
আজকের বাংলাদেশ উন্নয়নের দৃশ্যমান গল্পে ভরপুর—উচ্চ প্রবৃদ্ধি, মেগা অবকাঠামো, দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তর। পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, গত এক দশকে দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে, বিদ্যুৎ সুবিধার বিস্তার ঘটেছে এবং মোবাইল আর্থিক সেবার সম্প্রসারণ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। উপরিভাগে সবকিছুই যেন একটি সফল উন্নয়ন মডেলের প্রতিচ্ছবি।=
কিন্তু এই উজ্জ্বল অগ্রগতির নিচেই নীরবে জমাট বাঁধছে এক জটিল বাস্তবতা—একটি বিস্তৃত, সংগঠিত এবং ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা ছায়া অর্থনীতি। চাঁদাবাজি, বাজার সিন্ডিকেট, হুন্ডি, সীমান্তপাচার এবং ঘুষ—এই পাঁচটি উপাদান এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং পরস্পর সংযুক্ত একটি অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, যা রাষ্ট্রের রাজস্ব কাঠামো, বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা এবং আইনের শাসন—সবকিছুকেই নীরবে ক্ষয় করছে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন—অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি না এলে দৃশ্যমান প্রবৃদ্ধির স্থায়িত্ব ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কারণ ছায়া অর্থনীতি সব সময় বৈধ অর্থনীতির ভেতর থেকেই শক্তি আহরণ করে এবং ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করে।
বাজারের ভেতরের অদৃশ্য হাত
বাজারের দিকে তাকালেই সমস্যার প্রথম লক্ষণ স্পষ্ট হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য ওঠানামা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। বিভিন্ন ভোক্তা পর্যবেক্ষণ ও বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে—অনেক ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও খুচরা বাজারে মূল্য বৃদ্ধি ২০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
এ প্রবণতাকে পুরোপুরি বৈশ্বিক বাজার অস্থিরতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া কঠিন।
বাস্তবতা হলো, যখন—
- আমদানি সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়
- গুদামজাত তথ্য অস্বচ্ছ থাকে
- পাইকারি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে ছোট গোষ্ঠী
তখন বাজার প্রতিযোগিতামূলক থাকে না; এটি কার্যত নিয়ন্ত্রিত বাজারে পরিণত হয়। এর সঙ্গে পরিবহন থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত চাঁদাবাজির অঘোষিত ব্যয় যুক্ত হলে মূল্যবিকৃতি আরও তীব্র হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই অস্বাভাবিকতাই ধীরে ধীরে “নতুন স্বাভাবিক” হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
হুন্ডি: বৈদেশিক মুদ্রার নীরব রক্তক্ষরণ
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি প্রবাসী আয়। কিন্তু এই শক্তির একটি অংশ এখনও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ঘুরপাক খায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষণে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে নির্দিষ্ট সময়গুলোতে সম্ভাব্য রেমিট্যান্সের ১৫–২৫ শতাংশ পর্যন্ত হুন্ডি চ্যানেলে প্রবাহিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এর প্রভাব বহুস্তরীয়—
- বৈদেশিক মুদ্রার আনুষ্ঠানিক প্রবাহ কমে
- মুদ্রানীতির কার্যকারিতা দুর্বল হয়
- আর্থিক লেনদেনের ট্রেসযোগ্যতা কমে
- অর্থপাচারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়
হুন্ডি টিকে থাকে মূলত তিন কারণে: গতি, সহজতা এবং ব্যবহারকারীর কাছে তুলনামূলক আর্থিক সুবিধার ধারণা। অর্থাৎ এটি কেবল আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা নয়; এটি বৈধ আর্থিক ব্যবস্থার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতারও প্রশ্ন।
সীমান্তপাচার: ভূগোলের ফাঁক গলে অর্থনীতি
দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য জব্দ হওয়ার ঘটনা ইঙ্গিত দেয়—পাচার একটি সুসংগঠিত সরবরাহ চেইনে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষণে সাধারণত তিনটি কাঠামোগত কারণ সামনে আসে:
- সীমান্ত অঞ্চলে বিকল্প আয়ের সীমাবদ্ধতা
- স্থানীয় দালাল ও পরিবহন নেটওয়ার্কের সক্রিয়তা
- প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ঘাটতি
এই ভিত্তিগত কারণগুলো অক্ষুণ্ণ থাকলে বিচ্ছিন্ন অভিযান সমস্যার গভীরে পৌঁছাতে পারে না।
ঘুষ: পুরো ব্যবস্থার অদৃশ্য ঢাল
ছায়া অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী সুরক্ষা বলয় হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। আন্তর্জাতিক দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
বাস্তবতা কঠিন কিন্তু স্পষ্ট:
নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভেতরেই ফাঁক থাকলে—
- সিন্ডিকেট ভাঙা কঠিন হয়
- পাচার ঝুঁকি অপরাধীদের কাছে কমে যায়
- অবৈধ নেটওয়ার্ক নিজেদের নিরাপদ মনে করে
এর দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দেয় পুরো অর্থনীতি, বিশেষ করে বিনিয়োগ পরিবেশ। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রধান প্রশ্নই থাকে—নিয়ম কি বাস্তবে কার্যকর?
কেন বর্তমান পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়
গত কয়েক বছরে বিচ্ছিন্ন অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও কঠোর বক্তব্য দেখা গেছে। কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন এখনও সীমিত।
কারণ ছায়া অর্থনীতি এখন—
- প্রযুক্তি-সচেতন
- বহুস্তরীয় নেটওয়ার্কভিত্তিক
- আর্থিকভাবে আন্তঃসংযুক্ত
- এবং প্রভাব-সুরক্ষিত
অতএব এটি আর কেবল আইনশৃঙ্খলার ইস্যু নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সিস্টেমিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
কী করলে বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব
সমাধানও তাই সমন্বিত হতে হবে।
১. বাধ্যতামূলক ডিজিটাল সাপ্লাই ট্র্যাকিং
আমদানি থেকে খুচরা পর্যন্ত পণ্যের রিয়েল-টাইম ডেটা না থাকলে সিন্ডিকেট শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
২. রেমিট্যান্স ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক সংস্কার
আইন কঠোর করার পাশাপাশি বৈধ চ্যানেলকে দ্রুত, সস্তা ও সহজ করতে হবে—নইলে হুন্ডি টিকে থাকবে।
৩. স্মার্ট বর্ডার ম্যানেজমেন্ট
ড্রোন, এআই-ভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ, সমন্বিত তথ্য বিনিময়—প্রযুক্তি ছাড়া দীর্ঘ সীমান্ত কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ কঠিন।
৪. ঘুষ কমাতে পূর্ণ ডিজিটাল গভর্ন্যান্স
যেখানে মানবিক বিবেচনা কম, স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া বেশি—সেখানেই দুর্নীতির সুযোগ কমে।
৫. দ্রুত অর্থনৈতিক অপরাধ বিচার
পাঁচ–দশ বছর ঝুলে থাকা মামলা কোনো প্রতিরোধ তৈরি করে না। দৃশ্যমান দ্রুত শাস্তিই সবচেয়ে কার্যকর বার্তা।
এখনই সিদ্ধান্তের সময়
বাংলাদেশের উন্নয়নের এই পর্যায়ে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বাইরে নয়—ভেতরে। ছায়া অর্থনীতি যদি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তাহলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান টিকে থাকলেও তার গুণগত ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।
রাষ্ট্রের সামনে তাই স্পষ্ট দ্বিধাবিভক্ত পথ—
🔹 বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়ামূলক অভিযান
🔹 নাকি তথ্যনির্ভর, সমন্বিত এবং আপসহীন কাঠামোগত সংস্কার
ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দেরি যত বাড়ে, সংশোধনের খরচ তত বহুগুণ বাড়ে।
প্রশ্ন এখন একটাই—রাষ্ট্র কি কঠোর হবে, নাকি নীরব দর্শকের ভূমিকাই নেবে?
লেখক, সংগ্রাহক ও গবেষক: হক মো. ইমদাদুল, জাপান