মাসুম আওয়াল
ছোট আর বড়পর্দার নন্দিত অভিনেত্রী ও মডেল নুসরাত ইমরোজ তিশা। ভিন্নমাত্রিক নানা চরিত্রে অভিনয় করে কয়েক দশক ধরে দর্শকদের মন মাতিয়ে আসছেন তিনি। নাটক চলচ্চিত্র দুই জায়গাতেই সমান জনপ্রিয় তিশা। সাবলীল অভিনয়গুণেই তিনি তার এ অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। ২০ ফেব্রুয়ারি এই গুণী অভিনেত্রীর জন্মদিন। রঙবেরঙের পক্ষ থেকে রইলো জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।
রাজশাহীর মেয়ে
নুসরাত ইমরোজ তিশা ১৯৮২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন। রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। তিশার মা ছিলেন শিল্পমনা মানুষ। তাই ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম এক পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন তিশা। মায়ের অনুপ্রেরণায় স্কুলে পড়া অবস্থায় নানা অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন তিনি। এভাবেই একদিন সবার মন জয় করে নেন অভিনয় করে।
গান দিয়ে পথচলা শুরু
বর্তমানে নুসরাত ইমরোজ তিশাকে সবাই চেনেন একজন অভিনয় শিল্পী হিসেবে। কত ধরনের চরিত্রেই না অভিনয় করেন তিনি। অথচ এক সময় গান নিয়েই স্বপ্ন দেখতেন তিশা। রুমানা, নাফিজা, কণা এবং তিশা এই চারজন মিলে গঠন করেছিলেন ব্যান্ড দল অ্যাঞ্জেল ফোর। কিন্তু সে ব্যান্ড দলটি বেশিদূর এগোতে পারেনি। এক সময় তিশার অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়।
নতুন কুঁড়িতেই পরিচিতি
তিশা ১৯৯৫ সালে ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতায় প্রথম হন। আর এই প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়েই দর্শকের কাছে পরিচিতি পান তিনি। শিশুশিল্পী তিশার গুণে মুগ্ধ হয়েছিলেন দর্শক। এরপরই টিভি নাটকে অভিনয় জীবন শুরু হয় তার।
ছোটপর্দায় অভিষেক
১৯৯৮ সালে ‘সাত প্রহরের কাব্য’ নাটক দিয়ে টেলিভিশনের পর্দায় শিশুশিল্পী হিসেবে অভিষেক হয় তিশার। নাটকটি রচনা করেন অনন্ত হীরা আর পরিচালনা করেন আহসান হাবীব। এরপর আর তাকে পেছনের দিকে তাকাতে হয়নি। একের পর এক অনেক জনপ্রিয় নাটক দর্শকদের উপহার দিয়েছেন।
যতো আলোচিত নাটক
বর্তমানে তিশা দেশের প্রথম সারির একজন অভিনেত্রী। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অনেক জনপ্রিয় নাটক উপহার দিয়েছেন তিনি। তিশার উল্লেখযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে – নুরুল হুদা একদা ভালোবেসেছিল, অরণ্যে জ্যোৎস্না, লাইফ, পূর্ণ দৈর্ঘ্য, এলোমেলো মন, মুনিরা মফস্বলে, ঈদের টিকেট, আরমান ভাই, আরমান ভাই কয়া পারছে, আরমান ভাই ফাইস্যা গেছে, আরমান ভাই বিরাট টেনশনে, আরমান ভাই দি জেন্টেলম্যান, আরমান ভাই হানিমুনে, মিথ্যুক।
চলচ্চিত্রে
তিশা সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন। দর্শকের বেশ প্রশংসাও পেয়েছেন। ২০১৬ সালে তার অভিনীত দুটি বাণিজ্যিক সিনেমা মুক্তি পায় ‘অস্তিত্ব’ ও ‘ওয়েটিং রুম’। তিশা অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’, ‘টেলিভিশন’, ‘অস্তিত্ব’, ‘মায়াবতী’। দেশে মুক্তির অপেক্ষায় আছে তার অভিনীত ‘শনিবার বিকেল’ সিনেমাটি। ২০১৭ সালে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ডুব’ সিনেমায় একজন স্বনামধন্য পরিচালকের কন্যা চরিত্রে অভিনয় করে বেশ প্রশংসিত হন। একই বছর তিনি নদী নিয়ে সচেতনতামূলক ‘হালদা’ সিনেমায় হাসু চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা অর্জন করেন।
প্রাপ্তি
ছোট পর্দা ও বড় পর্দায় অভিনয় করে দর্শকের প্রচুর ভালোবাসা পেয়েছেন নুসরাত ইমরোজ তিশা। এছাড়া পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কারও। অস্তিত্ব সিনেমায় তিনি একজন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কিশোরীর চরিত্রে অভিনয় করেন। অনন্য মামুন পরিচালিত এ সিনেমায় তার বিপরীতে ছিলেন আরিফিন শুভ। এ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ২০১৮ সালে ৪১তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিশা। ২০১৯ সালে হালদা সিনেমার জন্যও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।
মডেলিং
২০০৩ সাল থেকে অভিনয় ও মডেলিংয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিশা। তিনি মেরিল লিপজেলের বিজ্ঞাপনে অভিনয়ের মাধ্যমে মডেল হিসেবে যাত্রা করেন। এরপর একে একে কোকা-কোলা, সিটিসেল আর কেয়া সাবানের বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেন। মোবাইল ফোন কোম্পানি রবি আজিয়াটা লিমিটেডের শুভেচ্ছাদূত হন।
পরিবার
ব্যক্তিগত জীবনে তিশা ২০১০ সালের ১৬ জুলাই টিভি ও চলচ্চিত্র পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দম্পতির ইলহাম নুসরাত ফারুকী নামে একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। বর্তমানে তিশার জীবনসঙ্গী গুণী নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রযোজক
দেশের প্রেক্ষাগৃহে ২০২৪ সালে মুক্তি পেয়েছে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর রাজনৈতিক বিদ্রুপাত্মক সিনেমা ‘৮৪০’। সিনেমাটির প্রযোজক অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা। ‘৮৪০’ নিয়ে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘৮৪০ বানানো হয়েছিল ২০২৩-এর নভেম্বর মাসে। খুব রিস্ক নিয়ে আমরা সিনেমাটা বানিয়েছি। আমি মনে করি আমরা যদি দেশকে এগিয়ে নিতে চাই, তাহলে আমাদের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে হবে। রাজনৈতিক সক্রিয়তা বাড়ানোর জন্য, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য এই সিনেমা বানানো হয়েছে।’
মুক্তির আগে সংবাদ সম্মেলনে তিশা বলেন, ‘আমার প্রযোজিত প্রথম কোনো সিনেমা বাংলাদেশে মুক্তির খবরটি খুবই ভালো লাগার। একটা মানুষের স্বপ্ন থাকে। ভালো কিছু কাজের সঙ্গে থাকতে চেয়েছি। সামনে আরও সিনেমা বানাতে চাই।’ সিনেমাটির সহপ্রযোজনায় ছিল ইমপ্রেস টেলিফিল্ম।
এর আগেও মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নির্মাণ প্রযোজনা করেছেন তিশা। তবে কোনোটিই দেশের সিনেমা হলে মুক্তি পায়নি।
সাধারণ জীবন
এক অনুষ্ঠানে এক শিক্ষার্থী নুসরাত ইমরোজ তিশাকে প্রশ্ন করেন, তিনি কীভাবে এতটা সাধারণ থাকেন? জবাবে তিশা বলেছিলেন, ‘আমি সিম্পলিসিটিতে বিশ্বাস করি। সেটা জীবনে হোক, পরিধানে হোক কিংবা জীবনযাপনে হোক। আমার জীবন অনেক সহজ। সেটাকে সহজই রাখতে চাই। কোনো জটিলতার মধ্যে ঢুকতেও চাই না। এমন কিছু বলতে চাই না, যেটাতে মানুষ কষ্ট পাবে বা এমন কিছু করতেও চাই না, যেটা দেখে মানুষ কষ্ট পাবে।’
মা
২০১০ সালে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী ও পরিচালক। বিয়ের ১২তম বছরের শুরুতেই প্রথম সন্তান ঘরে আসে তাদের। এরপর খুশির বন্যা বয়েছে তাদের সংসারে। ফারুকী সন্তানের নাম রাখেন ইলহাম নুসরাত ফারুকী। মা-বাবার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ইলহাম। তিশা বলেন, ‘ইলহাম অর্থ অনুপ্রেরণা। অনেক নাম খুঁজে বের করা হয়েছিল নামটা।’
এক সাক্ষাৎকারে তিশা বলেছিলেন, “প্রতিদিন ইলহামকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছি। ইলহামও মাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছে। এই আনন্দের সময় জীবনে বারবার আসে না। রাত জেগে কাটাচ্ছি। হয়তো আমি একটু ঘুমাচ্ছি, ওর বাবা তখন ওকে কোলে নিয়ে হাঁটছে। সেটাও মনে হচ্ছে আমাদের কাছে অনেক আনন্দের। আমার আপ্রাণ চেষ্টা ভালো মা হওয়ার। মা-বাবার দায়িত্ব পালন করা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সময়, সব মা-বাবাই এ কথা বলবে। ইলহাম আসার খবর পেয়ে বিভিন্ন মসজিদে মিলাদ হয়েছে, কোরআন খতম দেওয়া হয়েছে। সেসব আমরা জেনেছি পরে। এই ভালোবাসার ঋণ তো আসলে আমরা শোধ করতে পারব না। ঘর ভর্তি হয়ে গেছে উপহারে। প্রতিটা উপহারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের সর্বোচ্চ ভালোবাসা। আমার এখন সব পরিকল্পনা ইলহামকে ঘিরেই। এই জীবনে আমি একজনের ছেলের বউ, একজনের মেয়ে, কারো ভাবি, ফুফু, মামি, চাচি আবার অভিনয়শিল্পী, মডেল, গায়িকা; কত কত পরিচয়। কিন্তু ‘মা’ পরিচয়টাই এখন আমার কাছে শ্রেষ্ঠ।”
স্মরণীয় সিনেমা
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’ তিশার জীবনের এক অন্যরকম কাজ। এই অভিনেত্রী বলেন, “এই সিনেমা নিয়ে যদি আরও কিছু বলতে হয় তাহলে আমি ছোট্ট করে বলবো এই সিনেমাটা হচ্ছে সকল সন্তানের প্রতি তার মা বাবার অনুভূতির উপহার। ইলহামের প্রথম মিউজিক ভিডিও, একজন ডিরেক্টর ফারুকীর প্রথম অভিনয়, এই ফিল্মে অনেক কিছুই প্রথমবার ঘটেছে। আর যেকোনো প্রথম বিষয় মানুষের জীবনে অনেক স্পেশাল। তাই ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’ আমার জন্য অনেক স্পেশাল।”
শুভেচ্ছা দূত
প্রায় দুই দশক ধরে নুসরাত ইমরোজ তিশার টিভি ও সিনেমা পর্দায় দৃপ্ত পদচারণা। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের শুভেচ্ছা দূত হয়েও কাজ করেছেন তিশা। ২০২৩ সালে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের খাদ্যপণ্য ‘চপস্টিক’র শুভেচ্ছাদূত হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন। একই বছর তিনি হারপিকের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
শেষ কথা
একজন অভিনেত্রী তিশার জীবনের গল্প এই ছোট্ট পরিসরে বলা সম্ভব নয়। তার আগামীর পথচলা আরও সুন্দর হোক। শেষে আবারও জন্মদিনের শুভেচ্ছা তাকে।
লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: শুভেচ্ছা