
সর্বোচ্চ তিন বার শিরোপা জয়, পর পর দুইবার জয়, স্বাগতিক দেশ হিসাবে শিরোপা জয় এতগুলো মাইলফলক সৃষ্টি করে টি২০ বিশ্বকাপ জয় করলো ভারত। কাল আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে একচেটিয়া ফাইনালে নিউ জিল্যান্ডকে ৯৬ রানের বিশাল ব্যাবধানে হারিয়ে দাপটের সঙ্গে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয় করলো।
টস হেরে প্রথমে ব্যাটিং করা ভারত দুই মারকুটে ওপেনার সানজু স্যামসন (৪৮ বলে ৮৯) আর অভিষেক শর্মা (২১ বলে ৫২) জুটিতে ৭.১ ওভারে ৯৮ রান তুলে শুভ সূচনা করেছিল। এরপর ১০৫ রানের দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ঈশান কিষান ২৫ বলে ৫৪ রান যোগ করলে নির্দিষ্ট ওভার শেষে ভারতের রান মাউন্ট এভারেস্ট চূড়ায় ২৫৫/৫ পৌঁছায়। নিউ জিল্যান্ড ইনিংসে বিশ্বসেরা ভারত পেসার জাসপ্রিত বুমরার দাপটে (৪/১৫) ব্ল্যাক ক্যাপসরা ১৫৯ রানে গুটিয়ে যায়।
সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বাধীন অত্যন্ত শক্তিশালী দলটি এবার অধিকাংশ ক্রিকেট বিশ্লেষকদের ধারণায় ছিল টুর্নামেন্ট জয়ের জন্য হট ফেভারিট দল। ১৯৮৩ সালে কপিল দেবের নেতৃত্বে ভারতের জাতীয় দল ফাইনালে অপ্রত্যাশিতভাবে তৎকালীন বিশ্বসেরা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে প্রুডেনসিয়াল বিশ্বকাপ জয় করেছিল।
এবারের জয়টি কিন্তু অপ্রত্যাশিত ছিল না। তবে গ্রুপ অফ এইটের একটি খেলায় দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে বিশাল ব্যাবধানে পরাস্ত হয়ে ভারত নিজেদের অবস্থান অনিশ্চিত করে ফেলছিল। কিন্তু ঘুম ভাঙানিয়া ওই পরাজয় ভারতকে তাতিয়ে দিয়েছিল। ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউ জিল্যান্ড কোন দল দুর্দান্ত ভারতের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
জানিনা স্নায়ুক্ষয়ী ফাইনালে টস জিতে আহমেদাবাদ স্টেডিয়ামের ভারত সমর্থকদের বিশাল নীল সমুদ্রের উপস্থিতিতে কেন ভারতকে ব্যাটিং করার সুযোগ দিয়েছিল মিচেল সান্টনার? তুখোড় ফর্মে থাকা ভারতের তিন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান সানজু স্যামসন, অভিশেষক শর্মা আর ঈশান কিষান তান্ডবে শুরুতেই কোনঠাসা হয়ে পড়েছিল। ভারতের এই বিস্ফোরক ব্যাটিং মোকাবেলায় ব্ল্যাক ক্যাপ্স বোলারদের অসহায় মনে হয়েছে।
সেমি ফাইনালে ইংল্যান্ড এমনতর ভারতের স্কোরকে তাড়া করে কাছাকছি পৌঁছতে পারলেও কাল জাসপ্রিত বুমরা (৪/১৫) আর আকসার প্যাটেলের (৩/২৭) বিধ্বংসী বোলিং মোকাবেলায় আত্মসমর্পন করে।
এবারের টুর্নামেন্টে শেষ তিনটি ম্যাচে যেভাবে ব্যাটিং করেছে সানজু স্যামসন সেটি বিবেচনায় নিয়ে ওকে টুর্নামেন্টের সেরা ইমপ্যাক্ট খেলোয়াড় বলা যেতেই পারে। কাল সানজুর ৪৬ বলে করা ৮৯ রানের ইনিংসে ছিল ৫ চার আর ৮ ছক্কা। পিছিয়ে ছিল অপর মারকুটে ওপেনার টুর্নামেন্টের শুরুতে নিজের ছন্দ হারানো অভিষেক শর্মা।
আর এই জুটির প্রথম উইকেট জুটির দ্রুত যোগ করা ৯৮ রান ভারত ইনিংসে মোমেন্টাম এনে দিয়েছিল। এরপর যোগ হলো সানজু স্যামসন-ইশান কিষান জুটির অনবদ্য ১০৫ রানের জুটি। ভারত সংগ্রহ পেরিয়ে গেলো ব্ল্যাক ক্যাপসদের সাধ্যের সীমানা। স্টেডিয়াম কাঁপছিলো ভারত সমর্থকদের গগন বিদারী উল্লাসে।
ফাইনালের মতো স্নায়ুচাপের খেলায় স্বাগতিকদের বিশাল স্কোর তাড়া করে ম্যাচ জয় করতে প্রয়োজন ছিল ফিন অ্যালেন ঝড়। আলেন-স্নেইফার্ট জুটির বিস্ফোরক সূচনা। স্নেইফার্ট (৫২) ভালো করলেও আলেন (৯), রাচীন রাভিন্দ্রা (১), গ্লেন ফিলিপ্স (৫), মার্ক চ্যাপম্যান (৩) বুমরা-প্যাটেল ঝড়ে দ্রুত ঝরে পড়লে একসময় ৫/৭২ রণে ভঙ্গ দেয় নিউ জিল্যান্ড। ১৯ ওভারে ১৫৯ রানে গুটিয়ে যাওয়া নিউ জিল্যান্ড হেরে যায় বিশাল ৯৬ রানের ব্যবধানে। ৪/১৫ দুর্দান্ত বোলিং করে ম্যাচের সেরা পুরুস্কার তুলে নেয় জাসপ্রিত বুমরা।
ভারতের কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ জয়কে জানাই অভিনন্দন। এবার নিয়ে তিনবার এবং পরপর দুইবার টি২০ বিশ্বকাপ জিতলো এই মুহূর্তে টি২০ আইসিসি রাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা ভারত।
সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড
ভারত ২৫৫/৫ (সানজু স্যামসন ৮৯, ঈশান কিষান ৫৪, অভিষেক শর্মা ৫২, শিবাম দুবে ২৬*। জেমস নিশাম ৩/৪৬)
নিউ জিল্যান্ড ১৫৯ অল আউট (টিম স্নেইফার্ট ৫২, মিচেল সান্টনার ৪৩। জাসপ্রিত বুমরা ৪/১৫, আকসার প্যাটেল ৩/২৭)
ভারত ৯৬ রানে জয়ী। ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়: জাসপ্রিত বুমরা।
এবারের টি২০ বিশ্বকাপ নিয়ে নানা বিতর্ক হয়েছিল। বিশেষ করে উপমহাদেশের নোংরা রাজনীতি ক্রিকেটকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কলুষিত করেছিল। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ নিজেদের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা করে খেলাধূলোকে রাজনীতি মুক্ত না রাখলে ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। দুঃখ হয় রাজনীতির শিকার হয়ে বিশ্বকাপ খেলা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ।
শেষ হলো মাসব্যাপী ক্রিকেট যজ্ঞ। ২০২৮ সালে পরবর্তী টি২০ বিশ্বকাপ হবে অস্ট্রেলিয়া, নিউ জিল্যান্ডে। আল্লাহ্তালা বাঁচিয়ে রাখলে দেখবো, লিখবো খেলাগুলো নিয়ে।