শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার দাপুটে অ্যাশেজ জয়

সিডনীর ঐতিহাসিক এসসিজিতে ২০২৫-২৬ অ্যাশেজ সিরিজের পঞ্চম টেস্ট, পাঁচ উইকেটে জয়ী হয়ে ৪-১ বিশাল ব্যাবধানে সিরিজ জিতে অ্যাশেজ ধরে রাখলো অস্ট্রেলিয়া। পার্থ, ব্রিসবেন, এডিলেড টেস্টে দাপুটে জয় অস্ট্রেলিয়াকে ৩-০ সিরিজ জয়ে এগিয়ে রেখেছিলো। এমসিজিতে দারুন ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে দুই দিনে টেস্ট জয় করে ব্যাবধান কমিয়েছিলো ইংল্যান্ড। সিডনী টেস্টে সহজ জয় সাম্প্রতিক সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করলো। চলতি আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ স্থানে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান আরো মজবুত হলোG

সিডনী টেস্টের পরিণতি নিশ্চিত হয়েছিল ইংল্যান্ডের দুর্বল বোলিং এবং ফিল্ডিংয়ের কারণে যখন ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসের ৩৮৪ রানের জবাবে ৫৬৭ রান করে অস্ট্রেলিয়া বিশাল ১৮৩ রানে এগিয়ে যায়। দ্বিতীয় ইনিংসে তরুণ জ্যাকব বেথেলের বীরোচিত শতরানের  (১৫৪ ) সুবাদে ৩৪২ রান করে অস্ট্রেলিয়াকে ১৬০ জয়ের টার্গেট দেয়।  এসসিজিতে স্পোর্টিং উইকেটে শেষ দিনে ভালো বোলিং করে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করার সামর্থ বর্তমান ইংল্যান্ড দলের নাই। অস্ট্রেলিয়া কিছুটা চাপে পড়লেও  টার্গেট সীমিত থাকায় এবং শক্তিশালী ব্যাটিং গভীতার কারণে ১৬১/৫ রান করে টেস্ট ৫ উইকেটে জিতে নেয়।

এবারের অ্যাশেজ সিরিজে কাঙ্ক্ষিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। তিনটি টেস্ট ২ দিনে শেষ হয়েছে। ইংল্যান্ড আক্রমণের দুই অস্ত্র মার্ক উড এবং জোফরা আর্চার আহত থাকায় সিরিজে ভূমিকা রাখতে পারেনি। অপরদিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম চয়েস বোলার্স জস হেজেলউড। পাট কামিন্স এবং নাথান লায়ন্সের ভূমিকা ছাড়াই দুর্দান্ত মিচেল স্টার্কের সঙ্গে স্কট বোলান্ড, মাইকেল নেসার উজ্জ্বল ভূমিকা রেখে ইংল্যান্ডকে কোনঠাসা করে রাখে। ইংল্যান্ডের ফিল্ডিং ছিল সাধারণ মানের।

এই সিরিজে হয়ত শেষ বারের মতো অস্ট্রেলিয়ায় অ্যাশেজ খেললো জো রুট, বেন স্টোকস। বর্ষীয়ান খেলোয়াড় সমৃদ্ধ অস্ট্রেলিয়ান দলেও হয়ত শুরু হবে ট্রানজিশন। উসমান খাজা অবসর নিয়েছে। স্টার্ক, কামিন্স, হেজেলউড, লায়ন, স্মিথের এখন গোধূলী বেলা। এই সিরিজে সবচেয়ে উজ্জ্বল ভূমিকা ছিল ট্রাভিস হেড এবং মিচেল স্টার্কের। তরুণ বিউ ওয়েবস্টার এবং ওয়েদারল্যান্ডের মধ্যে সম্ভাবনা আছে।

তবে ভারত, শ্রীলংকায় টেস্ট খেলতে হলে অস্ট্রেলিয়ার স্কোয়াড নিয়ে ভাবতে হবে। অপরদিকে ইংল্যান্ডের হয়ে রুট, স্টোকস ছাড়া আর কারো বিশ্বমানের মনে হয়নি। ক্রলি, ডাকেট, পপ ধারাবাহিক ছিল না। তরুণ বেথেলের মাঝে সম্ভাবনা দেখা গেছে। সবচেয়ে ভাবনার বিষয় বোলিং। আর্চার, উডের অনুপস্থিতিতে সাদামাটা মনে হয়েছে ইংল্যান্ড বোলিং।

সিডনী টেস্ট উইকেট ছিল এবারের সিরিজে সবচেয়ে স্পোর্টিং। বোলার ব্যাটসম্যানদের জন্য সুষম সহায়তা ছিল। সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেও ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসে ৩৮৪ রানের বেশি করতে না পারায় সুযোগ হারিয়েছে। এই ইনিংসে ইংলিশ কিংবদন্তি জো রুট নিজের ৪১তম শত রান ১৬০ করে শত রান এবং মোট রান শীর্ষ স্থানে পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে ট্রাভিস হেড ১৬৩, স্টিভ স্মিথ ১৩৮, বিউ ওয়েবস্টার পরাজিত ৭১ রান করে প্রথম ইনিংসে ম্যাচ নির্ধারক ১৮৩ লিড পেয়েছে অস্ট্রেলিয়া।দ্বিতীয় ইনিংসে তরুণ বেথেলের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরী ১৫৪ রান দলকে বিড়ম্বনা থেকে রক্ষা করলেও ম্যাচ জয়ের মতো পুঁজি দিতে পারেনি।

শেষ দিনের ক্ষয়িষ্ণু উইকেটে ইংলিশ বোলাররা চাপ সৃষ্টি  করেছিল। টার্গেট ২০০র বেশি হলে লড়াইটা জমতো হয়তো। ক্ষয়িষ্ণু উইকেটে ইংল্যান্ড বোলার্স, ফিল্ডার্সরা লড়াই করে। কিন্তু  পর্যাপ্ত সময় থাকায় এবং অস্ট্রেলিয়ান বাটিংয়ে  গভীরতা থাকায় তা কাজে লাগেনি। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং সকল ক্ষেত্রেই শ্রেয়তর দল অস্ট্রেলিয়া যোগ্য দল হিসাবেই দাপুটে জয় পেয়েছে। তবে মূল পার্থক্য এনে দিয়েছে ট্রাভিস হেড এবং মিচেল স্টার্কের মত ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার এবং অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বমানের ফিল্ডিং।

অ্যাশেজ টেস্ট সিরিজ। পঞ্চম টেস্ট, সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড

সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড

ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংস ৩৮৪  অল আউট (জো রুট ১৬০, হ্যারি ব্রুক ৮৪, জেমি স্মিথ ৪৬, মাইকেল নেসার ৪/৬০। স্কট বোলান্ড ২/৮৫. মিচেল স্টার্ক ২/৯৩)

ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংস ৩৪২ অল আউট (জ্যাকব বেথেল ১৫৪, বেন ডাকেট ৪২, হ্যারি ব্রুক ৪২, বিউ ওয়েবস্টার ৩/৬৪, মিচেল স্টার্ক ৩/৭২)

অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস ৫৬৭ অল আউট  (ট্রাভিস হেড ১৬৩, স্টিভ স্মিথ ১৩৮, বিউ ওয়েবস্টার ৭১*, ক্যামেরুন গ্রিন ৩৭, মার্নাস লেবুচাঙ ৪৮, ব্রাইডন কেস ৩/১৩০,  জোস্ টং ৩/ ৯৭, বেন স্টোকস ২/৯৫)

অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংস  ১৬১/৫  (মার্নাস লেবুচাঙ ৩৭, জ্যাক ওয়েদারাল্ড ৩৪, ট্রাভিস হেড ২৯, ক্যামেরুন গ্রীন ২২*, জস টং ৩/৪২)

অস্ট্রেলিয়া ৫ উইকেটে জয়ী

অস্ট্রেলিয়া ৪-১ এশেজ সিরিজ জয়ী

পরিশেষে উসমান খাজাকে নিয়ে কিছু লিখছি। পাকিস্তানে জন্ম নিয়ে সিডনীতে স্থায়ী হওয়া প্রতিভাবান অশ্বেতাঙ্গ খেলোয়াড় খাজা প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে সংগ্রাম করে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৮৮ টেস্ট খেলে বিদায় নিলো। অস্ট্রেলিয়া কিন্তু ডেভিড ওয়ার্নার অবসর নেওয়ার পর থেকেই টেস্ট ক্রিকেটে ওপেনার সংকটে ভুগছে। এই সংকটে হেড-ওয়েদারাল্ড সাময়িক সমাধান হলেও এশিয়ায় টেস্ট খেলতে খাজার অভাব অনুভব করবে। বিশেষ করে লাবুচ্যাং, স্মিথের এখন গোধূলি বেলা, ক্যামেরুন গ্রীন ধারাবাহিক নয়। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে কিছুটা বর্ণবৈষম্য আছে। সেটি কাছে থেকে অনুভব করি। ভালো লাগতো যদি আজ টেস্ট জয়ের সময় উসমান খাজা উইকেটে থাকত। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে একজন সফল ব্যাটসম্যান হিসাবে খাজা স্মরণীয় থাকবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

16 + twelve =