মাহবুব আলম
আমার একজন সাংবাদিক বন্ধু আছে। ঢাকার অসংখ্য সাংবাদিকদের ভিড়ে অনন্য এক সাংবাদিক। ব্যক্তি জীবনে সুখী ও সচ্ছল ব্যক্তি। ঢাকার অভিজাত এলাকায় নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে। আছে ঢাকার অদূরে তার নিজ জেলায় জেলা সদরে বাড়ি ও মার্কেট। তা থেকে প্রতিমাসে লক্ষাধিক টাকা ভাড়া আসে। সেইসঙ্গে নিজে একটি ভারতীয় পত্রিকায় বাংলাদেশ প্রতিনিধি। এ থেকেও একটা ভালো অংকের আয় রোজগার হয়। তার ওপর তার স্ত্রীও একটা ভালো চাকরি করেন। তাই নিঃসন্দেহে বলা চলে আর্থিক অবস্থা যথেষ্ট ভালো। তারপরও প্রায়ই সার্বক্ষণিক নানা তয়-তদবির নিয়ে ব্যস্ত। ফোন করলেই বলেন, সচিবালয়ে আছি। কখনও বলেন, সচিব মহোদয়ের রুমে পরে কথা বলছি। আবার কখনও বলেন, ব্যস্ত আছি পরে কথা বলছি। এমনকি রাতে কখনও কখনও ফোন করলেও কম বেশি একই উত্তর দেন। বলেন এক সিনিয়র সচিবের বাড়িতে আড্ডা দিচ্ছি। পরে ফোন করবো। আমার বন্ধুর এই আচরণ দেখে আসছি এক দশকের বেশি সময় ধরে। এ বিষয়ে অলস সময়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন কি করব। বন্ধুবান্ধব মাঝে মাঝে দেখা-সাক্ষাৎ করতে হয়। যেতে চাই না। কিন্তু কি করব ফোন করে যেতে বলে তাই ভদ্রতা রক্ষায় যেতে হয়। কিন্তু মজার বিষয় বন্ধুর ক্লাস ব্যাচমেট ডিপ্লোমেটের বড় ভাই বা ছোট ভাই বলার সময় মোটেও খেয়াল করে না যে তার বয়স ৭০ পেরিয়ে গেছে। ৭০ পেরুনো কেউ আর যাই হোক চাকরিতে নেই। থাকার কোনো সুযোগও নেই। আসলে বিষয়টা তদবির। কখনও চাকরি তদবির কখনও বদলির তদবির কখনও ব্যবসা-বাণিজ্যের বা অন্য কোনো বিষয়ে তদবির। এজন্য বন্ধু আগেই খুঁজে বের করেন কার কোথায় কোন জেলায় বাড়ি। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কোন ব্যাচের বিশেষ ইত্যাদি।
প্রশ্ন হতে পারে যে বা যিনি সারাক্ষণ এভাবে তদবির নিয়ে ব্যস্ত তিনি সাংবাদিকতা করেন কখন? এক্ষেত্রে তার বিশেষ সুবিধা হলো ভারতের পত্রিকায় বাংলাদেশের খবর কালেভদ্রে ছাপে। তাও আবার দুর্ঘটনা দুর্বিপাকের সংবাদ। সেই সঙ্গে যদি সংখ্যালঘুদের কোনো সংবাদ থাকে তা ছাপে। এক্ষেত্রেও উন্নয়ন নয় নির্যাতনের। এছাড়া বাংলাদেশের কোনো সংবাদ ভারতের কোনো পত্রিকায় স্থান পায় না। আমাদের বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকা যেমন ভারতের খবরে ভরপুর থাকে, ভারতের পত্রিকায় এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। এমনকি বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেও সেই খবর কোনো মতে ভেতরের পাতায় গুঁজে দেয়। আমরা বাংলাদেশের পত্রিকায় ভারতের দু’চারটা খবর প্রথম পাতায় না দিলে না পেলে তার জন্য নিউজ এডিটর এডিটররা মাথার চুল ছিঁড়তে শুরু করে। ভারতের পত্রিকার ক্ষেত্রে চিত্রটা একেবারেই বিপরীত। বাংলাদেশের খবর পেলে ওদের সাংবাদিকরা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ছুড়ে ফেলে দেয়। ব্যতিক্রম সংখ্যালঘু সংবাদ। তাই বন্ধুটির খুব সুবিধা। মাসে দু-চারটা নিউজ দিলেই হয়। সেদিক দিয়ে সারা মাস সারা বছর একেবারের জন্য ফ্রি সময়। তাই তদবির বাণিজ্যের কোনো সমস্যা হয় না।
শুধু আমার ওই বন্ধু নয় সচিবালয় যেসব সাংবাদিকরা নিয়মিত যাতায়াত করেন তাদের সিংহভাগই তদবির বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। আমি একজন সম্পাদককে চিনি যিনি মাসের ৩০ দিন সচিবালয়ে অফিস করেন। একেবারে ঘড়ি ধরে দশটা থেকে পাঁচটা। অবশ্য মাঝেও অল্প সময়ের জন্য লাঞ্চ করতে অফিসে ফেরেন। অফিস সচিবালয়ের ঠিক উল্টো দিকে একেবারে কাছে। এ বিষয়ে আমি তাকে বিভিন্ন সময়ে জিজ্ঞাসা করেছি সচিবালয়ের প্রতিদিন কি করেন? উত্তর তিনি বলেন, ও আপনি বুঝবেন না। সাধারণত সচিবালয়ে কর্মকর্তা কর্মচারীরাও সারা মাস অফিস করেন না। ওরা খুব হিসাবি ক্যাজুয়াল লিভ যাতে নষ্ট না হয় তার হিসাব করেন। গুনে গুনে বিশ দিন নিয়ে নেন। এর উপর মেডিকেল লিভ বছরে দু-একবার না নিলে ওদের পেটের ভাত হজম হয় না। তার উপর স্ত্রী শ্যালিকাদের নিয়ে একাধিকবার দেশে-বিদেশে বেড়ানো তো আছেই। সে হিসেবে সচিবালয়ের সবচেয়ে বেশি দিন অফিস করা ব্যক্তিও আমার বিশেষ পরিচিত সম্পাদকের সচিবালয় অফিস করার কাছে হার মানবেন। ঝড় বৃষ্টি বাদলা কোনো কিছুই ওই সম্পাদককে সচিবালয় যাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে না। এখন প্রশ্ন কি করেন? করেন অনেক কিছু। জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ। পিয়নের তদবির থেকে মুর্শিদের পাড়ার ক্লাবের অর্থ বরাদ্দ সব কিছুই করেন। এক একটা গর্বের সঙ্গে বলেন কিছু জনসেবা না করলে হয়। এলাকার মানুষ ধরে কি করবো বলেন। এই হলো সাংবাদিকদের গত ২০ বছরের চিত্র। এর ফলে সচিবালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ব্যাহত হয় ওদের কর্মের সংস্কৃতি।
প্রশ্ন করতে পারেন সচিব বা কর্মকর্তারা এসব সাংবাদিকদের পাত্তা দেন কেন? পাত্তা দেন না, দিতে বাধ্য হন। নানান বাধ্যবাধকতা, তা ছাড়া বড় কথা নিজেদের নানান দুর্বলতা আছেই।
সে যাই হোক সম্প্রতি সচিবালয় আগুনের ঘটনায় ঐ তদবিরবাজ সাংবাদিকরা ভীষণ বিপদে পড়েছেন। কারণ আগুনের পর কতৃপক্ষ সব কার্ড বাতিল করে দিয়েছেন। বলেছেন এখন থেকে বিশেষ পাস দেওয়া হবে। তাই ভীষণ বিপাকে তদবির বার সাংবাদিকরা। এটা এখন প্রেসক্লাবে গেলেই চোখে পড়ে। ওরা অত্যন্ত মলিন মুখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাচ্ছে। এতে অবশ্য প্রেস ক্লাবে স্রেফ আড্ডা ও সময় কাটানোর জন্য আসা সাংবাদিকদের বেশ অসুবিধা হচ্ছে। কারণ ওরা অনেক সকালে এসে সব চেয়ার দখল করে রাখছে। যা আগে সব সময় ফাঁকা পড়ে থাকত। কারণ ওরা ৯:০০টার মধ্যে এসে সাশ্রয়ী নাস্তা করে দশটায় সচিবালয় ঢুকে পড়তো। সচিবালয় অবাধ যাতায়াতে বাধা পেয়ে ওরা শুধু বিস্ময়ী নয়, রীতিমতো ক্ষুব্ধ। এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সরকারের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে। অবশ্য এক্ষেত্রে ওদের বয়ান হলো সরকার স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধা সৃষ্টি করছে ইত্যাদি। ইউনিয়নবাজ সাংবাদিকরা বিবৃতি দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের স্বাধীনতা সাংবাদিকতার অভাব তথ্যপ্রভাবে সংকোচন নীতির প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
শুরুতে যা বলেছিলাম সচিবালয়ে আছি, সচিব মহোদয়ের রুমে আছি। এটা না বলে আমার বন্ধুত্ব সহজেই বলতে পারে ব্যস্ত আছি পরে কথা বলছি, একথা বলতে পারে। না তিনি এ কথা বলেন না। এরও একটা মাজেজা আছে, তাহলো নিজেকে জাহির করার। তিনি যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তা প্রমাণ করা। প্রমাণ করা অন্য কোনো সাধারণ কাজে বা বাজারে মাছ কিনতে ব্যস্ত নেই। ব্যস্ত সচিবালয় ক্ষমতা ভোগে তাও আবার সচিবদের সঙ্গে। নয়তো মন্ত্রী মহোদয়ের রুমে।
অবশ্যই এতে দোষের কিছু নেই। কারণ কমবেশি প্রত্যেক মানুষের নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ভাবে। এটাই স্বাভাবিক। এবং তাই ভাবা উচিত। কিন্তু এভাবে এর উৎকট প্রচার কতটা শোভন সেটাও ভাবার বিষয়। কেউ এ বিষয়ে ভাববেন কি না জানিনা। তবে আমি মনে করি ভাবা উচিত। এটাই একটা সুস্থ ও সভ্য সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রাথমিক পদক্ষেপ। অবশ্যই এজন্য আমাদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদা বোধসম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত।
লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: রম্য রচনা