মাসুম আওয়াল
চলচ্চিত্রের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় কোনো জুটিকে দর্শক পছন্দ করলে সেই জুটিকে নিয়ে একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে থাকেন নির্মাতারা। সিনেমায় জুটি হয়ে অভিনয় করতে করতে বাস্তব জীবনেও জুটি হয়ে গেছেন অনেক নায়ক নায়িকা। এমনই এক কালজয়ী জুটির নাম আজিম-সুজাতা। ঢাকাই সিনেমায় ষাটের দশকে কেবল জুটি প্রথা যখন শুরু হচ্ছে সেই সময় একসঙ্গে বড় পর্দায় হাজির হয়েছিলেন তারা। দর্শক তাদের সাদরে গ্রহণ করেছিল। অভিনয় করতে করতে এক সময় একে অপরকে ভালোবেসে ফেলেন তারা। তারপর বাস্তব জীবনের নায়ক-নায়িকা হয়ে ওঠেন তারা। এই জুটির কথা আজও ভোলেনি দর্শক।
সিনেমার জুটি প্রথা নিয়ে কথা উঠলে তাদের কথা বলতেই হবে। ভালো এপিক বাংলা সিনেমার উদাহরণ দিতে হলে এই জুটির বেশ কিছু সিনেমার নাম চলে আসে। তাদের আগেও জুটি হয়ে অভিনয় করেছেন কয়েকজন নায়ক নায়িকা। তবে ঢালিউডের প্রথম সফল জুটি তারা। আজিম-সুজাতা জুটির গল্প কী এই প্রজন্ম জানে!
জুটির সিনেমা
জুটি হিসেবে আজিম ও সুজাতার প্রথম সিনেমা ছিল ‘রূপবান’। ১৯৬৫ সালে মুক্তি পাওয়া লোককাহিনি নির্ভর ‘রূপবান’ ছিল সেসময়ের সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমা। আজিম ও সুজাতাকে বলা হয় ৬০ দশকের জুটি। তারপর বহু বছর একসঙ্গে জুটি হয়ে সিনেমায় অভিনয় করেছেন তারা দুজন। তাদের আলোচিত আরও একটি সিনেমার নাম ‘অবাঞ্ছিত’। কাজী খালেক পরিচালিত ‘মেঘ ভাঙ্গা রোদ’ (১৯৬৪) সিনেমাতেও জুটি ছিলেন আজিম-সুজাতা। এছাড়া ‘মালা’, ‘ডাকবাবু’, ‘আমির সওদাগর’, ‘ভেলুয়া সুন্দরী’, ‘মধুমালা’, ‘রাখাল বন্ধু’ প্রভৃতি সিনেমায় জুটি ছিলেন আজিম-সুজাতা।
বিয়ে
আজিম-সুজাতার চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার যখন তুঙ্গে তখনই তারা বিয়ে করেন। বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এই জুটিই প্রথম তারকা জুটি যারা ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা না করে কোনো রাখ-ঢাক না করেই ১৯৬৭ সালে বেশ ঘটা করেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তারা। তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় হোটেল শাহবাগে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। বিয়ের পরেও তাদের তারকা খ্যাতির কোনো কমতি ছিল না।
এক সুতায় গাঁথা
আজিম ও সুজাতাকে প্রথম খুব কাছাকাছি এনে দিয়ে ছিল ‘রূপবান’ সিনেমা। তাই এই সিনেমার প্রসঙ্গ আসলেই চলে আসে আজিমের প্রসঙ্গও। এক সাক্ষাৎকারে সুজাতা বলছিলেন, “আমার গর্ব হয় রূপবান নিয়ে। এই ছবির কথা এখনও মানুষ ভোলেনি। ছবিটি রচনা ও পরিচালনা করেছেন সালাউদ্দিন। এই সিনেমাটি ছিল ভাষা আন্দোলনের একটা অঙ্গ। পুর্ব পাকিস্তানে তখন উর্দু ছবি নির্মাণ হতো। উর্দু সিনেমার বাজার অনেক বড় ছিল। তখন কেউ বাংলা সিনেমা নির্মাণ করতে চাইতো না। বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন আমাদের সালাম শফিক বরকতেরা। ভাষা নিয়ে অনেক কথা হয়। কিন্তু বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্রে কারও আগ্রহ নেই। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ বলে যে ভাষার জন্য লড়াই করেছি সে ভাষা রেখে তাহলে কেন উর্দু সিনেমা নির্মাণ করছি! সালাউদ্দিন সাহেব, আমার প্রয়াত স্বামী অভিনেতা ও প্রযোজক আজিমসহ কয়েকজন মিলে আমরা এটা ভাবলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম বাংলা ভাষার সিনেমার। তারই ধারাবাহিকতায় লোকগাঁথার গল্প নিয়ে ‘রূপবান’ সিনেমাটি নির্মাণ করা হলো। বাঙালি গল্প শুনতে ভালোবাসে। রূপকথা ভালোবাসে। এখানে গল্প ছিল। রূপকথাও ছিল। সেকারণেই ছবিটা দর্শক গ্রহণ করেছে।”
সুখের সংসার
সংসার জীবনেও বেশ সুখী ছিলেন আজিম-সুজাতা। তাদের ঘর আলোকিত করে এসেছিল ছেলে ফয়সাল আজিম। বর্তমানে ঢাকার পশ্চিম রামপুরার মহানগর আবাসিক এলাকায় একটি বাড়িতে ছেলে ফয়সাল আজিম, তার স্ত্রী আর দুই নাতি ফারদিন ও আবিয়াজকে নিয়ে থাকেন সুজাতা।
ভালোবাসার মানুষকে হারানো
একুশ বছর আগেই কাছের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে হারিয়েছেন সুজাতা। তার স্বামী অভিনয়শিল্পী, পরিচালক ও প্রযোজক আজিম মারা গেছেন ২০০৩ সালে। তবে এক দিনের জন্যও তাকে ভুলে থাকতে পারেন না তিনি। কথা বলতে গেলেই বারবার উঠে আসে সেই মানুষটির গল্প। স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন সুজাতা।
লেখালেখি
অনেক দিন ধরেই লেখালেখির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন সুজাতা আজিম। বেশ কয়েকটি বইও লিখেছেন। তার লেখা একটি বইয়ের নাম ‘শিমুলির ৭১’। তার লেখা আত্মজীবনীও প্রকাশিত হয়েছে। এসব বইয়েও আজিমের কথা লিখেছেন সুজাতা। এছাড়া বিভিন্ন সময় পত্রিকাতেও লিখেছেন স্বামীকে নিয়ে। আজিমের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমে একটা বিশেষ লেখা লিখেছিলেন ‘রূপবান’খ্যাত অভিনেত্রী সুজাতা। সেখানে তিনি লিখেন, ‘আজিম একজন বরেণ্য অভিনেতা ছিলেন। তাকে হারিয়ে এই ২০ বছরে শুধু একটি কথাই বারবার মনের মধ্যে উচ্চারিত হয়, তার কি একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও প্রাপ্য নয়! মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কে রাষ্ট্র এত বছরেও স্বীকৃতি দিতে পারল না! এটা নিয়ে আমার আক্ষেপ নেই, চরম দুঃখবোধ আছে। আমার এক ছেলে ফয়সাল আজিম, পুত্রবধু, দুই নাতি; এদের নিয়ে জীবনযাপন। জানি না আমি কতদিন বাঁচবো, আমার বয়সও তো কম হলো না। তবে এই দুঃখবোধ নিয়েই কি মরতে হবে! যদি মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় পেতেন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতেন; হয়তো স্ত্রী হিসেবে শান্তিতে মরতে পারতাম। আমার সন্তান নাতিরা গর্ব নিয়ে বাঁচতে পারতো।’
‘একজন যথার্থ মানুষকে সম্মাননা না দেওয়ায় রাষ্ট্রের দায় থেকে যায়। আজিম অস্ত্র হাতে ময়দানে যুদ্ধ করেনি। তবে তিনি ছিলেন অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধ করা যোদ্ধাদের চরম সময়ের বন্ধু। জীবন বাজি রেখে নিজের সর্বস্ব দিয়ে সাহায্য করেছেন। তাই বলতেই পারি, একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। উনি মুক্তিযোদ্ধাদের কীভাবে সাহায্য করতেন কিছু উদাহরণ দেই। আমাদের ১৯৬৭ সালে বিয়ে হয়। ১৯৭১ সাল চলে আসে। সারাদেশে যুদ্ধ চলছে। শাশুড়ির কথায় আমাকে একটি গাড়ি উপহার দিয়েছিলেন। তখন গাড়িটির দাম ছিল ২৫ হাজার টাকা। এক মাস আগে কিনে দেওয়া নতুন গাড়িটি বিক্রি করে সব টাকা মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে দেন। আমাকে বলেছিলেন, সবার আগে প্রয়োজন দেশ। গাড়ি বেঁচে থাকলে কেনা যাবে। তখন তো শুটিং বন্ধ ছিল। যুদ্ধ চলছে। হাতে তো ওভাবে টাকা ছিল না। যেভাবে সম্ভব হয়েছে আজিম টাকা জোগাড় করে দিতেন। একদিন এক মুরগিওয়ালা এসেছেন। তার কাছ থেকে দুইটা মুরগি নিলো আর অনেকগুলো টাকা দিল। আমার চোখে পড়লো। বললাম, এতগুলো টাকা দিলে আর দুইটা মুরগি নিলে। উনি আমাকে ডেকে ঘরে নিয়ে গিয়ে বললো, আস্তে কথা বলো। উনি মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধারা নানা ধরনের বেশে আসতেন, আজিম ওনাদের কী সাহায্য করবেন তা জোগাড় করে রাখতেন। আমার বইয়েও এই কথাগুলো আছে।’
এক নজরে আজিম
আজিমের পুরো নাম নূরুল আজিম খালেদ রউফ। ১৯৩৭ সালের ২৩ জুলাই সিলেটের হবিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন মুন্সেফ। তাই আজিমের শৈশব-কৈশোর কাটে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। পরবর্তীতে ঢাকার হাটখোলার ভবগতী ব্যানার্জী রোডে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ২০০৩ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। আজিম অভিনীত সিনেমা ‘হারানো দিন’, ‘নতুন সুর’, ‘মেঘ ভাঙ্গা রোদ’, ‘ডাকবাবু’, ‘সাইফুল মুলক বদিউজ্জামান’, ‘সাত ভাই চম্পা’ ও ‘ভানুমতি’। তার পরিচালিত সিনেমার মধ্যে রয়েছে, ‘টাকার খেলা’, ‘প্রতিনিধি’, ‘জীবন মরণ’, ‘বদলা’, ‘গাদ্দার’, ‘দেবর ভাবী’।
এক নজরে সুজাতা
সুজাতার জন্ম ১০ আগস্ট ১৯৪৭ সালে। তার পারিবারিক নাম ছিল তন্দ্রা মজুমদার। সিনেমায় অভিনয়ে আসার পর পরিচালক সালাউদ্দিন তার নাম বদলে করে দেন সুজাতা। তিনি একই সঙ্গে চলচ্চিত্র অভিনেত্রী, চলচ্চিত্র প্রযোজক এবং পরিচালকও। সুজাতা ফোক সম্রাজ্ঞী হিসেবে খ্যাত, কারণ তার অভিনীত প্রায় তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে মধ্যে পঞ্চাশটিরও বেশি ফোক ঘরানার চলচ্চিত্র। ১৯৬৫ সালের রূপবান চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য সর্বাধিক পরিচিত তিনি। চলচ্চিত্রশিল্পে তার অবদানের জন্য ৪২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননা দেয় সরকার। শিল্পকলার চলচ্চিত্র শাখায় অবদানের জন্য তিনি ২০২১ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। সিনেমায় অভিনয়ে আসার গল্পটা জানতে চাইলে সুজাতা বলেন, “মঞ্চে আমজাদ হোসেনের ‘মায়ামৃগ’ নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে কাজ করি। নাটকটি দেখতে এসেছিলেন পরিচালক সালাউদ্দিন সাহেব। তখন তিনি ধারাপাত ছবির নায়িকা খুঁজছিলেন। আমাকে পছন্দ করেন। এরপর ছবিতে নায়িকা চরিত্রে সুযোগ দেন।” বড় পর্দায় সুজাতা প্রথম অভিনয় করেন ‘দুই দিগন্ত’ ছবিতে, নাচের দৃশ্যে। তবে প্রেক্ষাগৃহে প্রথম মুক্তি পায় ‘ধারাপাত’। সুজাতার জীবন আমূল বদলে দেয় ‘রূপবান’ সিনেমাটি।
শেষ কথা
আজিম-সুজাতা জুটির গল্প এত অল্প পরিসরে আর কতটুকুই বলা সম্ভব, তাদের কথা লিখতে গেলে একটা বই হয়ে যাবে। হয়তো কোনো সময় তাদের গল্প নিয়ে বইও লেখা হবে।
লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: জুটি