রিকশা গার্ল দর্শকদের কতটা মন জয় করলো

জাহান নূর

বিজ্ঞাপনচিত্র ও ছোট পর্দার নির্মাতা হিসেবে পরিচিত অমিতাভ রেজা চৌধুরী। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তৈরি করেছেন অনেক বিজ্ঞাপনচিত্র। তবে বড় পর্দায় চমক দেখিয়েছিলেন ‘আয়নাবাজি’ সিনেমা দিয়ে। বিপুল দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিল সিনেমাটি। অথচ গত আট বছরে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়নি তার নির্মিত আর কোনো ছবি। তবে এবছর হাজির হয়েছেন তার নতুন সিনেমা ‘রিকশা গার্ল’ নিয়ে। মিতালি পারকিন্স-এর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে এই সিনেমাটি। সিনেমাটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল বেশ আগেই। কোভিডসহ নানা কারণে সিনেমার মুক্তি ব্যাহত হয়। তবে বিশ্বের ৩০টির বেশি চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি প্রদর্শনের পর গত ২১ জানুয়ারি দেশের ১১টি সিনেমা হলে মুক্তি পায় অমিতাভ রেজা চৌধুরীর ‘রিকশা গার্ল’ সিনেমা।

সিনেমাটির গল্প শুরু হয় প্রধান চরিত্র নাইমাকে নিয়ে। পাবনার পাকশীর এক গ্রামের মেয়ে নাইমা। তার জীবন, বেড়ে ওঠা কিংবা পৃথিবী বলতে এই এলাকাটুকুই। ভাড়ায় রিকশা চালানো বাবার মেয়ে নাইমা, পারিবারিক টানাপোড়েনে যে ক্লাস ফাইভের বেশি পড়াশুনা করতে পারেনি। ঘরে ঘরে ঝিয়ের কাজ করে পরিবারকে কিছুটা সাহায্য করতে চায় সে। আর এর বাইরে তার জীবন মানেই পেইন্টিং। সে ভীষণ আঁকতে ভালবাসে, ঘরের টিনের চাল, দেয়াল বা যেখানেই জায়গা পায় সে বুলিয়ে যায় রং-তুলির আঁচড়। এরই মাঝে তার রিকশাচালক বাবা সেলিম অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার ভাড়ার রিকশা নিয়ে চলে যায় রিকশা মালিক মামুন। আর সেই সঙ্গে অনটনের খড়্গ নেমে আসে পরিবারের ওপর। বাবার চিকিৎসার খরচ মেটানোর জন্য জীবিকার তাগিদে একদিন বাড়ি ছাড়ে নাইমা, ঢাকায় পৌঁছে যায় তার গ্রামের বাস কন্ডাক্টর বারেকের সঙ্গে। যান্ত্রিকতা আর স্বার্থপরতার ভিড়ে ধাক্কা খেতে খেতে বেঁচে থাকার গল্প নিয়ে এগোয় সিনেমা ‘রিকশা গার্ল’।

এ সিনেমার মাধ্যমে নতুন কিছু এক্সপেরিমেন্ট দেখতে পেয়েছে দর্শক। সিনেমার সংলাপগুলো বাংলা এবং ইংরেজি উভয় ভাষায় তৈরি হয়েছে। যা সচারাচর আমাদের ইন্ডাস্ট্রির সিনেমাগুলোতে দেখা যায় না। যেমন একজন রিকশাওয়ালা তার গ্যারেজ মালিকের সঙ্গে যে কথা বলছে তা ইংরেজিতে বলছে, নাইমা যখন পথশিশুদের সঙ্গে কথা বলছে তখনো ইংরেজিতে বলছে। যা সিনেমাটিতে সারাক্ষণই দর্শক এক অদ্ভুত অনুভূতির মধ্যে দিয়ে যাবে। তবে এ কাজটা মোটেও সহজ ছিলো না। কেননা দেশের সিনেমায় সচরাচর ইংরেজি বলতে গিয়ে ভুলভাল এবং অস্পষ্ট উচ্চারণ করা হয়। যা বেশ দৃষ্টিকটূ লাগে। তবে এই সিনেমায় নির্মাতা চরিত্রগুলো দিয়ে এমনভাবে ইংরেজি ভাষাটা প্রতিষ্ঠা করেছেন, দেখে মনে হবে এতেই তাদের প্রাঞ্জলতা। এভাবেই তারা কথা বলেন। এই ভাষার দ্বিত্ব বজায় রাখতে আশেপাশের সেট নির্মাণ থেকে শুরু করে জুনিয়র আর্টিস্ট, এমনকি সেট-ফ্রেম সব কিছু নিয়েই আগাগোড়া কাজ করতে হয়েছে ‘রিকশা গার্ল’ টিমের, যা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য।

সিনেমাটিতে ভালোলাগার আরেকটি দিক হলো এর আবহ সঙ্গীত, পুরো সময়জুড়ে বেদনার সুরে আর ফলির সমন্বয়ে ‘রিকশা গার্ল’ আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে গেছে। সিনেমাটিতে সাউন্ড ডিজাইনিংয়ে নিজের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন রিপন নাথ। তিনি বর্তমান সময়ে চ্যালেঞ্জিং সাউন্ড ডিজাইনিংয়ের ক্ষেত্রে এক ভরসার নাম। প্রয়াত সঙ্গীত লেখক রাজিব আশরাফের কথায় ‘যাযাবর’ গানটিতে আরাফাত মহসিন নিধি ও আরাফাত কীর্তির মিউজিক কম্পোজিশন বেশ মন ছুঁয়েছে। শারমিন সুলতানা সুমির কথায় ও কণ্ঠে ‘তোমার শহর’ গানটিও ভালো হয়েছে। তবে কিছুটা ভুল সময়ে গানটির প্লেব্যাক হয়েছে। এই সিনেমায় অমিতাভ রেজা চৌধুরীর আরেক সিনেমা ‘আয়নাবাজি’র গান, সায়ান চৌধুরী অর্ণবের কণ্ঠে ‘এই শহর আমার’ আবহ সঙ্গীত হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং সেটি সবচেয়ে মানানসই একটা সময়ে। নাইমা যখন রিকশা নিয়ে ঢাকার বুকজুড়ে টিকে থাকার সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে, ঢাকার খণ্ড খণ্ড চিত্র যখন পর্দায় ধরা দিচ্ছে, তখনই বেজে ওঠে এই আবহ সঙ্গীত। এটিও এক্সপেরিমেন্টের দিক থেকে এই সিনেমাকে কিছুটা বিশেষ অবস্থানে রাখবে।

‘রিকশা গার্ল’ সিনেমার সবচেয়ে ভালোলাগার বিষয় হলো এর সিনেমাটোগ্রাফি। তুহিন তামিজুল ছিলেন মূল সিনেমাটোগ্রাফার, পুরো সিনেমায় তিনি তার মুন্সিয়ানা বেশ ভালোভাবেই দেখিয়েছেন। এর আগেও ‘রেহানা মরিয়ম নুর’ এর সিনেমাটোগ্রাফির জন্য তুহিন বেশ আলোচিত হয়েছিলেন। টিনের ওপর পেইন্টিংয়ের সময় নাইমার শুয়ে থাকা বা লরির ফাঁকে পাজল গেইমের মতো করে নাইমা আর বারেকের লুকোচুরি খেলার মতো দৃশ্য; সেইসঙ্গে কখনো হ্যান্ডহেল্ড শট, কখনো কন্টিনিওয়াস শট এসব দিয়ে তুহিন তামিজুল পুরো সিনেমাকেই করে তুলেছেন নজরকাড়া। ঢাকার যানজট, টাইম-ল্যাপ্স কিংবা স্লো মোশনের ড্রোন শট, কোনাকুনি বিভিন্ন শটে সিনেমাটি উপভোগ্য করেছে। একটা শটে দেখা যায়, নাইমা ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছে, সেই শটে সিনেমাটোগ্রাফার ক্যামেরাকে নাইমার কাছ থেকে আস্তে আস্তে তার ঘরের দেয়ালের পেইন্টিংয়ের দিকে সরিয়ে ফেইড আউট করান। যেন নাইমা চলে যাচ্ছে আর তার পেইন্টিং রয়ে গেছে, সে দৃশ্যের জীবন্ত সাক্ষী।

‘রিকশা গার্ল’ সিনেমায় সম্পাদনার কাজটি বেশ ভালোভাবে করেছেন নবনীতা সেন। একেবারে প্রতিটা কাটই সেখানে দারুণ ছিল। অ্যানিমেশন, আলো আর প্রপস, কস্টিউমে নিপুণতার ছোঁয়া ‘রিকশা গার্ল’কে আলাদাভাবে দর্শকের সামনে পরিবেশন করতে সাহায্য করেছে। আলো আর রঙের ভারসাম্য মেলাতে একটা সেটে নীল রঙের টিনকে নতুনভাবে রং করিয়ে আলো ফেলা, অথবা নাইমাকে রাতের আঁধারে আবছা আবছা আলো ফেলে কনট্রাস্ট তৈরি করা এসব কিছুই ভীষণ সুন্দর ছিল। ডি আই কালারিস্ট, আর্ট ডিরেক্টর আর অ্যানিমেশন ডিরেক্টর তিনজনই বাহবা পাওয়ার যোগ্য।

সিনেমায় নাইমা চরিত্রে অভিনয় করেছেন অভিনেত্রী নভেরা রহমান। তার এই চরিত্র খুব যে সহজ কোনো চরিত্র ছিল না তা বুঝতে হলে আপনাকে অবশ্যই সিনেমাটি আগে দেখতে হবে। সহজ সরল এক মেয়ে ঢাকায় গিয়ে ছেলের লেবাস নেওয়া, ছেলের মতো করে অভিব্যক্তি দেওয়া কিংবা ইমোশন দেওয়া বেশ সহজ একটা বিষয় না। তবে সেই কাজটি বেশ ভালোভাবে করেছেন নভেরা যা আসলেই প্রশংসনীয়। যা তার ক্যারিয়ারে সেরা কাজের মাঝে একটি হয়ে থাকবে। ‘রিকশা গার্ল’ সিনেমায় সে অর্থে বড় কোনো ভিলেন নেই। ভিলেন হিসেবে যেন উপস্থাপন করা হয়েছে সমাজকে। যেখানে মেয়েরা কেবল মেয়ে বলেই রিকশা চালাতে পারে না। তবে নেগেটিভ চরিত্র একেবারে নেই তা নয়। সিনেমাটিতে নেগেটিভ চরিত্রে অভিনয় করেছেন অভিনেতা নাসির উদ্দিন খান। গ্রামের এক নেতার ছত্রছায়ায় নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি ছড়িয়ে গ্রামে নিজের জুলুম পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে যা যা দরকার তা বেশ ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন নাসির উদ্দিন খান তার মামুন চরিত্রে। বাকের চরিত্রে এলেন শুভ্রও তার যতটুকু দেওয়া সম্ভব তা দিয়েছেন। এছাড়াও অশোক বেপারী, সিয়াম আহমেদ, টয়া, মোমেনা চৌধুরী, নরেশ ভুঁইয়াও ভালো অভিনয় করেছেন।

সঙ্গীত পরিচালনা এ সিনেমার বিশেষ একটি দিক। তবে সিনেমাটির বেশিরভাগ জায়গায় ভুল শব্দগ্রহণও দেখা গেছে। যেমন, পাখির কিচিরমিচির ডাকের সঙ্গে পাখির নড়াচড়া মেলেনি, কিংবা রিকশা যখন গ্যারেজে ঢোকানো হচ্ছে সে সময়ে যে শব্দ তৈরি হওয়ার কথা তা নেই। আবার গ্যারেজে রান্নার সময় এত বড় ডেকচিতে রান্না হচ্ছে, বারবার ঢাকনা নাড়ানো হচ্ছে, কিন্তু তার শব্দ বুঝতে পারা যায়নি। অন্যদিকে মূল চরিত্রকে এতো বেশি ফোকাস করা হয়েছে যে অন্যসব চরিত্র ঢাকা পড়ে গেছে।

কালার গ্রেডিংয়েও কাজ করা দরকার ছিল। তবে সিনেমাটির সবচেয়ে খারাপ দিক হলো সঠিক সময়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি না পাওয়া। সিনেমাটি নির্মাণ হয়েছে ২০২১ সালে তবে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ২০২৫ সালে। যার কারণে দর্শকের আগ্রহ বেশ কমে যায়। তবে সব কিছু মিলিয়ে ‘রিকশা গার্ল’ সিনেমাটাকে বিশেষ জায়গায় রাখা যায়। সিনেমার সমাপ্তি, ক্লাইমেক্স, ট্র্যাজেডি কোনো কিছু বেশ বড় আকারে হাজির করেননি নির্মাতা। সাধারণ সুন্দরভাবে দর্শকদের মাঝে তুলে ধরেছেন গল্পটি। তবে বলাই যায় ‘রিকশা গার্ল’ আরো অনেক ভালো সিনেমা হতে পারত।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: সিনেমালজি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

16 − one =