শরতে মানিকগঞ্জে একদিন

নিবিড় চৌধুরী

দেলোয়ার জাহানের সঙ্গে ফেসবুকে বন্ধুত্ব থাকলেও কখনও কথা হয়নি। প্রাকৃতিক কৃষি নিয়ে তার করা কাজকর্ম দেখতাম। দেশ-বিদেশে তাকে নিয়ে করা প্রতিবেদনও একটু আধটু পড়া হয়েছে। গাছপালা ও জঙ্গলের প্রতি শখ থাকায় দেলোয়ার ভাইকে আপন লোক মনে হয়। ভাবতাম, একদিন তার সঙ্গে সাক্ষাতের আর তার প্রতিষ্ঠিত ‘প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রে’ যাওয়ার। সেই সুযোগ একদিন এসে গেল। চলে গেলাম মানিকগঞ্জে।

যাওয়ার গল্পটাও একটু ভিন্ন। দেলোয়ার জাহানের এক পরিচিত বোনের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল আগে থেকে। তার নামটিও ‘জাহান’ দিয়ে শেষ। ব্যক্তিগত ও বিশেষ কারণে, তার পুরো নাম এখানে উহ্য রাখলাম। জাহানের বেশ আসা যাওয়া আছে প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রে। একদিন তাকে জানালাম মনের কথাটা। যেতে চাই দেলোয়ার জাহানের কাছে। বিখ্যাত লেখক পাওলো কোয়েলহো তার সাড়া জাগানো ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ উপন্যাসে লিখেছিলেন, ‘মন থেকে কিছু চাইলে সেটা বিফলে যায় না’। প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রে যাওয়ার ইচ্ছে যে আমার বহুদিনের! দেরিতে হলেও সেটি ফলল। উত্তরা থেকে জাহানের সঙ্গে শরতের এক সকালে রওনা দিলাম মানিকগঞ্জে। সে ‘দেশে’ আজতক ওই একবারই গেলেও এখনও স্মৃতির তাকে সেটি বিশেষ জায়গায় আছে।

হালকা নাস্তা সেরে সকাল ৮ ঘটিকায় রওনা দিলাম আমরা। ঢাকার ব্যস্ত রাস্তার যানজট পেরিয়ে হাজির হলাম গাবতলী। এখান থেকে দেশের আনাচে কানাচে যাওয়ার জন্য ছাড়ে প্রায় সব বাস। আমার যেহেতু একদিনের যাত্রা, সঙ্গে কিছুই নিলাম না পানির বোতল ছাড়া। জাহান অবশ্য ব্যাগভর্তি কাপড় নিলেন। তিনি কিছুদিন ওখানে থাকবেন। প্রায়ই থাকেন। গাবতলী থেকে শুভযাত্রা নামে এক বাসে উঠে বসলাম। জনপ্রতি ভাড়া নিল ১২০ টাকা করে। গাড়ি ছাড়তে ছাড়তে ঘড়ির মিনিটের কাঁটা ততক্ষণে দশের ঘর পেরিয়ে গেছে। কোথাও গেলে আমি অবশ্য মোবাইল ও নেট থেকে যতদূরে থাকা যায় সেই চেষ্টাই করি। তারপরও জাহানকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘পৌঁছাতে কতক্ষণ লাগতে পারে?’ অতীত অভিজ্ঞতা থেকে তার উত্তর, ‘জ্যামে না পড়লে ঘণ্টা দুয়েকের কাছাকাছি।’ তারপরও তিনি গুগল করে দেখালেন, ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জের দূরত্ব ৫৩ কিলোমিটার। বাসে যেতে সময় লাগে ঘণ্টা দেড়েক। গুগলের সব কিছু অবশ্য সব সময় ঠিক হয় না। আমাদের পৌঁছাতে লাগল ঘণ্টা দুইয়ের বেশি। তার অবশ্য কারণ আছে। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে থামিয়ে যাত্রী উঠা-নামা করা, ঢাকা থেকে বেরোতে সময় লাগা, জ্যাম; সব মিলিয়ে ঘণ্টা দেড়েকের পথ শেষ হলো আড়াই ঘণ্টায়!

আমরা নামলাম ঘিওর উপজেলায়। মানিকগঞ্জের বেশ বিখ্যাত ও পরিচিত জায়গার একটি। এখানে শহরের হাওয়া এখনও খুব একটা লাগেনি। দুপুর বলেই রাস্তাঘাট ফাঁকা। আমরা ঘিওর বাজারে হালকা নাস্তা সেরে রিকশায় উঠে রওনা দিলাম প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রের উদ্দেশে। ঘিওর বাজার থেকে দূরে নয়। মিনিট পাঁচেক যাওয়ার পর নামলাম। তারপর চিরকালীন গ্রামীণ সেই পথ। মাটির রাস্তা বেয়ে হাঁটতে লাগলাম। সোনালি রোদ পাতায় প্রতিফলিত হচ্ছে। কিছু শিশু খেলছে রাস্তার ধারে। তাদের দেখে শৈশবের স্মৃতি মনে পড়ল। মাটির রাস্তা ধরে প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রে ঢোকার মুখে পড়ল এক ছোট গৃহস্থ বাড়ি। সামনে মেহগনি বাগান। আরেক ভিটেয় প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্র। চারপাশে সবুজ ঘিরে রেখেছে সেই কেন্দ্রে। যেন কৃষি আর সবুজই সবকিছুর প্রাণকেন্দ্র।

প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রেই বাঁশের দোতলা বাড়িতে দেলোয়ার জাহান বাস করেন স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে। দোতলার ঘরে শুধু হাওয়ার দৌড়াদৌড়ি। বাড়িতে অতিথি ও প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য রয়েছে বাঁশের ঘর। তার নিচে ঢেঁকি। এখানের সব ঘর আদিবাসীদের মাচাংয়ের মতো। রয়েছে কবুতরের খোপ। দেশি হাঁস-মুরগি। তারা ঘুরে ঘুরে খাচ্ছে। উঠানে দাঁড়ালে চোখের সামনে বিশাল সবুজ মাঠে। এখন শরত বলে চারদিকে সবুজের সমারোহ। সেই সবুজ ঘাসে সন্ধ্যায় দলবেঁধে নেমে আসে বক। জমে থাকা পানিতে মাছ খুঁজে তারা।

দেলোয়ার জাহান স্বশিক্ষিত কৃষক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমের ছাত্র ছিলেন। প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়ার পর সুযোগ পেয়েছিলেন সিঙ্গাপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর, এই কথা তার মুখ থেকে শোনা। ঢাকায় এক দৈনিকে কৃষি বিভাগেও কাজ করতেন। প্রাকৃতিক কৃষি প্রজেক্টটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে করার কথা ছিল তার। তবে সময়ের পরিক্রমায় এই প্রজেক্টে এখন তিনি ছাড়া আর কেউ নেই। কুষ্টিয়ার সন্তান হলেও মানিকগঞ্জে অল্প জায়গা কিনে শুরু করেছেন প্রাকৃতিক কৃষি। উদ্দেশ্যে রাসায়নিক সার ও ভেজালহীনভাবে নিজের খাদ্য নিজে উৎপাদন করা। সেই উৎপাদিত খাবার আসে তার মোহাম্মদপুরের আউটলেটেও। এখন তার পরনে ফতুয়া ও লুঙ্গি দেখে তাকে কে বলবে, এক সময় শার্ট প্যান্ট পরে এই যুবক শাটল ট্রেনে চড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন!

প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রে সবজি দিয়ে লাল চালের ভাত খেয়ে আমরা তিনজন বেরিয়ে পড়লাম দুপুরে। গ্রামের ভেতরে যাওয়ার রাস্তায় উঠে একটু বাঁ দিকে চোখে পড়ল বিশাল এক বটবৃক্ষ। চারদিকে ডালপালা মেলে দিয়েছে। বিশাল এক জায়গা জুড়ে আড়াইশ বছরের পুরোনো এই বটের নিচে গরমে গ্রামের মানুষ শরীর জুড়ায়। আড্ডা দেয়। বর্ষায় আশ্রয় নেয়। ফল খেতে ভিড় করে শত পাখি। মাঝেমধ্যে গ্রামীণ মেলা বসে। কেউ পূর্জা-অর্চনাও করে। বট মানে আশ্রয়। যেমন আশ্রয় হয়ে উঠেন আমাদের মাঝে মুরুব্বিদের সুশীতল মানসিকতা। সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে, বটের সঙ্গে ছবি তুলে আমরা চললাম প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রের পাশে বিল দেখতে। এখানে ধানের চাষ ছাড়াও বিভিন্ন শষ্য উৎপন্ন হয়। বিশাল এই বিলে এক সময় তামাক চাষ হতো। দেলোয়ার জাহান স্থানীয় কৃষকদের বুঝিয়ে সেটি বন্ধ করেছেন। এই কৃষকদের নিয়ে তার জীবন। নবান্নের পাশাপাশি বিভিন্ন কৃষি পার্বণ পালন করেন ঘটা করে।

শরৎকাল হওয়ায় আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা দেখা যাচ্ছিল। তার মধ্যে আমরা এক হাঁটু পানিতে চললাম শাপলা তুলতে। চারদিকে পানি থাকায় চাষ এখন বন্ধ। এক বিলে দেখলাম কয়েকটি নৌকা বাঁধা। বর্ষায় এখানে থৈ থৈ পানি ছিল। লোকজন পারাপার হয়েছে নৌকায় করে। বর্ষার আগে মানিকগঞ্জের এই ঘিওরেই বসে নৌকার মেলা। ২০০ বছরের পুরোনো নৌকার হাটে বেচাবিক্রি চলে নৌকার। পদ্মায় চলে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ। মানিকগঞ্জে এখনও গ্রামীণ ছোঁয়া পাওয়া যায়। দেখে কে বলবে এর কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে পৃথিবীর অন্যতম দূষিত শহর ঢাকা অবস্থিত? ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত মানিকগঞ্জ। ঘুরে আসতে পারবেন এক দিনের ছুটিতেই। এলে অবশ্যই সাটুরিয়ার বালিয়াটি প্রাসাদ দেখতে ভুলবেন না। এটি বালিয়াটির জমিদার বাড়ি নামেও পরিচিত। মানিকগঞ্জ সদর থেকে দূরত্ব ১৮ কিলোমিটারের মতো। এছাড়া মানিকগঞ্জে আরও বেশ কয়েকটি জমিদার বাড়ি দেখে আসতে পারেন। একটু অতীত ঘুরে এলে বুঝতে পারবেন, এই বাংলার আগের রূপ। ঘুরে আসতে পারেন পদ্মার পাড়ে গড়ে ওঠা জঙ্গলেও। স্থানীয়রা একে ডাকে ‘মিনি ফরেস্ট’ নামে। হরিনামপুর উপজেলায় এই জঙ্গল দেখতে ভিড় করে দর্শনার্থীরা। এছাড়া পদ্মার পাড়ের চর দেখে মনে হবে, চলে এসেছেন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে। মানিকগঞ্জে গেলে চেখে দেখতে ভুলবেন না ৫৮ বছরের পুরোনো নিজাম মিষ্টি। ঢাকা বিভাগের আশেপাশে বিভিন্ন জেলার মিষ্টির সুনাম রয়েছে সর্বত্র। সে হোক মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল বা মুন্সিগঞ্জ।

মাঠে ঘণ্টাখানেক ঘুরে শাপলা তুলে, ভেজা গায়ে আমরা ফের ফিরলাম প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রে। ততক্ষণে দিনের আলো কমে এসেছে। দুজন কৃষক মাঠে বীজতলা ঠিক করছে। ছাগির দুধ দোহন করছে দুজন। গবাদি পশুর জন্য ঘাস কেটে নিয়ে যাচ্ছে কেউ কেউ। এবার আমারও ফেরার পালা। জাহান থাকবেন। ওখানেই কাজ করবেন আরও কয়েকদিন নতুন শস্য রোপণের ব্যাপারে। বাস ধরার জন্য মানিকগঞ্জ বাজারে এসে অপেক্ষা করলাম কিছুক্ষণ। এরপর ফিরতি বাসে চড়ে আবার ফিরে এলাম ব্যস্ততম শহর ঢাকায়।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: কোথায় কি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + eleven =