রঙবেরঙ ডেস্ক
সুমেরু অঞ্চল। বরফ-স্নিগ্ধ হিমশীতল প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকা এস্কিমো জনগোষ্ঠীর এক রহস্যময় জনপদ। জমাটবদ্ধ জলরাশি, কনকনে ঠান্ডা পরিবেশ ও বৈরী আবহাওয়ার এমন রোমাঞ্চকর স্থান পৃথিবীর রহস্যময়তাকে যেন আরও বাড়িয়ে তোলে। কল্পকাহিনীর গল্পকেও হার মানায় এখানে বসবাসরত বাসিন্দাদের জীবনধারা।
জনপদের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকা রহস্য, প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম, টিকে থাকার লড়াই ও বেঁচে থাকার এক অমোঘ যুদ্ধে লিপ্ত এস্কিমোরা। এভাবেই শতবছর ধরে তারা রচনা করছে নিজেদের বিচিত্র জীবনগাঁথা। গড়ে তুলেছে বৈচিত্র্যময় জনপদ ও অদম্য সাহসী বংশপরম্পরা।
নর্থ আলাস্কা, কানাডা ও সাইবেরিয়ার বৈরী পরিবেশে উন্নত যাতায়াতব্যবস্থা কল্পনা করাও কঠিন। যেখানে টিকে থাকাই এক জীবন্ত রহস্য, সেখানে যাতায়াতের জন্য পিচঢালা সড়কপথ যেন এক বিমূর্ত কল্পনা। তবে প্রয়োজনের তাগিদে, খাদ্যের খোঁজে কিংবা বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে পাড়ি জমানোর প্রয়োজন পড়েছে এস্কিমোদের। তারই সুবাদে একসময় তারা গড়ে তুলেছে নিজস্ব যাতায়াতব্যবস্থা। শৈল্পিক এ মানুষগুলোর বিচিত্র মেধায় সৃষ্টি করেছে এক অনন্য বাহন কুকুরের গাড়ি!
উত্তর মেরু তথা আটলান্টিক অঞ্চলের বাসিন্দাদের বলে এস্কিমো। এরাই ইগলু ঘর তৈরি করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বরফই ইগলু বাসিন্দাদের গরমে রাখে। কিন্তু কীভাবে! এর প্রধান কারণ, ইগলুতে বরফ তাপ যাওয়া-আসা করতে বাধা দেয়। এ অবস্থাকে তাপ অপরিবাহী বলে। যেসব জিনিসপত্রে বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করতে পারে না সেসব জিনিসপত্রকে বিদ্যুৎ অপরিবাহী পদার্থ বলে। বিশেষভাবে স্থাপিত বরফখণ্ড তাপ ও উষ্ণতা অপরিবাহী। তাই তাপ ভিতর-বাইরে যাতায়াত খুবই কম পরিমাণে করে। ফলে বরফখণ্ড দিয়ে তৈরি বাড়ি ইগলুর ভিতরে গরম থাকে। ইগলু বা বরফঘরের তিনটি অংশ থাকে। একেবারে উঁচুতে মানুষ থাকে আর নিচের অংশে পানি থাকে যা ঠান্ডা। আর মাঝখানে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা থাকে। ইগলুর ভিতরে পরিচলন পদ্ধতিতে (আস্তে আস্তে এগিয়ে যায়, পেছনে অন্য বাতাস এসে দখল করে) বাতাস চলাচল করে। আমরা জানি, গরম বাতাস হালকা। তাই উপরের দিকে ওঠে। আর ঠান্ডা বাতাস নিচের দিকে নামে বা শূন্যস্থানে চলে যায়। তাই মানুষ থাকা উপরের অংশ গরম থাকে। এস্কিমোরা শিকার করে। বিশেষ করে মাছ। মাছ শিকারের সময় বরফের মাঝে অস্থায়ীভাবে বাসা তৈরি করে। অস্থায়ী বাসা তৈরি করতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে এস্কিমোদের। পরিবারের জন্য মাঝারি ইগলু তৈরি করে। আর এক প্রকার হচ্ছে ছোট ছোট ইগলু দিয়ে বড় একটি ইগলু। ছোট এক ইগলু থেকে অন্য ইগলুতে যাতায়াত করার জন্য সুড়ঙ্গপথের মতো রাস্তা থাকে। কয়েকটি বড়-মাঝারি ইগলু দিয়ে একটি গ্রাম তৈরি হয়। বোঝাই যাচ্ছে, কত রকমের সমস্যা নিয়ে এখানে এস্কিমোদের বসবাস!
উত্তর মেরু যেন এক বরফের শুভ্র নির্মল চাদর। এ চাদরের নিচে বইছে শান্ত-স্নিগ্ধ সমুদ্র। যেন সাগরের বুকে ভাসমান জনপদ। সমুদ্রের তলদেশে রয়েছে বিচিত্র সব প্রাণীর বসবাস। রয়েছে সুস্বাদু সব মাছ ও নাম না জানা রূপসী সব উদ্ভিদের সমাহার। সাগরতলে তাদের ভাসমান দৃশ্যপট এক চোখধাঁধানো অপরূপ সৌন্দর্যের আধার।
সংগ্রামী মানুষদের জীবন্ত উদাহরণ এই এস্কিমোরা। বিরূপ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্য। আর তাই এমন পরিবেশে খাদ্য সংগ্রহ ও ধূর্ত পশু শিকার মোটেই সহজ কথা নয়। প্রচণ্ড ঠান্ডায় তাদের সঙ্গে অভিযোজন করে টিকে থাকা পশুদেরই শিকার করে তারা। ক্ষুধা মেটায় পশুর মাংসের সুস্বাদু ভোজনে। এসব পশুর মধ্যে রয়েছে বল্গা হরিণ, বন্য খরগোশ, মেরু ভাল্লুক, উড়ন্ত হাঁস, শিকারি পাখি ও পেঙ্গুইন। মাছের মধ্যে সিল ও তিমি মাছও বেশ পছন্দের আহার তাদের।
শিকার করা পশুর চামড়া দিয়ে এস্কিমোরা তৈরি করে একপ্রকার উষ্ণ পোশাক। এসব পোশাক তৈরিতে তারা ব্যবহার করে মেরু ভাল্লুক, বল্গা হরিণ ও শিয়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর মোটা চামড়া। এসব পোশাকের নাম ক্যারিবো ফারস। জবুথবু ঠান্ডায় একমাত্র এই পোশাকই সুরক্ষা প্রদান করে তাদের।
পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরে অবস্থান করছে এই আর্কটিক অঞ্চল। তাই প্রকৃতির খেয়ালিপনায় সেখানে সূর্য যেন অমাবস্যার চাঁদ! ফলস্বরূপ, থাকে ছয় মাস দিন, বাকি ছয় মাস রাত। অর্থাৎ উত্তর গোলার্ধে যদি একটানা রাত থাকে, তখন দক্ষিণ গোলার্ধে একটানা দিন। একটানা এই রাতকে বলা হয় পোলার নাইট বা মেরু রাত্রি। যার জন্য বছরে কেবল একবারই পুরোপুরি সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখা যায় সেখানে।
বরফের জাদুঘর
আলাস্কা। নামটা শুনলেই দিগন্তবিস্তৃত তুষার প্রান্তর, ইগলু, এস্কিমো, ছ’মাস দিন-ছ’মাস রাতের এক হিমশীতল দেশের ছবি মনে ভেসে ওঠে। আলাস্কা আমেরিকার ৫০টি রাজ্যের মধ্যে ৪৯তম। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সব আছে। তবু যেন ‘মায়াবী’ এক দুনিয়া। সুসজ্জিত আর মনকাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ। মধ্যরাতের সূর্য এবং অরোরা বোরিয়ালিস-এর ঠিকানা। গ্রিজলি ভালুক, কোডিয়াক ভালুক, সাদা ভালুক, বোল্ড ইগল, তিমি মাছ, সিল মাছ, সি ওটার, মুস, ক্যারিবুর মতো অজস্র পশুপাখির আস্তানা আলাস্কা। বিশ্বের অন্যতম বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র এবং খনিজ সম্পদে ভরপুর এই অঞ্চল। এখানেই রয়েছে উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, মাউন্ট ডেনালি (মাউন্ট ম্যাকিনলে)।
শীতকালে তীব্র ঠান্ডা এবং গ্রীষ্মে মনোরম গরমই আলাস্কার আবহাওয়ার মূল বৈশিষ্ট্য। ২০০৯-এর জুলাইয়ে ফেয়ারব্যাঙ্কসে প্রথম বার ২৪ ঘণ্টা সূর্যের আলো ছিল যা খুবই আশ্চর্যজনক। বেলা ১১টায় রোদ, আবার রাত ৩টাতেও ঝলমলে চারদিক। ঘড়ি দেখে ঘুমাতে যাওয়া, ঘুম থেকে ওঠা। শীতকালে আবার ঠিক উল্টো। তখন মাত্র ৩-৪ ঘণ্টা সূর্যের আলো। ফেয়ারব্যাঙ্কসে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রার তারতম্য দেখা যায়। এখানে শীতকালে ছিল মাইনাস ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তখন ফুটন্ত পানি শূন্যে ছুড়ে দিলে বরফ হয়ে মাটিতে পড়ে। আবার গরমের দিনে তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসও হয়। তখন শুকনা গরম আবহাওয়ায় জঙ্গলে আগুন লেগে যায়। এমনিতে মাইনাস ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ঠান্ডার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য বোঝা যায় না। কিন্তু মাইনাস ৪০ ডিগ্রি (সেলসিয়াস বা ফারেনহাইট) হলেই ঠান্ডাটা অন্য রকম হয়ে যায়। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চোখের পানি জমে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়। চোখের পাতা, ভুরু সব জমে সাদা। বেশিক্ষণ বাড়ির বাইরে থাকলে মুখের ভিতরে জিভ, গাল সব জমে আড়ষ্ট হয়ে যায়।
এখন এই বিশ্ব উষ্ণায়নের যুগে শীতকালের তীব্রতা এবং দৈর্ঘ্য দুটোই হ্রাস পেয়েছে। আগে শীতকালে দু-তিন বার তীব্র শৈত্যপ্রবাহ আসত ও টানা সাত-আট দিন মাইনাস ৪০ ডিগ্রির নিচে তাপমাত্রা থাকত। এখন শীতে হয়তো এক দিন মাইনাস ৪০ ডিগ্রির নিচে তাপমাত্রা নামে। ২০১৫-১৬ সালে তাপমাত্রা মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচেই নামেনি!
সেখানকার স্বাভাবিক তাপমাত্রাই থাকে হিমাঙ্কের ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে। যেখানে পর্যটকদের আকর্ষণে নির্মিত হয়েছে বরফের জাদুঘর। অরোরা আইস মিউজিয়াম। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বরফের স্থাপনা। প্রথমে মনে হতেই পারে, বাইরের পরিবেশের মতো বরফের জাদুঘরের ভিতরের পরিবেশও সম্ভবত প্রচণ্ড ঠান্ডা হবে। তবে জাদুঘরের ভিতরের তাপমাত্রা বাইরের চেয়েও কম। প্রযুক্তির সাহায্যে ঘরের ভিতরের তাপমাত্রা মাইনাস ২৫ ডিগ্রি পর্যন্ত রাখা হয়। এর বেশিও হয় না, আবার কমও হয় না। এখানকার সবই বরফের তৈরি। আছে বরফের ভাস্কর্যের আশ্চর্যজনক কাজ। সাজিয়ে রাখা হয়েছে বরফের তৈরি নানা কারুকার্য আর ভাস্কর্য। এখানে আগত পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হিয়ামিত করে রাখা বরফের দেবদূত, বরফের অক্টোপাস, ড্রাগন আর নানা ফুলেল নকশা। সবচেয়ে মজার হলো, সাজিয়ে রাখা চেয়ার আর সামনের টেবিলগুলো। আছে খাটপালঙ্কও। এগুলোর সবই বরফ দিয়ে তৈরি। জাদুঘরের ঠিক মাঝখানে একটা পানঘর! যেখানে অতিথিদের জন্য পানীয় পরিবেশন করা হয় বরফের তৈরি একবার ব্যবহার উপযোগী গ্লাসে। বরফ জাদুঘরের পাশেই রয়েছে আরেক বিস্ময়। হট স্প্রিং। আলাস্কার হিংস্র ঠান্ডায় লেক, নদী সব যখন জমে বরফ হয়ে যায়, তখনো এই উষ্ণ প্রস্রবণে ফুটতে থাকে পানি। উষ্ণ প্রস্রবণে গোসলের সময়টা থাকে অন্য রকম। পা থেকে কাঁধ পর্যন্ত গরম পানি। বাকি অংশ শীতে জমে যাওয়ার দশা। সময়টা তখন ২০০৪ সাল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৌশলী স্টিভ এবং হিদার ব্রাইস আলাস্কা নগরীর অদূরে এই বরফের জাদুঘরটি তৈরি করেছিলেন।
লেখাটির পিডিএফ দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: বিচিত্র