সীমান্ত খান
ধরুন আপনি শুয়ে আছেন ঘুম আসছে না, তাই অস্থিরতা কমানোর জন্য বারান্দায় গেলেন হাওয়া খেতে। সেখানে গিয়ে দেখলেন সাদা কাপড়ে জড়ানো কেউ বসে আছেন। তখন কি ভয় এসে দানা বাঁধবে না আপনার মনে? তাই রং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রংয়ে সজ্জিত যেকোনো জড় বস্তু জীবন্ত হয়ে ওঠে। তাইতো রাতে আমাদের সাদা কিছু দেখলে ভয় লাগে এবং শোক পালনে কালো রং ব্যবহার করি। রঙিন পৃথিবীতে রংয়ের খেলার যেন শেষ নেই। কিন্তু সেই রঙের খেলার মাঝে একটি রং সম্পর্কে আজ আমরা জানবো, তা হলো হলুদ।
হলুদ রংয়ের সাইকোলজি
সব রংয়ের কিছু বিশেষ অর্থ রয়েছে। হলুদ রং তার মাঝে অন্যতম। আনন্দ, উচ্ছ্বলতা, আশাবাদ, হাসি এবং শক্তি বোঝাতে হলুদ রং ব্যবহৃত হয়। হলুদ বন্ধুত্বেরও রং। তাই বন্ধুত্ব করার প্রস্তাবে অনেকে হলুদ গোলাপ দিয়ে থাকে। হলুদ রং খুব দ্রুত মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।
মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নিঃসরণের হার বৃদ্ধি পেলে মনে সুখের অনুভূতি তৈরি হয়। হলুদ রং এই হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে। যে কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত অধিকাংশ ইমোজি হলুদ রংয়ের হয়। প্রাচীন সমাজে হলুদ রংকে স্নায়ু উত্তেজক ও শরীর শুদ্ধিকারক বলে ধরা হতো। এখনও আমাদের দেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক দেশে হাত বা পায়ে ব্যথা পেলে ব্যথানাশকের প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে হলুদ ব্যবহার করা হয়। এমনকি গায়ের রং উজ্জ্বল করতে কাঁচা হলুদের ব্যাপক ব্যবহার হয়।
স্কুল বাসের রং কেন হলুদ
পৃথিবীর প্রায় সব জায়গাতেই স্কুল বাস হলুদ রংয়ের হয়। তবে কখনও কী আমাদের মাথায় এসেছে কেন সকল বাসের রং হলুদ হয়, লাল নীল সবুজ হয় না? এর পেছনে রয়েছে নিরাপত্তাজনিত বৈজ্ঞানিক কারণ। আমরা সকলেই জানি লাল রংয়ের তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি। তাই লাল রং সবচেয়ে দূর থেকে দেখা যায়। তবে এই রং বিপদ সংকেত বা ট্রাফিক লাইটের জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু লাল রংয়ের পর সব বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্য রয়েছে হলুদ রংয়ের। যার কারণে বৃষ্টি বা কুয়াশাতেও হলুদ রং শনাক্ত করা যায়। লাল রংয়ের চেয়ে হলুদ রংয়ের পেরিফেরাল দৃষ্টি দেড় গুণ বেশি। শুধুমাত্র সোজাসুজি না কোনাকুনি অবস্থান থেকেও হলুদ রং দেখতে আমাদের কোনো অসুবিধা হয় না। তাই স্কুল বাসে এই রং ব্যবহার করা হয়, যাতে রাস্তায় সেটি দূর থেকে দেখা যায়। শুধু স্কুল বাসই হলুদ নয়, বেশিরভাগ ট্যাক্সি এবং অটো, সড়ক বা বাড়ি নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত বড় বড় ক্রেন বা বুলডোজার গাড়িতেও একই কারণে হলুদ রং করা হয়।
বন্ধুত্বের প্রতীক হলুদ গোলাপ
আমরা অনেকেই লাল গোলাপ পছন্দ করি। তবে লাল গোলাপ বাদেও পৃথিবীতে অনেক রংয়ের গোলাপ ফুল রয়েছে, তার মধ্যে একটি হলুদ গোলাপ। লাল গোলাপ ভালোবাসার জন্য দেওয়া হলেও, হলুদ গোলাপ দেওয়া হয় বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে। জন্মদিনে বা দুই ভালো বন্ধুর মধ্যে ভালোবাসা উদযাপনের জন্য হলুদ গোলাপ দেওয়া হয়। হলুদ গোলাপ দিয়ে সুখ, আনন্দ বা বন্ধুত্ব উদযাপন করা হয়। হলুদ গোলাপ দিয়ে কাউকে বোঝানো যায় যে তিনি তার খুব ভালো বন্ধু। এছাড়াও সুখ, আনন্দ উদযাপনেও হলুদ গোলাপ ব্যবহার করা হয়।
দাঁতের রং হলুদ
মুখের সৌন্দর্য অনেকটা নির্ভর করে আমাদের দাঁতের ওপর। দাঁতের স্বাভাবিক রং পরিবর্তিত হলে তা অবশ্যই আমাদের বাহ্যিক সৌন্দর্যেও প্রভাব ফেলে। নিজেকে সুন্দর করে তুলে ধরতে ঝকঝকে দাঁতের মুক্তোঝরা হাসিই যথেষ্ট। তবে সত্যি হলো আমাদের দাঁতের রং হলুদ। কি অবাক হচ্ছেন? দাঁতের মূল উপাদান এনামেল যা হলুদ, তবে এই এনামেল একটি সাদা প্রলেপ দিয়ে ঢাকা থাকে যার কারণে দাঁত সাদা দেখায়। কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সেই সাদা প্রলেপ ক্ষয় হতে থাকলে দাঁত হলুদ হতে থাকে। তবে অনেকের জিনগত কারণে দাঁত অধিক সাদা কিংবা হলুদ হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে দাঁত সাদা করার চিকিৎসা রয়েছে। এক্ষেত্রে দন্ত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে স্কেলিং ও পলিশ করে দাঁতগুলো আবার ঝকঝকে করে নেওয়া যায়। এছাড়াও ওষুধজনিত কারণে দাঁতের রং পরিবর্তিত হয়ে থাকলে দাঁতে ভিনিয়ার কিংবা ক্রাউন করে দাঁত সাদা ও ঝকঝকে করা যায়।
চীনের হলুদ নদী
নদীর পানি বরাবরই সাদা হয়, কিন্তু কখনও কী আমরা নদীর পানি হলুদ হতে দেখেছি! শুনতে অবাক লাগলেও এমন একটি নদী আছে চীনে। যাকে চাইনিজ ভাষায় ‘হুয়াং হি’ নামে ডাকা হয়। নদীটির অবস্থান উত্তর চীনের কিংহাই প্রদেশে। নদীটির আয়তন প্রায় ৫,৪৬৪ কিলোমিটার যা ৯টি প্রদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। যার কারণে নদীটি চীনের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদীতে পরিণত হয়েছে। নদীটির পানি হলুদ হওয়ার কারণ এর উৎপত্তি স্থল। নদীটি কিংহাই প্রদেশের ‘বায়ান হার’ পর্বতমালার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার কারণে, পর্বতমালার হলুদ মাটি বহন করে নিয়ে যায় তাই নদীটির পানি হলুদ দেখায়। নদীটি তার বহন করা হলুদ পলি থেকে এই নাম পেয়েছে।
পুরান ঢাকার হলুদ মসজিদ
ঢাকাকে বলা হয় মসজিদের শহর। তেমন একটি মসজিদ হলো নারিন্দার শরৎ গুপ্ত রোডে ঐতিহ্যবাহী ধনু বেপারী হলুদ মসজিদ। মসজিদের রং হলুদ হওয়ার কারণেই মসজিদের এই নাম দেওয়া হয়েছে। মসজিদটির নির্মাণ প্রায় ১৭০ বছর আগে ১৮৪০ থেকে ৫০ সালের মাঝামাঝি সময়ে। সেসময় ধনু বেপারী এখানকার অধিকাংশ জমির মালিক ছিলেন। কিন্তু সেসময় কোনো মসজিদ না থাকায় তিনি এই মসজিদ নির্মাণ করেন। ধনু ব্যাপারীর ছেলেরা দীর্ঘদিন এই মসজিদ তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকলেও তাদের মৃত্যুর পর মসজিদটি কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম মসজিদটি কাঠ দ্বারা নির্মিত। মসজিদটিতে বর্তমানে দেড় থেকে দুই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করেন।
ইসলামে হলুদ রং নিষিদ্ধ
পোশাক মানুষের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। পোশাক মানুষের দেহের সুরক্ষা দিলেও এটি তার রুচি, রীতি, আদর্শ ইত্যাদি প্রকাশ করে। তাই পোশাক যে যেটাই পরুক তার একটি অর্থ থাকে। তবে ইসলাম ধর্মে হযরত মুহাম্মদ (সা.) পুরুষদের হলুদ রং পরতে নিষেধ করছেন। পোশাক পরার ব্যাপারে রসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। যেমন টাখনুর নিচে কাপড় না পরা, স্বর্ণের জিনিস না পরা ইত্যাদি। কিন্তু কেন তিনি পুরুষদের হলুদ রং পরতে নিষেধ করেছেন? হলুদ পোশাক না পরার ক্ষেত্রে অনেক হাদিস রয়েছে। তবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হাদিস হিসেবে হজরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, ‘রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার পরনে হলুদ রংয়ের দুটি বস্ত্র দেখে বললেন, এগুলো কাফেরদের বস্ত্র। অতএব তুমি এসব পরবে না’ (মুসলিম ২০৭৭)। এই হাদিসের মাধ্যমে বোঝা যায় রসুলুল্লাহ (সা.) হলুদ পোশাককে কাফেরদের বস্ত্র হিসেবে চিন্তিত করেছেন। এছাড়া এগুলো অমুসলিম সাধু-সন্ন্যাসীদের ধর্মীয় পোশাক। তাই তিনি এই রংয়ের কাপড় পরতে পুরুষদের নিষেধ করেছেন। অন্যদিকে ইমাম নববি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তার ‘আল মাজমু’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘তবে লাল ও হলুদের সঙ্গে অন্য রং মিশ্রিত থাকলে উক্ত পোষাক পরায় কোনো বাধা নেই’।
সোনা কেন হলুদ হয়
সোনার গহনা নারীর কাছে সবচেয়ে প্রিয় বস্তুগুলোর একটি। তবে এর মূল্যও অনেক। কিন্তু কখনো কী আমরা খেয়াল করেছি কেন সোনার রং হলুদ হয়, লাল বা সবুজ হয় না কেন? প্রকৃতপক্ষে সোনার প্রাকৃতিক রং হলুদ নয়, সোনার মধ্যে নীল, বেগুনি ও হলুদ রং থাকে। কিন্তু নীল ও বেগুনি রংয়ের উজ্জ্বলতা হলুদের চেয়ে কম হওয়ার কারণে আমরা হলুদ রং দেখি, নীল ও বেগুনি রং দেখি না। প্যালাডিয়াম, নিকেল, ক্যাডমিয়াম এবং দস্তা প্লাটিনাম সোনায় মিশ্রিত হয়। কিছু যোগ না করে সোনা থেকে গয়না তৈরি করা যায় না কারণ খাঁটি সোনা খুব নরম হয়।
লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: জানা অজানা