শঙ্খ দাশগুপ্তের বড় পর্দায় অভিষেক…

শঙ্খদাস গুপ্ত সিনেমা পরিচালনায় জনপ্রিয় মুখ না হলেও, বিজ্ঞাপন পাড়ায় ব্যাপক জনপ্রিয় তিনি। সম্প্রতি তার নির্মিত ‘প্রিয় মালতী’ সিনেমা মুক্তি পাওয়ার পর আলোচনায় এসেছেন শঙ্খ দাশগুপ্ত। পরিচালনার পাশাপাশি ২০১২ সালে ‘ফিল্ম ফিচার’ নামের প্রোডাকশন হাউজ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এবারের অন্তরালে পাতায় তার কথা জানাচ্ছেন শিশির আহমেদ

শঙ্খ দাশগুপ্ত ১৯৮৫ সালে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন, তবে তার শৈশবের অধিকাংশ সময় কাটে কুমিল্লা জেলায়। ছোটবেলা থেকেই শঙ্খ দাশগুপ্ত খুব লাজুক ছিলেন, কথা কম বলতেন এবং সবসময় নিজেকে নিয়ে থাকতে ভালেবাসতেন। তবে তার ঘোরাঘুরি এবং ছবি তুলতে বেশ ভালো লাগতো। এসব নিয়েই ছিল তার পৃথিবী। ভালোলাগার কারণে তার পরিচালনায় আসা। শিক্ষাজীবনে শঙ্খ দাশগুপ্ত কুমিল্লার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করে যুক্ত হন বিনোদন জগতে।

শঙ্খ দাশগুপ্তের নির্মাণের হাতেখড়ি হয় বেশকিছু ছোট ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরি করার মাধ্যমে। এসব ডকুমেন্টারি নির্মাণের সময় তার পরিচালক হওয়ার স্বপ্ন তৈরি হয়। তবে তিনি বুঝতে পারেন যদি তার ইচ্ছে পূরণ করতে হয় তাহলে তাকে আরও অনেক কিছু শিখতে হবে। তাই তিনি ২০০৭ সালে ঢাকায় চলে আসেন। পরিচয় হয় বন্ধু আদনান আল রাজিবের সঙ্গে। তারপর আদনান আল রাজীবের সঙ্গে শুরু হয় বিজ্ঞাপন নির্মাণের যাত্রা। ক্যারিয়ারের শুরুতে কাস্টিং ডিরেক্টর, এরপর দীর্ঘদিন সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার পর বিনোদন জগতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন শঙ্খ দাশগুপ্ত। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এক যুগের বেশি সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনশ’র বেশি বিজ্ঞাপন নির্মাণ করেন তিনি। ২০১২ সালে নিজের প্রোডাকশন হাউজ থেকে ‘দেশাল’, ‘ব্র্যাক ব্যাংক’, ‘ইস্পাহানি’, ‘ম্যাগি’, ‘নেসলে’, ‘গ্রামীণফোন’, ‘রবি’, ‘বিকাশ’র মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য বিজ্ঞাপন নির্মাণ করেন তিনি। ফিল্ম ফিচারস-এর ব্যানারের নির্মিত বেশ কিছু বিজ্ঞাপন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে যায়।

শঙ্খ দাশগুপ্ত শুধুমাত্র বিজ্ঞাপন নির্মাণ করে সীমাবদ্ধ থাকেননি। নাটক-সিরিজ পরিচালনার মাধ্যমে নিজের সখ্যমতা জানান দিয়েছেন। ওটিটি প্লাটফর্ম ‘হইচই’-এ মুক্তি পায় তার নির্মিত প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘বলি’। ৭ পর্বের সিরিজটি মুক্তির পর দর্শক মহলে ব্যাপক আলোচিত এবং সমালোচিত হয়। নিজের প্রথম ওটিটির নির্মাণে কাজ করেন চঞ্চল চৌধুরী, সোহানা সাবা, সোহেল মণ্ডল, নাসির উদ্দিন খান, ইরেশ জাকের, লুতফর রহমান, সালাউদ্দীন লাভলুর মতো শক্তিমান অভিনেতাদের সঙ্গে।

শঙ্খ দাশগুপ্ত জানান, ‘বলি’ সিরিজের গল্প আইন বিহীন দ্বীপ ছেঁড়াদিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ক্ষমতাকে নিয়ে। কিংবদন্তি ফার্সি গল্প ‘রুস্তম এবং সোহরাব’-এর অনুকরণে সিরিজটি নির্মিত হয়। অপরাধ সম্রাট সোহরাব ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ নিষ্ঠুর হাতে শাসন করেন। যার ফলে দ্বীপে অরাজকতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সোহরাবের বন্দুকধারী দলের কারণে দ্বীপের জনগণ কিছু বলতে পারে না। তবে হঠাৎ স্মৃতিশক্তি হারিয়ে একদিন এই বন্য জগতে আসেন এক আহত অপরিচিত ব্যক্তি। স্থানীয় যৌনকর্মীরা তাকে সুস্থ করেন এবং তার নাম দেন রুস্তম। রুস্তম তাদের মুখে এ দ্বীপের অরাজকতার কথা শুনে সোহরাবের রাজত্ব অবসানের প্রতিজ্ঞা করেন।

শঙ্খ দাশগুপ্তের অন্যতম সেরা নির্মাণ স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘সুন্দরচাঁন’। যেটি ২০২২ সালে বঙ্গ ড্রামার ইউটিউব চ্যানেল মুক্তি পায়। ‘সুন্দরচাঁন’ ইতিমধ্যে ৪০ লক্ষের অধিক মানুষ দেখেছেন। স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমাটির গল্প একটি বানরকে নিয়ে। জুলিয়া একজন যৌনকর্মী। তিনি চান এ পেশা ছেড়ে দিতে। কিন্তু পরিস্থিতির শিকার হয়ে তিনি তা করতে পারেন না। হঠাৎ একদিন তিনি দেখেন এক বানরওয়ালা একটি বানর দিয়ে খেলা দেখাচ্ছে। জুলিয়া বানরটিকে নিয়ে যেতে চান। তবে বানরওয়ালা ব্যক্তি জানান, তিনি বানরটিকে চুরি করে এনেছেন। জুলিয়া বানরটিকে তার বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার পণ করে। নোভেরা রহমান, আরিফ খান, নাসির উদ্দীন খান প্রমুখের অসাধারণ বাস্তবসম্মত অভিনয় স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমাটিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

২০২৩ সালে বাংলাদেশি ওটিটি প্লাটফর্ম ‘চরকি’ তে মুক্তি পায় শঙ্খ দাশগুপ্ত নির্মিত সর্বশেষ ওয়েব সিরিজ ‘গুটি’। পরিচালক হিসেবে তিনি নিজের মুন্সিয়ানা দেখান এই সিরিজে। ওয়েব সিরিজের গল্প সুলতানা নামের একজন মাদক পাচারকারী এবং একজন মা’কে নিয়ে। কয়েক বছর ধরে স্থানীয় মাদক চোরাচালান নেটওয়ার্কের সঙ্গে তিনি যুক্ত। এই সময়ে সুলতানা প্রচুর অর্থ ও সম্পদ অর্জন করেছেন। কিন্তু বিনিময়ে হারাতে হয়েছে কাছের মানুষ, সম্পর্ক, বিশ্বাস এবং আশা। একদিন অজানা বিপদে পড়ে পালানোর কোনো পথ পান না তিনি। কিন্তু পালানোই হয়ে ওঠে সুলতানার একমাত্র ভবিতব্য। সিরিজটি মুক্তির পর বাংলাদেশে এবং কলকাতায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ‘ব্লেন্ডারস চয়েস-দ্য ডেইলি স্টার ওটিটি অ্যান্ড ডিজিটাল কনটেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০২৩’ এ ‘গুটি’ ওয়েব সিরিজ নির্মাণের জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে পুরস্কার পান শঙ্খ দাশগুপ্ত। সিরিজটিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন আজমেরি হক বাঁধন। সাত পর্বের এই সিরিজটিতে আরও অভিনয় করেন নাসির উদ্দীন খান, এরফান মৃধা শিবলু, শাহরিয়ার উদ্দীন জয়সহ আরও অনেকে।

শঙ্খ দাশগুপ্ত বিজ্ঞাপন নির্মাণ করার পাশাপাশি ছোট পর্দা ও ওটিটি প্লাটফর্মে কাজ করেছেন। ২০২৪ সালে নিজের নির্মাণ নিয়ে দর্শকদের সামনে হাজির হয়েছেন বড় পর্দায়। ২০ ডিসেম্বর মুক্তি পায় তার নির্মিত ‘প্রিয় মালতি’ সিনেমা। এই সিনেমার মাধ্যমে বড়পর্দায় পা রাখেন ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী। প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির আগে সিনেমাটি কায়রো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ৪৫তম আসর এবং ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়ার ৫৫তম আসরে প্রদর্শিত হয়।

সিনেমা নিয়ে জানতে চাইলে শঙ্খ দাশগুপ্ত জানান, ‘প্রিয় মালতি’ আমাদের সবার গল্প। যেখানে একটি নিম্নবিত্ত পরিবারে কথা তুলে ধরেছি। সমাজ, ধর্ম, রাজনীতির দ্বন্দ্ব এবং সমস্যার কথা বলেছি। পরিচালক আরও বলেন, আমার দর্শন, রাজনৈতিক মতবাদ, ধর্মীয় অনুভূতি এই ছবির মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। সিনেমাটিতে মেহজাবীন চৌধুরী ছাড়াও মোমেনা চৌধুরী, নাদের চৌধুরী, আজাদ আবুল কালাম, সমু চৌধুরী, শহীদুল আলম সাচ্চু, আনিসুল হক বরুণ, শাহজাহান সম্রাট, রিজভী রিজুসহ আরও অনেকে অভিনয় করেছেন।

বিজ্ঞাপন তৈরি করলেও, সিরিজ বা সিনেমা বেশি তৈরি করেন না কেন জানতে চাইলে শঙ্খ দাশগুপ্ত জানান, যেকোনো কাজ করা হয় দর্শকদের জন্য। আর দর্শক পছন্দ করলে কষ্ট সার্থক মনে হয়। তাই আমি ভেবেচিন্তে ভালো গল্প দর্শকদের দেখাতে চাই।

তিনি আরও বলেন, দেশে সিনেমা বা নাটক নির্মাণের সময় একজন পরিচালককে সব কাজ করতে হয়। যেমন অর্থ সংগ্রহ থেকে প্রোডাকশন সব কিছু। তবে একজন পরিচালকের কাজ শুধুমাত্র সিনেমার পরিচালনার দিকটা দেখা, তবে আমাদের দেশে তা হয় না। তাই আমি বিজ্ঞাপন তৈরি করতে পছন্দ করি সেখানে এই সমস্যাগুলো থাকে না। এছাড়াও বিজ্ঞাপন তৈরি করার আরেকটি কারণ ক্রমাগত কারিগরী দক্ষতা অর্জন করা যায়। চাইলে একবছর কাজ না করে সিনেমার জন্য নতুন চিত্রনাট্য লেখা যায়।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী জানতে চাইলে তিনি জানান, বেশ কিছুদিন ধরে আলোচিত বেশিরভাগ কাজই ওটিটির। মানুষ ওটিটিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। দর্শক অপেক্ষা করেন ওটিটির বিভিন্ন কনটেন্টের জন্য। আমার মনে হয়, ওটিটির ভবিষ্যৎ খুব ভালো। আমরা ক্রমাগত ভালো করছি এবং অনেক ভালো কাজ দর্শকদের উপহার দিচ্ছি। আমারও ওটিটি নিয়ে বেশ কিছু পরিকল্পনা আছে। এ বছর চরকির সঙ্গে আমার ‘মিস্ট্রি অফ লাভ’ শিরোনামের নতুন ওয়েব ফিল্ম মুক্তি পাবে। এছাড়া অন্যান্য ওটিটি প্লাটফর্মের সঙ্গে কথা হচ্ছে। নতুন কিছু এলে দর্শক দেখতে পাবেন।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: অন্তরালে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 × 2 =