মুক্তিযুদ্ধ ও বন্ধুত্বের চলচ্চিত্র ‘সিপাহী’

মাসুম আওয়াল

ঢাকাই সিনেমার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র। সেসব চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে আমাদের আত্মসম্মান ও স্বাধীনতার দিনগুলোর ইতিহাস। রঙবেরঙ এর প্রতি সংখ্যায় আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করি একটি মুক্তিযুদ্ধের সিনেমার আদ্যপান্ত। সেই ধারাবাহিকতায় এবার আমরা আলো ফেলার চেষ্টা করবো ‘সিপাহী’ চলচ্চিত্রে।

মুক্তির আলোয়

সিপাহী চলচ্চিত্রটি ১৯৯৪ সালের ৫ জানুয়ারি সেন্সর ছাড়পত্র পায়। এর পরপরই সারাদেশে মুক্তি পায়। কাজী হায়াৎ পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও ব্যবসায়িক সাফল্য পায়। চলচ্চিত্রটির প্রযোজক ছিলেন কে এম আর মঞ্জুর। চিত্রনাট্য ও কাহিনী লিখেছেন কাজী হায়াৎ। ৩৫ মিলিমিটারে নির্মিত হয় এটি। নৃত্য পরিচালক ছিলেন আমির হোসেন বাবু ও মাসুম বাবুল। সিনেমাটির শব্দগ্রাহক ছিলেন মমতাজ উদ্দিন ভূঁইয়া। প্রধান সহকারী পরিচালক গাজী জাহাঙ্গীর আহমেদ। চিত্রগ্রাহক ছিলেন মোজাফফর হোসেন। সম্পাদনা করেন সাইফুল ইসলাম। সিনেমাটির পরিবেশক ছিল মৌসুমী কথাচিত্র।

যাদের অভিনয়ে আলোকিত

অভিনয় করেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন, মান্না, চম্পা, কবিতা, আহমেদ শরীফ, খলিল উল্লাহ খান, আনোয়ার হোসেন, আয়েশা আক্তার, মিজু আহমেদ, দিলদার, লিটন আক্তার, রীতা ব্যানার্জী, সুরজ বাঙ্গালী, কাবিলা, কালা আজিজ প্রমুখ। সিনেমাটিতে রাজু চরিত্রে অভিনয় করেছেন চিত্রনায়ক মান্না এবং কাঞ্চন চরিত্রে অভিনয় করেছেন নন্দিত নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। কাশেম নামের একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন খ্যাতিমান অভিনেতা আনোয়ার হোসেন। টোকাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন মঈনুল। মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে অভিনয় করেছেন আনোয়ার হোসেন, ইলিয়াস কাঞ্চন, মান্নাসহ একদল অভিনেতা। আহমেদ শরীফ অভিনয় করেছেন খানসেনার চরিত্রে।

মুক্তিযুদ্ধের পরে পুলিশের অফিসার হন ইলিয়াস কাঞ্চন। বস্তির মাস্তান হয়ে যান মান্না। পুলিশের ডিআইজি চরিত্রে অভিনয় করেছেন খলিলুল্লাহ। জনপ্রিয় অভিনেতা দিলদারও অভিনয় করেছেন পুলিশের চরিত্রে। কাবিলাকেও অভিনয় করতে দেখা যায় মাস্তান চরিত্রে। ইলিয়াস কাঞ্চনের নায়িকা চম্পা ও মান্নার বিপরীতে দেখা যায় কবিতাকে। পরিচালক কাজী হায়াৎকেও এই সিনেমায় পাওয়া যায় অভিনেতা হিসেবে। একজন নেতার চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

কী আছে চলচ্চিত্রে?

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাঙালি সৈনিক কাশেম ফিরে যান তার গ্রামের বাড়িতে। পথে কিছু রাজাকার কাশেমকে জিজ্ঞাসা করে সে বাড়ি ফিরলো কীভাবে? গ্রামের একজন কাশেমকে তাদের হাত থেকে ছুটিয়ে আনে। কাঞ্চন, রাজু ও তার সহযোদ্ধারা কাশেমকে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বানান। তবে তাদের রাজাকার চাচার মাধ্যমে পাকবাহিনী জেনে গেলে গ্রামের বাড়িতে হত্যাযজ্ঞ চালায়। কাশেমের মা মারা যান। কাঞ্চন ও কাশেম তাদের চাচাকে হত্যা করে। একটি অপারেশনে আক্রমণ চলাকালে কাশেম যুদ্ধে আহত হন। প্রচণ্ড যন্ত্রনায় ছটফট করতে থাকেন তিনি। হানাদার বাহিনীর গোলাগুলি চলতেই থাকে। এক সময় ছোট ভাই কাঞ্চনকে সিপাহীর দায়িত্ব দেন। আর তাকে গুলি করে ফিরে যেতে বলে। কাঞ্চন দ্বিধায় পড়ে যান। এক সময় কমান্ডার ভাইয়ের আদেশে কমান্ডারের বুকেই গুলি চালান। এভাবেই শুরু হয় সিনেমাটির গল্প।

সিনেমার গল্পে তুলে ধরা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়কে। মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে নির্মাতা আসলে নির্মাণ করেছেন একটি ফর্মুলার ছবি। যেখানে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন হাজির হয়েছেন একজন সৎ পুলিশ অফিসার হিসেবে। পরবর্তীতে তার বন্ধু মুক্তিযোদ্ধা রাজু হয়ে যান একজন ক্রিমিনাল। বন্ধুর এমন অবস্থার কথা প্রথমে বিশ্বাস করতে চান না কাঞ্চন। এক সময় বন্ধু রাজুর মুখোমুখি হন কাঞ্চন। পুলিশ অফিসার কাঞ্চনকেও তোয়াক্কা করেন না রাজু। মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুর এমন বদলে যাওয়াকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না কাঞ্চন। রাজু পুলিশ অফিসারের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘কি সালামি চাই? আজ কিছু সেলামি দেব?’ উত্তরে কাঞ্চন বলে ওঠেন, ‘ভাবছি সালামি নেব নাকি দেব। ভাবছি গোপালগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম কবিরপুরে যে ছেলে একাত্তরে হাতে অস্ত্র নিয়ে শত্রু সেনাদের বিরুদ্ধে প্রথম গর্জে উঠেছিল, একি সেই রাজু! শত্রু সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে কাঁপেনি যে হাত, সেই পবিত্র হাত থেকে কিভাবে আমি সালামি নেব? কিভাবে আমি ওই হাতে হাতকড়া পরাবো!’ কথা শেষ হতে না হতেই রাজুকে বেদম প্রহার করতে শুরু করেন পুলিশ অফিসার ইলিয়াস কাঞ্চন। প্রহার করতে করতে তাকে থানায় নিয়ে আসেন। আটকে রাখেন লকআপে। থানায় নিয়ে আসার পর বন্ধুর বখাটে হয়ে যাওয়ার কারণও জানতে পারেন। গল্প মোড় নেয়ে অন্যদিকে।

চলচ্চিত্রের গান

সিপাহী চলচ্চিত্রের গানগুলো রচনা করেছেন রফিকুজ্জামান, মনিরুজ্জামান মনির, আহমেদ ইমতিয়াজ ও নজরুল ইসলাম বাবু। সঙ্গীত পরিচালনা ও সুরারোপ করেছেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। গানে কণ্ঠ দিয়েছেন রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, এন্ড্রু কিশোর, বেবী নাজনীন ও শাকিলা জাফর। অমর হয়ে আছে এই সিনেমার গানগুলো। যেমন একটি গানের শিরোনাম ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’। গানটি লিখেছেন প্রয়াত নজরুল ইসলাম বাবু ও সুর করেছেন খ্যাতিমান সুরকার প্রয়াত আহমদ ইমতিয়াজ বুলবুল। আবহসঙ্গীত হিসেবে ব্যবহৃত হয় ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’ গানটি। ব্যবহৃত হয় কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট’ গানটিও। সিনেমার অমর হয়ে যাওয়া গানগুলোর মধ্যে আছে ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না।’ এখনো স্বাধীনতা দিবস আসলেই বেজে ওঠে গানটি। এছাড়া হাস্যরসাত্বক কয়েকটি গানও ব্যবহার করা হয়েছে এই সিনেমায়।

পরিচালককে নিয়ে কিছু কথা

‘সিপাহী’ চলচ্চিত্রের পরিচালক বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী হায়াৎ একাধারে একজন পরিচালক, কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক এবং অভিনেতা। ১৯৪৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার ফুকরা ইউনিয়নের তারাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। গ্রামের পাঠশালাতেই তার লেখাপড়া শুরু। এরপর ক্লাস ওয়ানে উঠলে তিনি স্থানীয় ফুকরা মডেল স্কুলে প্রাথমিকে ভর্তি হন। সেখান থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া শেষ করে ফুকরা মদন মোহন একাডেমিতে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। কাজী হায়াৎ এর কলেজ জীবন শুরু হয় রামদিয়া শ্রীকৃষ্ণ কলেজে। এরপর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (তৎকালীন কলেজ) থেকে হিসাববিজ্ঞানে এমকম সম্পন্ন করেন। কাজী হায়াৎ এর স্ত্রীর নাম রমিসা হায়াৎ। তাদের সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। ছেলে কাজী মারুফ চলচ্চিত্র অভিনেতা। অ্যাকশন ঘরানার চলচ্চিত্রে অভিনেতা কাজী মারুফ তার চলচ্চিত্র জীবন শুরু করেন ‘ইতিহাস’ ছবির মাধ্যমে। কাজী হায়াৎ পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ২০০২ সালে। প্রথম ছবিতেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নেন কাজী মারুফ।

কাজী হায়াৎ প্রথমে ১৯৭৪ সালে মমতাজ আলীর সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। পরে আলমগীর কবিরের সঙ্গে ‘সীমানা পেরিয়ে’ (১৯৭৭) ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। তিনি পরিচালক হিসেবে ১৯৭৯ সালে ‘দি ফাদার’ ছবিটি পরিচালনা করেন, যা শৈল্পিক দিক থেকে প্রশংসিত হয়। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন জন নেপিয়ার অ্যাডামস, বুলবুল আহমেদ ও সুচরিতা। কাজী হায়াৎ তার বেশিরভাগ ছবিতে বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সমসাময়িক জনদুর্ভোগের চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। চলচ্চিত্র পরিচালনার পাশাপাশি কাজী হায়াৎ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

কাজী হায়াৎ এ পর্যন্ত ৫১টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। তার মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫০টি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। ‘বীর’ চলচ্চিত্র দিয়ে তিনি ৫০তম চলচ্চিত্র পরিচালনার মাইলফলক স্পর্শ করেন। কাজী হায়াৎ পরিচালিত অন্যতম চলচ্চিত্রসমূহ হলো: দাঙ্গা (১৯৯২), ত্রাস (১৯৯২), চাঁদাবাজ (১৯৯৩), সিপাহী (১৯৯৪), দেশপ্রেমিক (১৯৯৪), লাভ স্টোরি (১৯৯৫), আম্মাজান (১৯৯৯), ইতিহাস (২০০২), কাবুলিওয়ালা (২০০৬) এবং ওরা আমাকে ভাল হতে দিল না (২০১০)। তার পরিচালনায় সর্বশেষ সরকারি অনুদানের সিনেমা ‘জয় বাংলা’। মুনতাসীর মামুনের ‘জয় বাংলা’ উপন্যাস থেকে এটি নির্মাণ করা হয়েছে।

শেষ কথা

সব মিলিয়ে ‘সিপাহী’ চলচ্চিত্রটি একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের, ভালোসার, অ্যাকশন, কমেডি, গানের এবং বন্ধুত্বের চলচ্চিত্র। সিনেমাটিতে দুই বন্ধুর সম্পর্কের টানাপোড়েনের গল্প যেমন দেখানো হয়েছে, তেমনি দেখানো হয়েছে একজন বন্ধু একে অপরের জন্য কেমন নিবেদিত হয়। দেখানো হয়েছে ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের ভালোবাসা। একজন ন্যায়পরায়ন দেশপ্রেমিক পুলিশ অফিসারকে। হাসির ছলেই দেখানো হয়েছে সমাজের ক্ষতগুলো। এমন চলচ্চিত্র এখন আর নির্মাণ হয় না। পরিচালকরা এক সময় একই সঙ্গে চলচ্চিত্র মাধ্যমে সমাজকে গড়ে তুলতে নানা মেসেজ দিতেন, পাশাপাশি গল্পের মধ্যে থাকতো আনন্দের খোরাক।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: মুক্তিযুদ্ধর সিনেমা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 × 1 =