মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ নীলা

নীলাঞ্জনা নীলা

শাম্মি ইসলাম নীলা এই নামটি এখন অনেকেই চেনা মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ হিসেবে। নিজের গুণ ও সৌন্দর্য দিয়ে বাংলাদেশের নাম আলোকিত করেছে নীলা। নীলা বাংলাদেশি প্রতিনিধি হিসেবে প্রমাণ করে দেখিয়েছে চেষ্টা করলে সবই সম্ভব। মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লেও মিডিয়ার সঙ্গে তিনি যুক্ত বেশ কয়েক বছর ধরেই। অনেকে তাকে ব্র্যান্ড প্রোমোটার, ইনফ্লুয়েন্সার এবং টিকটকার হিসেবে চিনে থাকেন।

বরিশালের মেয়ে নীলা। ছোটবেলায় বাবার সামনে মাথায় মুকুট দিয়ে বলতেন  ‘আমি হলাম বিশ্বসুন্দরী’।  সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে এই স্বপ্নটা ছোটবেলা থেকেই মনে গেঁথে ছিল। খুব অল্প বয়সেই তিনি যুক্ত হয়ে যান মডেলিং এবং ব্র্যান্ড প্রমোশনের কাজে। এছাড়া তিনি নিয়মিত টিকটক ভিডিও করতেন এবং সেখানে তার বেশ কয়েকটি ভিডিও ভাইরাল। তার মিষ্টি চেহারার জন্য তিনি বেশ প্রশংসিত ছিলেন অনেকে তাকে পুতুল বলে ডাকেন। বাংলাদেশের নামকরা সব ব্র্যান্ডের সঙ্গে তিনি ব্র্যান্ড প্রোমোটার হিসেবে কাজ করেছেন। মডেলিং,  টিকটক এবং ব্র্যান্ড প্রমোশনের কাজেই তিনি ব্যস্ত ছিলেন। হুট করে তার ম্যানেজার তাকে একদিন বলেন এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে। প্রথমে তিনি রাজি না থাকলেও পরে রেজিস্ট্রেশন করেন। রেজিস্ট্রেশন করার কিছুদিন পরেই মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ থেকে তার ডাক আসে। শুরু হয়ে যায় তার জীবনের নতুন এক যাত্রা।

শুরুতে তিনি কিছুটা দ্বিধার মধ্যে ছিলেন কারণ যেহেতু আগে থেকেই তার নাম অনেকের জানাশোনা ছিল এবং তিনি যদি এই প্রতিযোগিতায় ভালো ফলাফল করতে না পারেন তাহলে কি হবে? পরবর্তীতে তিনি সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে এই প্রতিযোগিতা অংশগ্রহণ করেন। কারণ তিনি মনে করেন জীবনের চ্যালেঞ্জ নেওয়া জরুরি। চ্যালেঞ্জ না নিলে কখনও জীবনে এগিয়ে যাওয়া যায় না এবং নিজের যোগ্যতা কতটুকু তা বোঝা সম্ভব হয় না। জীবনে ভালো কিছু করার জন্য অবশ্যই ঝুঁকি নিয়ে নতুন কিছু করা প্রয়োজন। তাই নীলা ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি মনে করেন সব প্রতিযোগিতায় যে তাকে জিতে ফিরতে হবে তা নয়। বরং অনেক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে অনেক কিছু শেখা সম্ভব যা মানুষের জীবন পাল্টে দিতে পারে। মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের যাত্রা তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। এতদিন তিনি এ যাত্রার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার মনে হচ্ছিল তিনি পুরোপুরি অন্য এক জগতে রয়েছেন। প্রতি  মুহূর্ত যেন তিনি নতুন নতুন কিছু শিখছে। তার কাছে মনে হয় এই প্রতিযোগিতার পর তিনি পুরোপুরি একটি ভিন্ন মানুষ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। নিজেকে নতুন করে চিনতে পেরেছেন, যা অনেক বেশি জরুরি ছিল। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠা, নিজেকে পারফেক্ট দেখানো, ব্যাগ গোছানো, ট্রাভেল করা ইত্যাদি তাকে এমন সব শিক্ষা দিয়েছে যা সারা জীবন তার কাজে লাগবে।

মিস ওয়ার্ল্ডের এই যাত্রায় অসাধারণ সব পোশাকে নীলা দর্শকের প্রশংসা অর্জন করেছে। মিষ্টি চেহারা, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, সুন্দর বাচনভঙ্গির মাধ্যমে তিনি অনেকের প্রিয় হয়ে উঠেছেন। কাজের পাশাপাশি পড়াশোনাও তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করছে। নীলা খুব অল্প বয়স থেকেই তার ক্যারিয়ারের প্রতি ভীষণ মনোযোগী। সব সময় তার চেষ্টা ছিল অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া যাতে তিনি তার পরিবারকে সাহায্য করতে পারেন এবং নিজের সব চাহিদা পূরণ করতে পারেন। সে ইচ্ছা থেকেই তিনি ব্র্যান্ড প্রমোশন শুরু করেছিলেন। নীলা একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ব্র্যান্ড প্রমোশনের মাধ্যমে তিনি অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হতে পেরেছেন। মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ হওয়ার পরেও তিনি কেন ব্র্যান্ড প্রমোশনের কাজ করছেন, এ নিয়ে তাকে অনেক প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়েছিল। নীলা বলেন, ব্র্যান্ড প্রমোশন তাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে এবং একটি পরিচয় দিয়েছে বলেই তিনি আজকে এ জায়গায় এসে দাঁড়াতেন পেরেছেন। যেহেতু অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল করেছে তাই ব্র্যান্ড প্রমোশনের প্রতি তার একটি আলাদা আবেগ এবং সম্মান রয়েছে।

তিনি যখন মিস ওয়ার্ল্ডের যাত্রায় যান তখন অনেক ব্র্যান্ড প্রোমোটাররা তাকে সাপোর্ট করেছিল বলে তিনি কৃতজ্ঞ। একটি সাক্ষাৎকারে নীলা বলেন, মানুষের যেমন অনেক শখ থাকে যেমন ছবি আঁকা, গান গাওয়া, নাচ করা তেমনি আমার একটি শখের কাজ হলো ব্র্যান্ড প্রমোশন। সারাদিন পর ঘরে ফিরে আমি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ভালোবাসি, এর মাধ্যমেই আমি মানুষের সঙ্গে বেশি যুক্ত হতে পেরেছিলাম। টিকটক এবং ব্র্যান্ড প্রমোশন করার জন্য তাকে অনেকবার সমালোচনা শিকার হতে হয়েছে। অনেকে বলেছে, তাহলে কি টিকটকরাই কি এখন বাংলাদেশকে তুলে ধরবে? কিন্তু নীলা মনে করেন সবাই এক নয়। কোনো একটি মাধ্যমকে কেউ যদি ভালো কাজে ব্যবহার করতে পারে তাহলে সেখানে দোষের কিছু নেই।

নীলা প্রশংসা যেমন ভালবেসে গ্রহণ করেন, তেমনি সমালোচনাও গ্রহণ করেন। কারণ তিনি মনে করেন সঠিক সমালোচনার মাধ্যমে তিনি তার নিজের দোষগুলো বুঝতে পারবেন এবং নিজেকে বদলাতে পারবেন। নীলা ‘হেটার্স’ শব্দটি পছন্দ করেন না। কারণ তিনি জানেন, অনেক মানুষের ভালোবাসা এবং দোয়া তার সঙ্গে আছে বলেই আজকে তিনি এতোটুকু অর্জন করতে পেরেছেন। ভক্তদের ভালোবাসা ছাড়া কেউ কোনো কিছু অর্জন করতে পারে না।

নিজেকে নিয়ে নীলা বেশ আত্মবিশ্বাসী। যেকোনো খারাপ সময় নিজেই নিজেকে শক্তি দেয়,  দিনশেষে নিজেকেই নিজের শক্তি হতে হয়। তাছাড়া কেউ কষ্টে থাকবে নাকি সুখে থাকবে এটা শুধু তার নির্ভর করছে, অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে তিনি ভালোবাসেন না। তাই নীলা মনে করেন, তার সবচেয়ে বড় সাপোর্টার তিনি নিজেই। নিজের না পাওয়া কিংবা জীবনে ছোটখাটো ব্যর্থতা নিয়ে তিনি খুব বেশি ভাবেন না। কারণ তিনি মনে করেন কোনো কিছুই স্থায়ী না, আজকে কেউ যা নিয়ে কষ্ট পাচ্ছে কয়েক বছর পর তা নিয়ে সে হাসবে। তাই কষ্ট পেয়ে নিজের সুন্দর মুহূর্তগুলো নষ্ট করতে চান না। নীলা বলেন, অনেক কিছুই আমার নিয়ন্ত্রণে নেই, আমি চাইলেই তা বদলে ফেলতে পারবো না এবং যা আমার নিয়ন্ত্রণ নেই তা নিয়ে যদি আমি দুশ্চিন্তা করি তাহলে শুধুই সময় অপচয় হবে। আমি বিশ্বাস করি যে আমার জন্য নির্ধারণ করা আছে তা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।

নীলা অভিনয় শিখেছিলেন সিনেমাতে কাজ করার ইচ্ছা নিয়ে। তিনি ভিন্নধর্মী চরিত্রে কাজ করতে আগ্রহী যে চরিত্র চিরকাল মানুষ মনে রাখবে। বিশেষ করে সংগ্রামী চরিত্র তাকে বেশি টানে। এমন সব সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করতে চান যাদের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে নতুন কিছু শিখতে পারবেন। এছাড়া নিজের জায়গা থেকে সবসময় মানুষের উপকার করে যেতে চান। কারণ তিনি মনে করেন একজন মানুষের সবার আগে একজন ভালো মানুষ হওয়া প্রয়োজন। ব্যক্তি হিসেবে একজন মানুষ ভালো হতে না পারলে তার জীবনে যত অর্জনই থাক তা বৃথা হয়ে যায়।

অবসরে নীলা বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করতে ভালোবাসেন। নীলার পশুপাখির প্রতি টান রয়েছে বিশেষ করে কুকুর ও বিড়াল। ভবিষ্যতে প্রাণীদের অধিকার রক্ষার জন্য কাজ করতে চান। ত্বক ভালো রাখার জন্য তিনি নিয়মিত যত্ন নেন ও ফিটনেসের জন্য ঘরেই ব্যায়াম করেন।

প্রতিযোগীদের মধ্যে নীলার উচ্চতা সবচেয়ে কম ছিল। যা নিয়ে তাকে সমালোচিত হতে হয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে নীলা বলেন, মানুষের ব্যক্তিত্বের ওজন ভারী হলে সে লম্বা খাটো কালো কিংবা ফর্সা হোক তা কখনই গুরুত্বপূর্ণ নয়। যোগ্যতা এবং ব্যক্তিত্ব থাকলে একজন মানুষ যেকোনো বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারে।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: সেলিব্রেটি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

eighteen + two =