চুক্তি ভঙ্গ করে জরিমানা আদায়ে নেওয়া বিপিডিবির সিদ্ধান্ত উস্কানীমূলক: বিপপা

চুক্তিমত পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিপিডিবি বেসরকারি বিদু্ৎ কেন্দ্র থেকে চাহিদামতো বিদু্ৎ সরবরাহ পাওয়ার অধিকার হারাবে। অন্যদিকে চুক্তিবদ্ধ বিদু্ৎ কেন্দ্রেরও বিপিডিবিকে বিদু্ৎ সরবরাহ দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধ্যকতা থাকবে না। বিদু্ৎ ক্রয় চুক্তির এই বিষয়টি জেনেও বিপিডিবি গত ৫ ফেব্রুয়ারি দেশীয় বেসরকারি বিদু্ৎকেন্দ্রগুলোকে বকেয়া পরিশোধ করা ছাড়াই চাহিদামতো বিদু্ৎ সরবরাহে ব্যর্থতার জন্য জরিমানা আদায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। দেশীয় বেসরকারি বিদু্ৎকেন্দ্রের জন্য এই নীতি অনুসরণ করা হলেও বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিদু্ৎকেন্দ্রকে ছাড়া দেওয়া হচ্ছে। নিবার্চনের কয়েকদিন আগে বিপিডিবির নেওয়া এই ধরনের সিদ্ধান্তকে উস্কানীমূলক মনে করছেন বিপপা নেতারা।

রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিদু্ৎ ক্রয় চুক্তির এই ধারা তুলে ধরে উপরের দাবি জানান বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের(বিপপা) সাবেক চেয়ারম্যান ইমরান করিম। তিনি জানান, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ৪৪ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওনা বকেয়া বর্তমানে ১৪ হাজার কোটি টাকা। কোম্পানি ভেদে ৮ থেকে ১০ মাস পর্যন্ত বিল বকেয়া পড়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে ডেভিড হাসনাত জানান, বকেয়ার কমপক্ষে ৬০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করা না হলে আসন্ন রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম মওসুমে তারা চাহিদামতো বিদু্ৎ সরবরাহ দিতে পারবে না।

তিনি মনে করেন, বকেয়া পরিশোধ না করা এবং চুক্তিভঙ্গ করে জরিমানা (এলডি) আদায়ের সিদ্ধান্ত দেশীয় উদ্যোক্তাদের নির্বাচিত সরকারের মুখোমুখী দাঁড় করনোর একটি অপকৌশল হয়ে থাকতে পারে।

ডেভিড বলেন, আমরা চুক্তিমতো বিদু্ৎ সরবরাহ করতে চাই, কিন্তু বকেয়ার কারণে আমাদের তেল আমদানি করে বিদু্ৎ উৎপাদনের কোনো সক্ষমতা নেই।

বর্তমানে দেশে পাবিলক ও প্রাইভেট সেক্টরের বিদু্ৎকেন্দ্রগুলোর মোট বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। বকেয়া পরিশোধে অর্থমন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে দ্রুততার সাথে সাবসিডির অর্থ ছাড় দেওয়ার অনুরোধ করেও তা পাওয়া যায়নি বলে বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে।

ইমরান করিম বলেন, বিল প্রদানে বিলম্ব, ডলারের দাম বৃদ্ধি, ব্যাংক সুদের কারণে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। বকেয়ার ফলে জ্বালানি আমদানির বিল প্রদান করা কঠিন হচ্ছে। এই সংকটের কারণেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, একটি বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে কেমন আচরণ করে, আর আমাদের সঙ্গে ভিন্ন রকম আচরণ করা হচ্ছে। অথচ চুক্তির শর্ত হুবহু একই। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিল দিতে না পারলে বিপিডিবির বিদ্যুৎ চাওয়ার অধিকার রোহিত হবে। যখন উৎপাদন সীমিত করা হয়েছে, তখন এলডি (জরিমানা) কর্তন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, একই রকম পরিস্থিতিতে চীনা প্রতিষ্ঠান বরিশাল পাওয়ার কোম্পানির ২৭০ কোটি জরিমানা করা হয়। পরে সেই টাকা সঠিক যাচাইয়ের মাধ্যমে ফেরৎ দেওয়া হয়েছে। অথচ আমাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, নিজের মাঠে অফ ফিল্ড, কবে আমাদের জন্য ফিল্ড তৈরি হবে। বিদেশি কোম্পানির বিল ৩/৪ মাসের বেশি বকেয়া রাখা হয় না। আমাদের ৮ থেকে ১০ মাসের বকেয়া। অনেক বিদ্যুৎ কোম্পানি রয়েছে যারা ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। তেল, খুচরা যন্ত্রপাতি ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। এটা বিদেশি কোম্পানিরা ফলো করে না, তারা কি এমন পরিস্থিতি দেখেও বিনিয়োগ করতে আসতে চাইবে!

বিরোধটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে বিইআরসিতে যাই। বিইআরসি বিপিডিবির সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দিলে তারা কোনোরকম স্পেস দেয়নি।

ইমরান করিম আক্ষেপ করে বলেন, চীনা কোম্পানির জন্য চীন দূতাবাস চিঠি দিয়েছে। আমার জন্য কে দেবে। এ কারণে মনে হয় নিজের দেশের পাসপোর্ট রেখে বিদেশি পাসপোর্ট নেই। যাতে অন্তত আমার পক্ষে দাঁড়াবার জন্য কোনো দূতাবাস থাকে।

বিপপার প্রেসিডেন্ট ডেভিট হাসনাত বলেন, কমপক্ষে ৬০ শতাংশ বকেয়া না পেলে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে নেওয়া কঠিন। আমার মনে হচ্ছে ইচ্ছা করে নতুন সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলছে সবকিছু সুন্দর করেছে। তাহলে বিদ্যুৎ খাতে এতো বকেয়া থাকবে কেন! আমার মনে হয় ইচ্ছে করেই বিল প্রদান বন্ধ করা হয়েছে।

আপনারা আদালতে যাবেন কিনা এমন প্রশ্নে জবাবে ডেভিড হাসনাত বলেন, আমরা বিইআরসিতে গিয়েছিলাম। তারা আমাদের আবেদন খারিজ করে দিয়ে বিপিডিবির সাথে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পরামর্শ দেয়। কিন্ত বিপিডিবি আমাদের কথা বলার কোনো সুযোগ দেয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে আদালতে যাওয়া হবে কিনা তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিজয়ী দল বা জোট সরকার গঠনের পর তাদের সাথে কথা বলার সুযোগ তৈরি হবে।

ক্যাপাসিটি পেমেন্ট সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার মনে হয় জ্বালানি উপদেষ্টার কাছে এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়া উচিৎ। তিনি তার বইতে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। কেন ক্যাপাসিটি পেমেন্ট প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 − ten =