মৌ সন্ধ্যা
এক সময় বাংলা সিনেমার নন্দিত নায়িকা ছিলেন অঞ্জনা রহমান। রুপালি পর্দার মানুষ হিসেবে যাকে সবাই চিনতো অঞ্জনা নামেই। নাচের মানুষ থেকে হয়ে উঠেছিলেন সবার প্রিয় নায়িকা। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে সবাইকে ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি। সিনেপাড়ার মানুষরা তাকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই হারিয়ে গেলেন ঢাকাই সিনেমার রঙিন নবাব প্রবীর মিত্র। রঙবেরঙের পক্ষ থেকে রইলো তাদের প্রতি শ্রদ্ধা। আশির দশকে বাংলা সিনেমার সোনালি দিনগুলো যাদের হাত ধরে রং ছড়িয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ‘দস্যু বনহুর’খ্যাত নায়িকা অঞ্জনা রহমান ও ‘রঙিন নবাব’খ্যাত অভিনেতা প্রবীর মিত্র।
প্রবীর মিত্র
অনেকদিন থেকেই পর্দার আড়ালে ছিলেন খ্যাতিমান অভিনেতা প্রবীর মিত্র। নানা সময় মান অভিমান করতেন তার সিনেমার বন্ধুদের নিয়ে। মাঝে মধ্যেই গণমাধ্যমে কথা বলতেন সিনেমার নানা বিষয় নিয়ে। সব সময় মিস করতেন সিনেপাড়াকে। এখন সব কিছুর উর্ধ্বে চলে গেছেন তিনি।
ঢাকার ছেলে
প্রবীর মিত্র ১৯৪৩ সালের ১৮ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান বাংলাদেশ) কুমিল্লার চান্দিনায় এক কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম প্রবীর কুমার মিত্র। তার পিতা গোপেন্দ্র নাথ মিত্র এবং মাতা অমিয়বালা মিত্র। বংশপরম্পরায় পুরান ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা প্রবীর মিত্র। তিনি ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠেন। তিনি সেন্ট গ্রেগরি এবং পোগজ স্কুলে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
অভিনয়ে হাতে খড়ি
বিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় প্রথমবারের মতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকে প্রহরী চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৬৯ সালে প্রয়াত এইচ আকবরের ‘জলছবি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রথম প্রবীর মিত্র ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। যদিও চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারি। তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন এই অভিনেতা। ‘জলছবি’ সিনেমায় চিকিৎসকের চরিত্রে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে সূচনা হয় তার। এরপর একই পরিচালকের ‘জীবন তৃষ্ণা’ ছবিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘চাবুক’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রে।
আলোচিত সিনেমা
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে প্রবীর মিত্র ‘নায়ক’ হিসেবে কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। এরপর চরিত্রাভিনেতা হিসেবে কাজ করেও তিনি পেয়েছেন দর্শকপ্রিয়তা। তার অভিনীত আলোচিত সিনেমাগুলোর মধ্যে আছে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘সেয়ানা’, ‘জালিয়াত’, ‘ফরিয়াদ’, ‘রক্ত শপথ’, ‘চরিত্রহীন’, ‘জয় পরাজয়’, ‘অঙ্গার’, ‘মিন্টু আমার নাম’, ‘ফকির মজনু শাহ’, ‘মধুমিতা’, ‘অশান্ত ঢেউ’, ‘অলংকার’, ‘অনুরাগ’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘তরুলতা’, ‘গাঁয়ের ছেলে’, ‘পুত্রবধূ’। চার শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।
ধর্ম পরিবর্তন
নামের কারণে প্রবীর মিত্র হিন্দু না মুসলাম এই প্রশ্ন আছে অনেকের মনে। বিষয়টি নিজেই খোলসা করেছিলেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। জানা গেছে, প্রবীর মিত্র তার প্রেমিকা অজন্তাকে বিয়ে করেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, বিয়ে করার সময় তিনি হিন্দুধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। প্রবীর মিত্রের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। মিঠুন মিত্র, ফেরদৌস পারভীন, সিফাত ইসলাম ও সামিউল ইসলাম। এর মধ্যে সামিউল মারা গেছেন। প্রবীর মিত্রের স্ত্রী অজন্তা মিত্রও মারা গেছেন ২০০০ সালে।
অভিনয়ের বাইরে
অভিনয়ের বাইরে প্রবীর মিত্র ষাটের দশকে ঢাকা ফার্স্ট ডিভিশন ক্রিকেট খেলেছেন, ছিলেন অধিনায়ক। একই সময় তিনি ফার্স্ট ডিভিশন হকি খেলেছেন ফায়ার সার্ভিসের হয়ে। এ ছাড়া কামাল স্পোর্টিংয়ের হয়ে সেকেন্ড ডিভিশন ফুটবলও খেলেছেন।
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি
১৯৮৩ সালে ৭ম বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার আয়োজনে ‘বড় ভালো লোক ছিল’ সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন প্রবীর মিত্র। এছাড়াও নানা পুরস্কার পেয়েছেন। আরও পেয়েছেন দর্শকের অফুরন্ত ভালোবাসা।
শেষ বিদায়
খ্যাতিমান অভিনেতা প্রবীর মিত্র না ফেরার দেশে চলে গেছেন ৫ জানুয়ারি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ৮১ বছর বয়সী প্রবীর মিত্র বেশ কিছু শারীরিক জটিলতা নিয়ে ১৩ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। শরীরে অক্সিজেন-স্বল্পতাসহ নানা অসুস্থতায় গত ২২ ডিসেম্বর তাকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। ৬ জানুয়ারি জোহরের নামাজের পর এফডিসিতে তার প্রথম জানাজা হয়। এরপর চ্যানেল আইতে দ্বিতীয় জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।
অঞ্জনা রহমান
এই সময়ে এসেও সবার প্রিয় মুখ ছিলেন অঞ্জনা রহমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সরব থাকতে দেখা যেত তাকে। এফডিসিকেন্দ্রিক নানা অনুষ্ঠানেও তার দেখা মিলতো। শোনাতেন সিনেমার হারানো দিনের গল্প। আর তার দেখা মিলবে না কোনো অনুষ্ঠানে।
ঢাকার মেয়ে
অঞ্জনা ১৯৬৫ সালের ২৭ জুন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ঢাকার ব্যাংক কোয়ার্টারে এক সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তারা দুই বোন এক ভাই। অঞ্জনার পৈতৃক নিবাস চাঁদপুর। ছোটবেলা থেকে নাচের দিকে আগ্রহের কারণে বাবা-মা তাকে নাচ শিখতে ভারতে পাঠান। সেখানে তিনি ওস্তাদ বাবুরাজ হীরালালের অধীনে নাচের তালিম নেন এবং কত্থক নৃত্য শিখেন। নৃত্যে অঞ্জনা তিনবার জাতীয় পুরস্কারও লাভ করেন।
নৃত্যশিল্পী থেকে নায়িকা
মাত্র চার বছর বয়সে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নৃত্যশিল্পী হিসেবে অঞ্জনার আত্মপ্রকাশ হয়। এরপর অনেক অনুষ্ঠানে নৃত্যশিল্পী হিসেবে পারফর্ম করেছেন। বাবুল চৌধুরী পরিচালিত ‘সেতু’ চলচ্চিত্র দিয়ে ঢাকাই সিনেমায় কাজ শুরু করলেও তার মুক্তি পাওয়া প্রথম চলচ্চিত্র ছিল দস্যু বনহুর (১৯৭৬)। তবে আজিজুর রহমানের ‘অশিক্ষিত’ সিনেমায় রাজ্জাকের বিপরীতে প্রথম একক নায়িকা হিসেবে তার অভিনয় পথচলা শুরু। এক সাক্ষাৎকারে অঞ্জনা বলেছিলেন, “পারভেজ ভাই (সোহেল রানা) হাত ধরে আমাকে সিনেমায় এনেছিলেন। কিন্তু আজিজ ভাই যদি অশিক্ষিত ছবিতে না নিতেন, আজ আমি অঞ্জনা হতে পারতাম না। আমার জীবনের মাইলফলক অশিক্ষিত। এই সিনেমার গান ‘আমি এক পাহারাদার’, ‘আমি যেমন আছি তেমন রবো, বউ হবো না রে’, ‘ঢাকা শহর আইসা আমার’ মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে গিয়েছিল।”
যত আলোচিত সিনেমা
চার দশকের ক্যারিয়ারে শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন অঞ্জনা। ঢাকাই সিনেমার তার সময়ের আলোচিত প্রায় সব নায়ক ও পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। চিত্রনায়ক রাজ্জাকের সঙ্গেই প্রায় ৩০টি সিনেমা করেছেন অঞ্জনা। দেশের বাইরে ভারতের মিঠুন চক্রবর্তী, পাকিস্তানের নাদিম, ফয়সাল, জাভেদ শেখ, ইসমাইল শাহ, নেপালের শিবশ্রেষ্ঠ ও ভুবন কেসির সঙ্গেও অভিনয় করেছেন এই নায়িকা। অঞ্জনা অভিনীত অন্য উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে আছে মাটির মায়া, চোখের মণি, সুখের সংসার, জিঞ্জির, অংশীদার, আনারকলি, বিচারপতি, আলাদিন আলীবাবা সিন্দাবাদ, অভিযান, মহান, রাজার রাজা, বিস্ফোরণ, ফুলেশ্বরী, রাম রহিম জন, নাগিনা। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে অভিনয়ে অনিয়মিত হয়ে পড়েন অঞ্জনা। ২০০৮ সালে মুক্তি পায় তার সর্বশেষ সিনেমা ‘ভুল’।
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি
এক জীবনে অভিনয় করে দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছেন অঞ্জনা রহমান। পেয়েছেন নানা সম্মানজনক পুরস্কার। এশিয়া মহাদেশীয় নৃত্য প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। জাতীয় নৃত্য প্রতিযোগিতা তিনবার প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। এছাড়া তিনি রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারসহ, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ‘গাঙচিল’ ও ‘পরিণীতা’ সিনেমার জন্য পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
পরিবার
অঞ্জনারা দুই বোন, এক ভাই। নির্মাতা আজিজুর রহমান বুলিকে বিয়ে করেছিলেন অঞ্জনা। তাদের দুই কন্যা ফারজানা ও নিশি এবং পুত্র মনি নিশাত।
শেষ বিদায়
জনপ্রিয় নায়িকা অঞ্জনা ২০২৪ সালের ৪ জানুয়ারি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। তিন সপ্তাহ ধরে জ্বরে ভুগছিলেন অঞ্জনা রহমান। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় পরে অঞ্জনাকে নেওয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ)। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও আর ফেরা হয় না তার। শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ৫ জানুয়ারি বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে এফডিসিতে আনা হয় অঞ্জনার মরদেহ। শেষবারের মতো এই চিত্রনায়িকাকে দেখতে আসেন দীর্ঘদিনের সহকর্মী, ভক্ত থেকে সংবাদকর্মীরা। প্রথম জানাজা শেষে মরদেহ নেওয়া হয় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: স্মৃতিচারণ