২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে গৃহীত চুক্তি (প্যারিস জলবায়ু চুক্তি) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বিযুক্ত করার ফলে বৈশ্বিক জলবায়ুর উষ্ণায়ন ত্বরান্বিত হবে কি না সেটিও এখন গবেষণার বিষয়। উন্নয়নশীল ও দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোতে বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিলে যুক্তরাষ্ট্র তার কাছ থেকে প্রত্যাশিত পরিমাণ অর্থ দেওয়া থেকে বিরত থাকলে তার কি প্রভাব পড়বে, সে প্রশ্ন নিয়ে বেশি  উদ্বেগ কাজ করছে। তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে আরও বেশি বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি আহরণ উৎসাহিত করা, কার্বন নিঃসরণ  হ্রাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বিদ্যমান নানামুখী প্রণোদনা হ্রাস করার উদ্যোগ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দ্রুততর করবার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত দি গার্ডিয়ান (২৪ জানুয়ারি ২০২৫) এর রিপোর্ট অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে অনুষ্ঠিত ‘ওয়াল্ড ইকোনমিক ফোরাম’ এ দেওয়া বক্তৃতায় ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লিয়ন উল্লেখ করেছেন, ‘মানব সভ্যতার জন্য প্যারিস (জলবায়ু) চুক্তি সর্বোত্তম আশাবাদ। বিশ্বের প্রকৃতি সংরক্ষণে ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধ করবার লক্ষ্যে অন্যান্য জাতি সমূহের সঙ্গে ইউরোপ অব্যাহতভাবে কাজ করে যাবে।’ রিপোর্ট থেকে আরও জানা যায়, যুক্তরাজ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা ও নেট জিরো বিষয়ক মন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড ঘোষণা করেছেন যে, ‘আমরা প্যারিস চুক্তির দৃঢ় সমর্থক এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির রূপান্তর প্রক্রিয়া অপ্রতিরোধ্য। কানাডার পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী াস্টভেন গিলবল্ট বলেছেন, ‘প্যারিস চুক্তি কোনো একক দেশের চেয়ে বড়। যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বিশ্বের ১৯৪ দেশ সম্মিলিতভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের অনাগ্রহ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং বেসরকারি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যহত রাখার আগ্রহ অটুট রয়েছে। কানাডা প্যারিস চুক্তির দায়-দায়িত্বের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, বিশ্বের সব মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। বিশ্বের কোনো দেশই বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে দূরে নয় এবং একক চেষ্টায় সে সমস্যা কেউ সমাধানও করতে পারবে না। চীনসংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কাজ করে যাবে বলেও তিনি ঘোষণা করেন। ব্রাজিলের পরিবেশ মন্ত্রী মারিনা সিলভা  জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেওয়া পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী এবং তার নিজ দেশের আবহাওয়ার চরমভাবাপন্ন আচরণ, বাস্তবতা, বৈজ্ঞানিক ও সাধারণ জ্ঞান থেকে পাওয়া প্রমাণসমূহের বিপরীত উপাদান থেকে উৎসরিত। স্বল্প উন্নত দেশসমূহের গ্রুপের চেয়ারপারসন ইভানস ন্যেওয়া এক্স হ্যান্ডেলে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন (প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ায়), দূষণ হ্রাস করার জন্য কষ্টার্জিত অর্জনসমূহ বিপরীত যাত্রার ঝুঁকিতে পড়বে এবং জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্ন দেশগুলো আরও বেশি মাত্রার ঝুঁকির মুখোমুখি হবে।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেওয়া সিদ্ধান্ত আগামী বছর (২০২৬ সালে) যখন বাস্তবায়িত হবে, তখন প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর না করা দেশ ইরান, লিবিয়া এবং যুদ্ধ বিদ্ধস্ত ইয়েমেনে’র নামের পাশেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নামও লেখা হবে। ঐতিহাসিকভাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশ। সেই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল, গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে স্বাক্ষরকারী দেশসমূহ জীবাশ্ম জ¦ালানির উৎপাদন ও ব্যবহার সঙ্কুচিত করা, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষর বৈশ্বিক জলবায়ু সঙ্কট নিরসনের পূর্ণ সমাধান সূত্র নয়। বরং জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সে লক্ষ্যে পরিচালিত কর্মকাণ্ডের একটি কাঠামো মাত্র। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির স্বীকৃত দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা স্বেচ্ছাধীন এবং অবশ্য পালনীয় নয়। এই চুক্তির আওতায় শিল্পোন্নত ও ধনী দেশগুলো স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস ও ‘সবুজ উন্নয়ন’ অগ্রসর করার নানামুখী তৎপরতায় আর্থিক সহায়তা ও ঋণ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন গত বছর ঘোষণা দিয়েছিল যে, প্যারিস চুক্তির আওতায় ঘোষিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের জলবায়ু তহবিলে যুক্তরাষ্ট্র বছরে ১১ বিলিয়ন ডলার দেবে।

আগামী বছর জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় উপস্থিত থাকলেও সিদ্ধান্ত নির্মাণ প্রক্রিয়ায় অংশী হবে না। নিশ্চিতভাবে, বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হবে। বৈশ্বিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জলবায়ু নীতি ও কর্মকাণ্ডে তার প্রভাব একই রকম না-ও হতে পারে। ফেডারেল সরকার ও বিভিন্ন রাজ্য সরকারের অবস্থান জলবায়ু নীতি সম্পর্কে ভিন্ন হতে পারে। তাছাড়া, নবায়নযোগ্য শক্তি সম্প্রসারণের যে বিশাল (ট্রিলিয়ন ডলার) বৈশ্বিক বাজার, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে চীনের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়বে। প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত চীনের জন্য উদীয়মান ‘সবুজ অর্থনীতির’ বৈশ্বিক নেতা হবার সুযোগ উন্মোচিত করেছে। অপরদিকে, বৈশ্বিক জলবায়ু সঙ্কট তীব্র হবার অব্যাহত প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে একা নিজ দেশে তীব্রতর ঝড়, বন্যা, লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ, দাবানল, খরা, মরুকরণ, মহামারি মোকাবেলায় লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: পরিবেশ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

sixteen − 14 =