রঙিন ফিতার বাঁধনে চুল

শবনম শিউলি

‘এই চুড়ি ফিতা লাগবে…রঙিন চুড়ি, লেইস, ফিতা…’ নব্বই দশকের কিশোরীদের বিকেল বেলার খুব প্রচলিত শব্দ এগুলো। শহরতলীতে কম হলেও গ্রামীণ জীবনে এই ডাক বেশ প্রচলিত ছিল। একটা চারকোণা কাঠের বাক্স, কাচের নিচে হরেক রকম কানের দুল, মাথার ব্যান্ড আর রঙ্গিন ফিতা। এই বাক্স নিয়ে ফেরিওয়ালার বলে যাওয়া এই লাইনগুলো অনেকের কাছেই শৈশবের সুন্দর স্মৃতি বয়ে নিয়ে আসে। এখন শহরতলী তো দূরে থাক, গ্রামাঞ্চলেও এমন কিছুর দেখা মেলা দায়। এক রাশ খুশি তখন কিশোরীদের মনে ভালো লাগার এক নতুন বাতাস বয়ে নিয়ে যেত। আজকের দিনে চুলে রঙিন ফিতা না পরলেও একটা সময় এটাই ছিল ফ্যাশন। বেণী কিংবা ঝুঁটি জুড়ে ঝুলে থাকতো হরেক রকম রঙিন ফিতা। আর সেখান থেকেই এসেছে লেইস দিবস। ১ ফেব্রুয়ারিকে পালন করা হয় বিশ্ব লেইস দিবস হিসেবে।

ঠিক কবে কীভাবে লেইসের প্রচলন শুরু হয়েছিল, তা বলা কঠিন। ‘লেইস ফিতা লেইস, চুড়ি ফিতা, রঙিন সুতা রঙিন করিবে মন/ লেইস ফিতা লেইস…’  এ গানটির সঙ্গে অনেকেরই পরিচয় রয়েছে। গুরু জেমসের এই গানের কথা নতুন প্রজন্মের মুখে মুখে ছিল একটি সময়ে। দেশে এই লেইস ফিতা সাধারণ মানুষের ঘর অবধি পৌঁছে দিত ফেরিওয়ালা। তাদের কাছে সেই বাক্সে বন্দি থাকতো মানুষের আবেগ আর খুশির এক ঝলক। তাদের ডাকে গ্রামীণ আর শহুরে কিশোরী আর নারীদের মন চনমনে হয়ে উঠত।

ইতিহাসে লেইস ফিতা

ইতালীয়দের দাবি, ১৯৪৩ সালে মিলানের প্রভাবশালী স্ফোরজা পরিবারের হাত ধরে যাত্রা শুরু লেইসের। এরপর ১৬ শতকে এসে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হতে থাকে লেইস। ১৮ শতকে এসে রীতিমতো আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে এই লেইস। বর্তমানে যখনই প্রাচীন স্টাইলের সঙ্গে আধুনিক স্টাইলের মেলবন্ধন হয়েছে তখনই বারবার ফিরে এসেছে এই লেইস ফিতা। কখনও মাথায়, কখনও বা কাপড়ে। লেইস ফিচার চল আজও ফ্যাশনে ঘুরে ফিরে বারবার চলে আসে।

ফিতা দিয়ে চুল বাঁধা

দেশে লম্বা চুলে কলা বা খেজুর বেণী করে ফিতা বাঁধার প্রচলন রয়েছে। রঙিন ফিতা দিয়ে চুল বাঁধা পয়লা বৈশাখে ঐতিহ্যবাহী সাজ হিসেবে বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে। অনুষ্ঠানে বা দাওয়াতে চুলের সাজে কিছুটা ব্যতিক্রম ধারা আনতে ফিতার ব্যবহার করা যায়। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী সাজে ফিতার ব্যবহার এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। চুল বাঁধতে সাধারণত স্যাটিন কাপড়ের তৈরি চিকন বা মোটা ফিতা ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া ভেলভেট বা অন্য কোনো চিকন লেইস দিয়ে চুল বেঁধে নতুনত্ব আনা যায়। সব চুল দিয়ে একটি বেণী করে পুরো মাথায় পেঁচিয়ে মুকুটের মতো করে ফিতা দিয়ে বেঁধে দেওয়া যায়।

পুরাতন স্টাইলে

সামনেই আসছে বৈশাখ মাস। তার আগে আসবে ফাল্গুন। ফাল্গুন থেকে বৈশাখে যেতে যেতেই পড়ে যাবে ভীষণ গরম। তখন মানুষের সাজ পোশাকে যেমন পরিবর্তন আসে, তেমনই পরিবর্তন আসে চুলের বাঁধনেও। অনেকেই চুল খোপা করে রাখেন, গরম থেকে বাঁচার জন্য। সেই খোপারও নানা স্টাইল এসেছে আজকাল। বেশিরভাগ সময়ই মেয়েরা এখন ‘ডোনাট বান’ করে থাকেন। কারণ অতিরিক্ত গরমের কারণে বৈশাখী সাজপোশাকে স্বস্তি বা আরাম পেতে ফতুয়া, প্যান্ট অথবা সালোয়ার-কামিজ পরেন। এটা কিছুটা পাশ্চাত্য স্টাইল। আর এমন পোশাকের সঙ্গে চুলেও পাশ্চাত্যের ছোঁয়া ধরে রাখেন অনেকেই। ফলে চুলে দেখা যায় একটু উঁচু করে পনিটেইল। সেখানে মোটা ফিতা, কিছুটা ফাঁক রেখে ক্রস করে পুরো চুলে পেঁচিয়ে নেওয়া যেতে পারে।

শিশুদের চুলে ফিতা

স্টাইল কিংবা ফ্যাশান শুধু বড়দের জন্য নয়। শিশুরাও ফ্যাশন ও স্টাইল সচেতন। আর শিশুদের মাথায় রঙিন ফিতা তাদের মনকেও ভালো করে তুলতে পারে। অনেক স্কুলে এখনও চুল ফিতা দিয়ে বাঁধার নিয়ম আছে। তবে তা সংখ্যায় খুবই কম। এমনকি শহরতলীতে তা দেখা যায় না বললেই চলে। তবে স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সময় শিশুদের চুল ফিতা দিয়ে বাঁধতে দেখা যায়। বৈশাখে বড়দের মতো শিশুদেরও উঁচু পনিটেইল করে রঙিন ফিতা দিয়ে বড় ফুল করে দেওয়া যেতে পারে। এতে শিশু আরামও পাবে।

ফিতার রঙ

আগে ফিতা দিয়ে বেণী আর খোঁপা করার প্রচলন ছিল। বর্তমানে ফিউশন সাজের ক্ষেত্রেও ফিতার ব্যবহার করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ষাটের দশকের নায়িকাদের মতো চুল ফুলিয়ে সামনের দিকে ফিতা বেঁধে দেওয়া যায়। অনেকেই এক রঙের ফিতা দিয়ে চুল বাঁধেন। তবে দুই রঙের ফিতাও খুব একটা খারাপ লাগে না দেখতে। তবে পোশাকের সঙ্গে মিল রেখে ফিতার রং বাছাই করা ভালো। অনেক রঙের ফিতা একসঙ্গে ব্যবহার করলে ভালো লাগার বদলে দৃষ্টিকটূ হবে। বিপরীত রঙের দুটি ফিতা দিয়ে চুল বাঁধলে বেশি আকর্ষণীয় হবে।

চুলে ফিতার বাঁধুনি

খোঁপা কিংবা বেণী সবকিছুতেই ব্যবহার করা যেতে পারে। চুলে পেঁচিয়ে নেওয়া যেতে পারে নানা রঙের ফিতা। চুলে ‘ডোনাট বান’ করে নিচের দিকে পছন্দ মতো ফিতা পেঁচিয়ে নেওয়া যেতে পারে। চুলে রাবার ব্যান্ডের মতো করে ফিতা বেঁধে নেওয়া যায়।

বাজারে সবরকম প্রসাধন সামগ্রী আর সাজসজ্জার জিনিস পাওয়া যায়। দেশে এক সময় লেইস ফিতাওয়ালাদের বিচরণ ছিল। সময়ের পালাবদলে লেইস ফিতাওয়ালাদের এখন আর আগের মতো দেখা মেলে না। শহরের যান্ত্রিকতার ভিড়ে হারিয়ে গেছে লেইস ফিতাওয়ালারা। মফস্বল বা গ্রামের পথেও তাদের পদচারণা কদাচিৎ ঘটে। কারণ এখন আর আগের মতো গ্রামে কেউ চুড়ি ফিতা কেনেন না।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: দিবস

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

seven − three =