হাসান নীল
গল্পের শুরু কুষ্টিয়া থেকে। সবে করোনা মহামারিতে থমকে গেছে পৃথিবী। জনসমাগম বন্ধে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঘোষণা দেওয়া হয়েছে লকডাউনের। অফিস আদালত সব ছুটি। ঢাকায় বাসরত কর্মজীবীরা অজানা আতঙ্ক কাঁধে নিয়ে ছুটেছেন শিকড়ের উদ্দেশে। এই দলে ছিলেন কাজী নওশীন লায়লাও। স্বামীর চাকরি সূত্রে ঢাকায় থাকতেন। জনজীবনের স্থবির হয়ে গেলে চলে যান নিজ অঞ্চল কুষ্টিয়া। লকডাউনের ওই সময় নওশীন উদ্যোক্তা হওয়ার ভাবনা শুরু করেন। শুরুটা বেবি ফুড দিয়ে হয়েছিল।
শুরুর কিছু কথা
মায়েদের ত্যাগের সীমারেখা পাওয়া যায় না। সব মায়ের ক্ষেত্রেই গল্প একই। নওশীনের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম ছিল না। কর্মজীবন শুরু করেছিলেন শিক্ষকতার মাধ্যমে। তবে পথচলাটা দীর্ঘায়িত করতে পারেননি। এর একমাত্র কারণ সন্তান। প্রথম সন্তান সামলে পেশাটাকে এগিয়ে নিতে পারলেও দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর আর সম্ভব হয়নি। ফলে কাজ বাদ দিয়ে পুরোদস্তর মা হতে হয় তাকে। তবে ভেতরে ভেতরে হতাশায় ফুরিয়ে যাচ্ছিলেন। জীবনে কোনোকিছুই করতে পারলেন না, বিষয়টি খোঁচাচ্ছিল তাকে। এ সময় সন্তানের খাবার নিজেই তৈরি করতেন নওশীন। লকডাউনের সময় সন্তানের জন্য বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করতে হতো তাকে। সেসব করতে করতেই মনে হলো বিষয়টি বাণিজ্যিক ভাবে করা যেতে পারেন। ওই ভাবনা থেকেই ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করেন। তবে বিকল্প ভেবে রেখেছিলেন। এক মাসের খাবার তৈরির উপকরণ কিনে কাজে লেগে গেলেও মাকে বলেছিলেন ব্যবসায়ের উদ্দেশ্য পূরণ না হলে সাংসারিক কাজে ব্যবহার করা যাবে। তবে সাংসারিক কাজে ব্যবহার করতে হয়নি। ক্রেতার জন্য বানানো খাবার বিক্রি হয়ে যায়। তার প্রথম ক্রেতা ছিলেন তার স্বামীর কাজিন। তাদের শিশুর জন্য বেবি ফুড বানিয়ে দেন নওশীন। পরে পরিচিতদের আরও কয়েকজনকে এই খাবার সরবরাহ করেন তিনি। এভাবেই চেনাজানারা জেনে যায় তার কথা। আস্তে আস্তে অচেনাদের মধ্যেও ছড়াতে থাকে। এ সময় ব্যবসার জন্য ফেসবুকে পেজও খোলেন নওশীন। নাম দেন ‘খ তে খাঁটি’। প্রথম যেদিন পেজটি খুলেন সেদিন ৮৭ জন লাইক দিয়ে যুক্ত হয়েছিলেন। সংখ্যাটি এখনও মনে আছে নওশীনের। এভাবেই উদ্যোক্তা হিসেবে শুরুটা হয়েছিল তার।
কর্মজীবী মায়েদের চিন্তা দূর
কর্মজীবী মায়েদের খাবার বানানোর ঝক্কি থেকে মুক্তি দেয় এই বেবি ফুড। সন্তান ক্ষুধা অনুভব করলে যোগাড় যন্ত্র নিয়ে সময় ব্যয় করতে হয় না। নওশীনের রেডি বেবি ফুডে সব দেওয়া থাকে। শুধুমাত্র গরম করে নেওয়ার অপেক্ষা। এ কারণে কর্মজীবী মায়েরা আগ্রহী হন নওশীনের বেবি ফুডে। আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে গ্রাহক। নওশীনের বেবি ফুডের তালিকায় রয়েছে সেরেলাক, ওটস মিল, বাদাম সুজি, বাদাম গুঁড়া, আয়রন সুজি, খিচুড়ি, মিক্স রাজমা খিচুড়ি, মিক্স পিনাট বাটার, কাইহেড ওটস।
একের পর এক বাধা
শুরুর দিকে কুষ্টিয়া থাকতেন তিনি। সেখান থেকেই ঢাকায় খাবার সরবরাহ করতেন। তার এক ডেলিভারি ম্যান ছিলেন। তাকে নগদ অর্থ দিয়েছিলেন নওশীন। এরপরই লাপাত্তা হয়ে যান ডেলিভারি ম্যান। পরে আরও কয়েকবার এরকম প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। শুধু ডেলিভারি বয়জনিত সমস্যা না, আরও কিছু প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। এরমধ্যে ছিল জায়গা বদলের বিড়ম্বনা। স্বামীর চাকরি সূত্রে জায়গা বদলাতে হয় নওশীনকে। কুষ্টিয়া থাকাকালীন ব্যবসার যখন প্রসার ঘটেছে, নিজের মতো করে সাজিয়েছেন। ঠিক তখন তার স্বামীর বদলির চিঠি আসে। যেতে হবে কেরানীগঞ্জে। নতুন জায়গায় এসে বসে থাকেননি নওশীন। ফের শুরু করেন নতুন করে। তবে পরিবেশটা খুব একটা মনমতো ছিল না। পরিবারের সঙ্গে মিলছিল না। ফলে বাধ্য হয়ে সব গুটিয়ে জায়গা বদলাতে হয়। এবার বেছে নেন তিলোত্তমা নগরী। ঢাকায় এসে নতুন করে শুরু করেন নিজের ব্যবসা।
থেমে যাননি
আস্তে আস্তে গুছিয়ে নেন সবকিছু। যোগ করেন বেবি ফুডের পাশাপাশি মৌসুমী বিভিন্ন পণ্য। এরমধ্যে রয়েছে ঘি, মধু, চিয়া, বাটার, কুমড়া বড়ি, চিজ, বাদাম, জাফরান, ট্যাং, ওটস, আম, খেজুরের গুড়, আখের গুড়, সব রকমের গুঁড়া মসলা, সরিষার তেল। এই পণ্যগুলো নিজের পেজ থেকেই বিক্রি করেন নওশীন। আমের বা গুড়ের মৌসুমে পৌঁছে দেন ক্রেতাদের কাছে। এজন্য রয়েছে নিজস্ব দুইজন ডেলিভারি ম্যান। ডেলিভারি প্রতি কমিশন নেন তারা। ভরা মৌসুমে বেশ চাপ যায় তার ওপর। মাঝে মাঝে ঘর সামলে ব্যবসার সময় দিতে গিয়ে অনেক সময় হাঁপিয়ে ওঠেন নওশীন। ক্লান্তিও পেয়ে বসে।
পাশে থেকেছে পরিবার
প্রত্যেকের অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য থাকেন একজন। নওশীনেরও ব্যতিক্রম নয়। তার অনুপ্রেরণাদাতা পরিবার। চাকুরে স্বামী, সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছেলে আয়ান এবং কন্যা আনায়া তিনজনেই ভীষণ সহযোগিতা করেন। আয়ানের সরব অংশগ্রহণ লক্ষ্য করার মতো। কাজের সময় মাকে যেমন সাহায্য করে তেমনই মায়ের ব্যস্ততার সময় ছোট বোনকে আগলে রাখে। গল্প শোনায়, ছবি আঁকে, খেলে। যেন মায়ের কাজে ব্যাঘাত না ঘটে। ভাইয়ের দেখাদেখি মেয়ে আনায়াও এখন অভ্যস্ত এতে। ছোট দুই হাতে সহযোগিতা করে মাকে। নওশীন জানান, তার সন্তান দুজন আর দশটা সন্তানের মতো নয়। মাকে কাজের সময় বিরক্ত তো করেই না উল্টো সহায়তা করে। সহায়ক মনোভাবাপন্ন তার স্বামীও। ব্যবসাসংক্রান্ত মিটিং ও কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় নওশীনকে। ওই সময়টা সন্তানদের সময় দেন তার স্বামী। তাদের খাবার খাওয়ানোসহ ঝুটঝামেলা তিনিই সামলান। পাশাপাশি উৎসাহ দেন স্ত্রীকে।
ভবিষৎ লক্ষ্য
নওশীনের লক্ষ্য একটি ওয়ার হাউস করা। তিনি চান নিজের পণ্য পুরোটাই নিজের তত্ত্বাবধানে হোক। এখন পণ্য তৈরিতে মিল কারখানাসহ বিভিন্ন জায়গায় সাহায্য নিতে হয়। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের প্রতিবন্ধকতাগুলোর একটি হচ্ছে ডেলিভারি সমস্যা। কমিশনের ভিত্তিতে ডেলিভারি ম্যান নিয়োগ দেওয়া হলেও তারা সব সময় বিশ্বাসযোগ্য হয় না। মাঝে মাঝেই টাকা পয়সা নিয়ে ডেলিভারি ম্যান উধাও হয়ে যায়। এতে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন উদ্যোক্তারা। নওশীন নিজেও ভুক্তভোগী। একাধিকবার লাপাত্তা হয়েছে তার ডেলিভারি ম্যান। তিনি কষ্টটা বোঝেন। তাই এই খাত নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে তার। তিনি চান ডেলিভারি ম্যানের নিজস্ব টিম গঠন করতে। যারা বিভিন্ন উদ্যোক্তাদের পণ্য গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিতে বিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবে কাজ করবে।
খ তে খাঁটি
তবে নওশীন শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবেন না। আরও যে নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন তাদের নিয়েও চিন্তা করেন। চলার পথ যেন প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ না হয় ওই লক্ষ্য নিয়েই গড়ে তুলেছেন ‘খ তে খাঁটি’ নামে একটি ভার্চুয়াল গ্রুপ। ‘বিশুদ্ধতা ও ভালোবাসার মেল বন্ধনে চলি একসাথে, হাতে হাত রেখে’ এই সেøাগান নিয়ে পথ চলছে নারী উদ্যোক্তাদের গ্রুপ ‘খ তে খাঁটি’। যেখানে কয়েক হাজার উদ্যোক্তা সদস্য হিসেবে আছেন। এই গ্রুপটির মাধ্যমে নিজেদের পণ্যের পরিচিতির পাশাপাশি ক্রেতাও পাচ্ছেন তারা। তিন বছর ধরে গ্রুপটি দাঁড় করিয়েছেন নওশীন। বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে সেখানে কাজ করেন নারীরা। নিজের ব্যবসা দেখার পাশাপাশি এ গ্রুপটিতে দেখাশোনা করেন নিজেই। এরইমধ্যে পালন করেছেন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীও। সেখানে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যে পরিশ্রম করে যাওয়া নারীদের প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করার জন্য নিয়ে আসেন দেশের নামকরা ব্যক্তিত্বদের। যেন তাদের উৎসাহে সামনের পথটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলতে পারে উদ্যোক্তারা।
গেল বছর খ তে খাটির তৃতীয় বর্ষপূর্তি বেশ জাঁকজমক করে পালন করা হয়। এ উপলক্ষ্যে রাজধানীর বনশ্রীর একটি রেস্তোরাঁয় আয়োজন করা হয়েছিল পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের। এতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী চিত্রলেখা গুহ। ছিলেন অভিনেতা আমিন আজাদ। দুই প্রিয়মুখের অংশগ্রহণে বেশ সফলভাবে সম্পন্ন হয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
এ বিষয়ে নওশীন বলেন, শুধু নিজে ভালো থাকব সেটি চাই না। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ভালো থাকতে চাই। আমার স্বপ্ন এই গ্রুপের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নারীরা নিজের স্বপ্ন যেন বাস্তবায়ন করতে পারে। ‘খ তে খাঁটি’ যেন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি।
লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: ইন্টারপ্রেনিওর