সাজিদ সরকার: জনপ্রিয় গানের পিছনের কারিগর

সাজিদ সরকার বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রতিভাবান ও ব্যস্ত সঙ্গীত পরিচালকদের একজন। ধারাবাহিকতা বজায় রেখে একের পর এক সুরের মূর্চ্ছনায় ভাসাচ্ছেন শ্রোতাদের। বর্তমান সময়ে সমানতালে কাজ করে চলেছেন বিনোদন মাধ্যমের সকল অঙ্গনে। ‘ছুঁয়ে দিলে মন’, ‘কেন হঠাৎ তুমি এলে’, ‘ঝুম’, ‘প্রেম তুমি’, ‘বুকের বা পাশে’, এমন বেশ কিছু জনপ্রিয় গানের পেছনের মানুষ সাজিদ সরকার। তার সঙ্গীতায়োজনে অনেক গান শ্রোতামহলে ব্যাপক জনপ্রিয়। গত দশ বছরে বাংলা নাটকের গানে যে বিবর্তন এসেছে, এর অনেকখানি সম্ভব হয়েছে সাজিদ সরকারের জন্য। কেননা তিনি একের পর এক শ্রোতাপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন সঙ্গীতপ্রেমীদের। প্রশংসা কুড়িয়েছেন।  কাজের জন্য নিয়মিত স্বীকৃতি পাচ্ছেন তিনি। তার সম্পর্কে জানাচ্ছেন গোলাম মোর্শেদ সীমান্ত

ছোটবেলা থেকেই সাজিদ সরকার বেশ শান্ত প্রকৃতির ছিলেন, সব সময় বেশ চুপচাপ থাকতে পছন্দ করতেন। নতুন কিছু শেখা এবং জানার চেষ্টায় থাকতেন। ছোট থেকেই খুবই গান প্রিয় ছিলেন তিনি। একদিন চিন্তা এলো কিভাবে সাউন্ড সম্পাদনা করা হয়, কীভাবে তৈরি করা হয় গান। এসব বিষয়ে জানার জন্য শুরু করেন পড়াশোনা। এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে চলে যান গানের দুনিয়ায়।

সাজিদ সরকারের গানে হাতেখড়ি হয় ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়। হঠাৎ গানের ভূত চাপে তার মাথায়। রাত জেগে বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের গান শুনতেন তিনি। তবে ভালোভাবে গান নিয়ে লেগে পড়েন এসএসসি পরীক্ষা পরবর্তী সময়ে। ২০০৬ সালের দিকে। এসময় শখের বসে সহপাঠীদের সঙ্গে বেশ কিছু গানও তৈরি করেছিলেন তিনি। ঠিক এই সময়ই ফেসবুকের দৌলতে পরিচয় হয় জনপ্রিয় গায়ক এবং সঙ্গীত পরিচালক হাবিব ওয়াহিদের সঙ্গে। সাজিদ সরকার জানান, তাকে প্রায় সময় আমার করা মিউজিক পাঠাতাম, ফিডব্যাক শুনতাম। ২০০৮ সালের দিকে হাবিব ওয়াহিদের কাছ থেকে সহযোগী হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব পান। সাজিদ সরকারের গানের জগতে বলা যায় সেটাই টার্নিং পয়েন্ট। হাবিব ওয়াহিদের দেওয়া সেই প্রস্তাব লুফে নিয়েছিলেন সাজিদ।

সাজিদ সরকারের পরিবারের আর কেউ গানের জগতের সঙ্গে যুক্ত নেই। তিনি নিজেও আসবেন কখনো ভাবেননি। অনেকটা পরিকল্পনাহীন ভাবে এখানে চলে আসা। তারপর পরিকল্পনা মাফিক কাজ করে গিয়েছেন। তিনি জানান, সবসময় উদ্দেশ্য ছিল আমার সর্বোচ্চ দিয়ে কাজ করে যাবো। এই দীর্ঘ সময়ে নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টা করেছি, পেরেছি কি না সেটা শ্রোতারাই বলুক। ১০ বছর ধরে বেশ কিছু জনপ্রিয় গান উপহার দিতে পেরেছি, এ বিষয়টা আমাকে অনুপ্রেরণা জোগায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।

সাজিদ সরকার দীর্ঘদিন সহকারী সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। তার পরিচালনায় প্রথম অ্যালবাম ‘শিহরণ’ দিয়ে এককভাবে সঙ্গীত পরিচালনের যাত্রা শুরু করেন। ২০১১ সালে ‘কল্পনাতে রাখি তোমাকে’ শিরোনামের গান অ্যালবামটি প্রকাশিত হয়। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন পালবাশা সিদ্দিক। এই অ্যালবামের বেশ কিছু গান শ্রোতাদের মাঝে সাড়া ফেলে।

সাজিদ সরকারের নিয়মিত কাজ শুরু হয় বাংলা নাটকে সঙ্গীত করার মধ্য দিয়ে। দেশের জনপ্রিয় সব নাটক পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। ২০১৭ সালে শিহাব শাহীনের ‘মন ফড়িংয়ের গল্প’ নাটকে তাহসানের কণ্ঠে ‘মেঘের পরে’ গানটির সুর ও সঙ্গীত করেন তিনি। সাজিদ সরকার জানান, শিহাব শাহীনের সিনেমার ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ ও ‘শূন্য থেকে’ গান দুটি আমাকে আলোচনায় নিয়ে আসে। ‘কেন হঠাৎ তুমি এলে’, ‘ছুঁয়ে দিলে মন’, ‘ঝুম’, ‘প্রেম তুমি’, ‘একটাই তুমি’, ‘বুকের বাঁ পাশে’, ‘বিবিয়া’, ‘ডুবে ডুবে’, ‘কেউ কথা’ ছাড়াও ২০১৫ সালে ‘অ্যাংরি বার্ড’ টেলিফিল্মে তার সুর-সঙ্গীতে তাহসানের গাওয়া ‘প্রেম তুমি’ এখনো শ্রোতার মুখে মুখে ফেরে। ‘ব্যাচ নম্বর ২৭’ নাটকে মিনারের গাওয়া ‘দূরে হারিয়ে’ ও ‘শপথ’ এমন সব গানগুলোর মাধ্যমে সাজিদ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান।

সাজিদ সরকার ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই শতাধিক গান তৈরি করেছেন। যার মধ্যে একশর ওপর গান অডিও হিসেবে প্রকাশ হয়েছে। বাকি গানগুলো নাটক, সিনেমা, সিরিজের জন্য তৈরি করেছেন তিনি। সাজিদ সরকার জানান, বেছে বেছে কাজ না করলে গানের সংখ্যা হয়তো দ্বিগুন কিংবা আরও বেশিও হতে পারতো! তবে, নিজের কাজ নিয়ে আমি বেশ উচ্ছ্বসিত। গানে নিজের অবদান রাখতে পারাটাও অবশ্যই আমার জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন। তবে এত কাজ করেছেন, আপনার করা গান জনপ্রিয় হয়েছে কিন্তু আপনি সেভাবে প্রচারে আসেননি কেন, এমন প্রশ্নে জবাবে সাজিদ সরকার জানায়, আমি নিজেকে আড়াল রেখে কাজ করবো এরকম কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বেশিরভাগ সময়ই আমি গানের জগতে ডুবে থাকি। প্রতিনিয়ত চেষ্টা করি নতুন নতুন সুর সৃষ্টি করতে। দেখা যেত দিনের প্রায় অর্ধেকের বেশি একটি সময় আমি গান নিয়ে আছি, নতুন নতুন জিনিস রপ্ত করার চেষ্টা করতাম। মানুষকে আমার চেহারা চেনানো কখনোই আমার লক্ষ্য ছিল না, লক্ষ্য থাকতো মানুষের কাছে নিজের পরিচয় ছাপিয়ে নিজের কাজ উপহার দেওয়া। যার কারণে আমার পরিচয় সেভাবে প্রচারে আসেনি।

২০১৫ সালে শিহাব শাহীনের ‘ছুয়ে দিলে মন’ সিনেমায় কাজ করার মাধ্যমে বড় পর্দায় নিজের নাম লেখান সাজিদ। তার সুর-সঙ্গীতে তাহসান ও শাকিলা শুক্লার গাওয়া এই ছবির টাইটেল গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। প্রশংসা কুড়ায় কণা-ইমরানের ‘শূন্য থেকে আসে প্রেম’ গানটি। এই সিনেমার গানগুলো নিয়ে এখনো দর্শকমহলে আলোচনা হয়। ‘স্বপ্নবাড়ি’ সিনেমার সুর-সঙ্গীত করেছেন সাজিদ। সিনেমায় তিনটি গান রয়েছে। একটি দ্বৈত গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তাহসান ও কণা, বাকি দুটি ন্যান্সি ও ইমরান।

সাজিদ সরকার গানের পিছনের মানুষ হতে চেয়েছিলেন কেন তা জানতে চাইলে তিনি জানান, ছোট থেকেই তিনি গান প্রিয়। একদিন চিন্তা এলো গানের পেছনের দিকটা নিয়ে, কিভাবে সাউন্ড এবং অন্যান্য জিনিসগুলো সম্পাদন করা হয়। সেই চিন্তা থেকে কম্পিউটারে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকলাম। নিজের মতো করে মিউজিক করতাম। গান শুরু করার পর মানুষ আমার গান পছন্দ করতে থাকে। আমাকে প্রায় অনেকেই গান করার ব্যাপারে বলে কিন্তু এখনো আমি নিজেকে গায়ক পরিচয়ে গড়ে তুলতে প্রস্তুত না। কেউ আমার থেকে ভালো গাইলে আমি অবশ্যই গানটা তাকে দিয়েই করাবো। আপাতত গায়ক পরিচয় গড়ার পরিকল্পনা নেই।

কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সাজিদ সরকার ব্লেন্ডার’স চয়েস ওটিটি অ্যাওয়ার্ড ২০২১-এ ‘বেস্ট ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর’ ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হয়েছেন। মিজানুর রহমান আরিয়ানের ‘নেটওয়ার্কের বাইরে’ ওয়েব ফিল্মের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করেছিলেন সাজিদ। মিউজিকে অনবদ্য মুন্সিয়ানার জন্যেই পেয়েছিলেন পুরস্কার। ফিল্মটির ‘রূপকথার জগতে’ শিরোনামের গানটির মিউজিক কম্পোজিশন করার জন্য পেয়েছেন ‘বেস্ট মিউজিক কম্পোজার’ অ্যাওয়ার্ড। সম্প্রতি বেস্ট মিউজিক কম্পোজার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন ‘উনিশ ২০’ ওয়েব ফিল্মে ‘পাখি পাখি মন’ গানে কাজ করার সুবাদে। এছাড়াও কালচারাল জার্নালিস্ট ফোরাম অফ বাংলাদেশ থেকে স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি।

সাজিদ সরকারের কাছে আগামীর পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে জানান, এত পথ আসতে আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে মানুষের সমর্থন। সকলের ভালোবাসা ছাড়া এতদূর আসা সম্ভব হতো না। আশা করি এভাবেই ভবিষ্যতে সকলে কাছে টেনে নিবেন। সবাইকে আরও ভালো কাজ উপহার দিয়ে যেতে চাই। আগামীর পরিকল্পনা নিয়ে বলতে গেলে, গান ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ভবিষ্যৎ চিন্তা করছি না। এখন অনেক ভালো বাজেটের, ভালো মানের নাটক-টেলিফিল্ম এবং ওয়েব সিরিজ নির্মিত হচ্ছে। সাধারণ গানের চেয়ে নাটক-টেলিফিল্মের গান আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে গান করতে হয় গল্প ও পরিস্থিতি চিন্তা করে। গানের সঙ্গে যদি দৃশ্যায়ন মিলে যায়, তাহলে সবার কাছে তা খুব দ্রুত ছড়িয়ে যায়।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: অন্তরালে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 − 3 =