‘৮৪০’ সিনেমাটি রাজনৈতিক প্রচারণা!

বাংলাদেশে নাটক নির্মাণ করে যারা তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন তাদের মধ্যে একজন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। বাংলা নাটকের মধ্যে অন্যতম ‘৪২০’। যাকে অভিহিত কার হয় বাংলাদেশের সেরা রাজনৈতিক ব্যঙ্গ নাটক হিসেবে। এই নাটক এখনও বিনোদনপ্রেমীদের কাছে  তুমুল জনপ্রিয়। ২০০৭ সালে ফারুকী পরিচালিত ‘৪২০’ ধারাবাহিক নাটকের ডাবল আপ সিনেমা হচ্ছে ‘৮৪০’। গত ১৩ ডিসেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় সিনেমাটি। সিনেমাটিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন নাসির উদ্দিন খান, মারজুক রাসেল, আশুতোষ সুজন, ফজলুর রহমান বাবু, শাহরিয়ার নাজিম জয়, জাকিয়া বারী মম, জায়েদ খান সহ আরও অনেকে। সিনেমাটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাচ্ছেন গোলাম মোর্শেদ সীমান্ত

গল্প

সিনেমাটি মূলত রাজনৈতিক ব্যঙ্গধর্মী ঘরানার। গল্প এগিয়েছে  ফুলমনিরহাটের এক মেয়রকে নিয়ে, যার নাম ডাবলু। ভোট চুরি করা থেকে শুরু করে এমন কোনো বদ কাজ নেই যা তিনি করেন না। তিনি অবলীলায় মানুষ খুন করেন। আবার খুন হওয়া মানুষের কফিন ধরে কাঁদেন। বিস্কুট ফ্যাক্টরি দখল করেন, টেলিফোনে আড়ি পাতেন, কার কী পরিকল্পনা সেটা জেনে যান সবার আগে। ডাবলু টানা ১০ বছর ধরে ফুলমনিরহাট পৌরসভার মেয়র। প্রথমবার ১০৩ শতাংশ ভোট পেয়ে এবং দ্বিতীয়বার ৯৮ শতাংশ ভোটে বিজয়ী হন তিনি। তাই জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই তার। কিন্তু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব শুরু হয় তৃতীয়বার মেয়র নির্বাচনের সময়। নতুন এক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী তার একান্ত মুহূর্তের কিছু দৃশ্য গোপন ক্যামেরায় ধারন করে তাকে ব্ল্যাকমেইল করে। পাশাপাশি নিজের দলের লোকজনের আকস্মিক মৃত্যু হয়। একই সঙ্গে তার অনুগতদের মধ্যে বিভাজন ও শত্রুতা সৃষ্টি করতে থাকে ওই প্রতিদ্বন্দ্বী। নিজের মৃত্যুর গুজব ছড়ানো, গুলি খেয়ে আহত হওয়া কোনো কিছুতেই শেষ রক্ষা হয় না ডাবলুর, তাই জীবন বাঁচাতে নিজের তৈরি করা পাপের সাম্রাজ্য ছেড়ে দুবাই পালিয়ে যান তিনি। সিনেমাটিতে পরিচালক রাজনীতির ম্যারপ্যাচ, সমাজের অপরাজনীতি ও ক্ষমতার কূটকৌশলকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

অভিনয়

মেয়র ডাবলুর চরিত্রে দারুণ অভিনয় করেছেন নাসির উদ্দীন খান। এই প্রথম ফারুকীর কোনো ছবিতে অভিনয় করলেন তিনি। সিনেমাটিতে পুরোটা সময় দর্শকদের নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে মুগ্ধ করে রেখেছিলেন। এছাড়া শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীর চরিত্রে ফজলুর রহমান বাবু আবারও অভিনেতা হিসেবে নিজের জাত চিনিয়েছেন। মেয়রের স্ত্রীর চরিত্রে বিজরী বরকতুল্লাহ, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর চরিত্রে নাদের চৌধুরী, সোনা কাশেমের চরিত্রে শাহরিয়ার নাজিম জয়, প্রধান সাগরেদ জাকিরের চরিত্রে মারজুক রাসেল, ডিসি’র চরিত্রে জাকিয়া বারী মম এবং তার স্বামীর চরিত্রে জায়েদ খান বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। এছাড়া আশুতোষ সুজন ও মুকিত জাকারিয়াসহ বাকিরাও নিজেদের জাত চিনিয়েছেন এই ছবিতে। আলাদা করে জায়েদ খানের কথা বলতে হয়। নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার কাছ থেকেও অভিনয়টা বের করে নিয়ে আসতে পেরেছেন।

কারিগরী দিক

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বরাবরই কারিগরী দিকের পাশাপাশি চিত্রনাট্য এবং সংলাপের ওপর বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যার কারণে ‘ক্ষমতা তো নিজেই একটা বড় টনিক’, ‘ক্ষমতায় থাকলে অসুখ বিসুখ ধারে কাছে আসতে পারে না’, এমন অনেক সংলাপ শোনা যায় সিনেমায়। ক্যামেরার কাজ বেশ ভালো হয়েছে। সিনেমাটোগ্রাফার রাজিবুল ইসলাম মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। অন্যদিকে বর্তমানে চলছে সিনেমা এবং ওটিটিতে বিজিএমের জোয়ার। পরিচালক সেদিক থেকেও পিছিয়ে থাকতে চাননি। সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন পাভেল আরীন। সম্পাদনা করেন তাহসিন মাহিম। সিনেমার আবহ সঙ্গীত বেশ ভালো ছিল। তবে ‘কালার গ্রেডিং আপ টু দ্যা মার্ক’ ছিল না। ছবির শুটিং শুরু হয় ২০২৩ সালের নভেম্বরে মাসে। আর কাজ শেষ হয় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এসময় নওগাঁ, ঢাকার দিয়াবাড়ি, চট্টগ্রামের ফয়েজ লেক ও দুবাইতে সিনেমাটির শুটিং করা হয়।

ভালো দিক

‘৮৪০’ সিনেমাটি জনগণকে কিছু বার্তা দিতে চেয়েছে। সমাজে রাজনীতির দৃশ্যপটটা কেমন তা প্রকাশ পেয়েছে। বর্তমানে রাজনীতির নমুনাটি কেমন তা জানা গিয়েছে। সিনেমার পুরোটাই নাসিরউদ্দিন খান শো। শক্তিমান এই অভিনেতা যেন পুরো কন্টেন্টজুড়েই মেয়র ডাবলু হয়ে যাপন করেছেন। তার সংলাপ বলার ধরন, অভিব্যক্তি ও শরীরী ভাষা প্রতি মুহূর্তে ‘কমিক রিলিফ’ দিয়েছে। নাসিরউদ্দিন খান আগের সব চরিত্র থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলেছেন ডাবলু মেয়র চরিত্রে।

সিনেমাটি মোটেও ‘৪২০’ হতে চায়নি, স্বকীয় এবং আলাদা হতে চেয়েছে, সেটা পেরেছেও। বর্তমান সময়ের রাজনীতির ম্যারপ্যাচ, সমাজের অপরাজনীতি ও ক্ষমতার কূটকৌশলকে যেভাবে ‘৮৪০’ সিনেমায় তুলে ধরেছেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এটা নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবিদার। সিনেমাটি দেখার সময় মনে হবে পরিচালক  রাজনীতি এবং রাজনীতির পেছনে বিভিন্ন কূটকৌশলকে সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। এই ছবির সবচেয়ে ভালো দিক ব্যঙ্গ। যেমন গুলি ফোটার শব্দ শুনে ফজলুর রহমান বাবু টেবিলের নিচে যেয়ে লুকান। এরপর বাবু নিজেই জানান টেবিলের নিচে থাকার সময় একটা কবিতার লাইন মনে এসেছে। ‘গদি’ শিরোনামের এই কবিতার লাইনটা এমন, ‘ঘোড়া চড়া শেখালে যদি, নামা কেন শেখালে না?’ এদেশে ক্ষমতার ঘোড়ায় যারা চড়েন তারা নামতে চান না কিংবা সুন্দরভাবে নামাটা শিখে আসেন না। আবার একান্ত মুহূর্তের ছবি দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী একজনকে ব্ল্যাকমেইল করার পর যখন ক্ষমতা হস্তান্তর হয়ে যায়, সেই বিষয়টা বেশ ভালোভাবেই প্রকাশ পায়। সিনেমাটিতে সবচেয়ে ভালো লেগেছে ‘মরিচতত্ত্ব’। জাকিরকে সরিয়ে সোনা কাশেমকে কেন ভালোবাসতে যাচ্ছে ডাবলু? স্ত্রীর এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমার খেলা তুমি বুঝবা না। এখনই সময় বাইরে আমার সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার। জাকিরের জায়গায় সোনা কাশেমরে বসাইছি তাই জাকিরের জ্বলতাছে। এরপর সোনা কাশেমের জায়গায় রুপা কাশেম, রূপা কাশেমের জায়গায় তামা কাশেমরে বসামু। তখন আবার সোনা কাশেমের ড্যাস ড্যাস জ্বলবো। এইটা হইলো রাজনীতির মরিচতত্ত্ব!’ অসাধারণ ধারণা। ছবিতে আছে নতুন কারও আগমনে তাকে অপমান করার জন্য লুঙ্গি খোলা নীতি। আছে বিদেশে পালিয়ে যাবার পর করুণ অবস্থার মুখোমুখি হবার দৃশ্য। সিনেমাজুড়ে ব্যঙ্গ খুঁজে পাওয়া যায়। এফডিসিকেন্দ্রিক সিনেমার বলয় ভেঙে নতুন ধারার জন্ম দেওয়ার পেছনে যাদের অবদান আছে তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। বরাবরই সময়ের চেয়ে এগিয়ে তার কন্টেন্ট, ‘৮৪০’ সিনেমাও তার বাইরে নয়। বিগত সরকারের আমলেই তিনি নির্মাণ করেছেন এই কন্টেন্ট যা গত কয়েক মাসে আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর সঙ্গে বেশ প্রাসঙ্গিক।

খারাপ দিক

‘৮৪০’ সিনেমাটির ধারনা দুর্দান্ত। সংলাপ আর চিত্রনাট্যও বেশ জমজমাট। তবুও দর্শক হিসেবে সিনেমাটা তেমন উপভোগ্য হয়নি। দর্শকের মন জয় করতে ব্যর্থ সিনেমাটি। এর অন্যতম কারণ সিনেমাটি ওটিটি মাধ্যমের জন্য তৈরি করা হয়েছে। হলে দেখার সময় সিনেমার অনুভূতি পাওয়া যায়নি। কোনোভাবেই এটিকে সিনেমা বলা যাবে না। দর্শক হিসেবে এটা দেখার সময় মনে হচ্ছিল এটা একটা ওয়েব ফিল্ম। একজন দর্শক ‘৪২০’ নাটকের সিকুয়েল ভেবেই সিনেমাটা দেখতে গেছে। সিনেমা হলে যাওয়ার পর পুরো আশাহত হয়েছে। ‘৮৪০’ সিনেমা কখনওই ‘৪২০’ ধারাবাহিক নাটকের ডাবল আপ হতে পারে না। কেননা ধারাবাহিকটির মূল চরিত্র  মোশাররফ করিম ওরফে (মন্টু), লুৎফর রহমান জর্জ ওরফে (কিসলু), সোহেল খান (বিশু), কচি খন্দকার (জহির ভাই) ছাড়া সিনেমাটি অসম্পূর্ণ। মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সাধারণ একটা সিনেমা নির্মাণ করলে এই আলোচনা আসতো না। কিন্তু যখন ‘৪২০’ ধারাবাহিক নাটকের মাধ্যমে সিনেমা প্রচার করা হয় তখন এই আলোচনা চলেই আসে। এছাড়া শুধুমাত্র নাসিরউদ্দিন খান সিনেমাটির পুরোটা সময় জুড়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, তার সঙ্গে সমান তালে কেউ তেমন একটা অভিনয় করতে পারেননি, যা বেশ দৃষ্টিকটু লেগেছে পর্দায়। অনেক চরিত্র গল্প থেকে ঝরে পড়েছে চিত্রনাট্যের খামতির কারণে। সিনেমার সমাপ্তি খুবই হতাশ করেছে। মনে হয়েছে সিনেমা মুক্তির একদিন আগে একটা ‘গ্রিন স্ক্রিন’ বসিয়ে একটা দৃশ্য তৈরি করা হয়েছে। সিনেমাজুড়ে মনে হচ্ছিল এটি কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন, না কি কোনো রাজনৈতিক প্রচারণা।

লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: সিনেমালজি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

five × 1 =