কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারে খালি হাতে ও বালতি নিয়ে তল্লাশি চালিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক ও উদ্ধারকর্মীরা। এএফপি।
স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টার কিছু পর কলম্বিয়ার মনোরম কফি অঞ্চল ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের বিভিন্ন শহরে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এতে আতঙ্কিত মানুষজন রাস্তায় বেরিয়ে আসে। অন্তত ১ হাজার ৫০০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কুইবদোর আইন বিভাগের শিক্ষার্থী উইলমার কুয়েস্তা এএফপিকে বলেন, ‘মানুষজন নগ্ন অবস্থায় দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। কেউ কেউ বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে লাফ দেয়।’ তিনি ভূমিকম্পের তীব্র কম্পনের বর্ণনা দিতে গিয়ে এ কথা বলেন।
মাত্র তিন দিন আগে দায়িত্ব নেওয়া কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এস্প্রিয়েলা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। তিনি সমন্বিতভাবে উদ্ধার অভিযান চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ক্যালিতে স্বেচ্ছাসেবকেরা দ্রুত উদ্ধারকাজে নেমে পড়েন। জীবিতদের সন্ধানে তারা শাবল, সাধারণ সরঞ্জাম ও নিজেদের হাত ব্যবহার করেন। আন্দ্রেস ফেলিপে মেহিয়া তাদের গড়ে তোলা একটি অস্থায়ী উদ্ধারকারী দলের সদস্য।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আমরা সবাইকে জীবিত অবস্থায় বের করে আনার চেষ্টা করছি। এক উদ্ধারকর্মী ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা কাউকে শিস দিতে বলেন। তখন কেউ একজন শিস দিয়ে সাড়া দেয়।’
তিনি বলেন, ‘তারা একজন পুরুষ ও একটি শিশুকে বের করে আনেন। কিন্তু তার স্ত্রী এখনো ভেতরে রয়েছেন।’ ধসে পড়া একটি বহুতল ভবনের কাছে দাঁড়িয়ে তিনি এ কথা বলেন।
উদ্ধারকর্মীরা মানবশৃঙ্খল তৈরি করে ইট ও দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নিচ্ছিলেন। কয়েক মিনিট পরপর তারা কাজ থামিয়ে নিচে আটকে থাকা মানুষের বেঁচে থাকার কোনো সংকেত শোনার চেষ্টা করছিলেন।
মেহিয়া বলেন, ‘অনেক মানুষ এখানে এসেছেন। তারা ত্রাণসামগ্রী ও খাবার নিয়ে এসেছেন। দমকলকর্মীদের এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য করছেন।’
বিভিন্ন শহরে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখা গেছে। কংক্রিট, দেয়াল ও মেঝের নিচে আসবাবপত্র ও কাপড়চোপড় চাপা পড়ে আছে। দেয়াল ও মেঝে এলোমেলোভাবে ভেঙে পড়েছে। সড়কজুড়ে ছড়িয়ে আছে বৈদ্যুতিক তার।
প্রায় দুই মাসেরও কম সময় আগে প্রতিবেশী ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে ৬ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং কয়েক হাজার মানুষ গৃহহীন হয়। এর মধ্যেই কলম্বিয়ায় এ ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানল।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, সোমবার কলম্বিয়ার পাঁচটি শহরের হাসপাতালকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। ক্যালিতে রাতের কারফিউ জারি করা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা জানিয়েছে, অন্তত ছয়টি স্থানীয় বিমানবন্দরে কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
কলম্বিয়ার পপ তারকা শাকিরা জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার মাতৃভূমির প্রতি আমার সব শক্তি ও ভালোবাসা। আসুন, আমরা একে অপরকে শক্ত করে ধরে রাখি।’
কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, বিভিন্ন শহরের ধসে পড়া ভবনে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
মানিজালেসে এএফপির এক সাংবাদিক অনেক ক্ষতিগ্রস্ত ভবন দেখতে পেয়েছেন। এর মধ্যে শহরটির বহুলপ্রিয় নব্য-গথিক ক্যাথেড্রালের একটি অংশও ধসে পড়েছে।
কুইবদোতে নিজ বাড়িতে ছিলেন দন্ত চিকিৎসক জুলিয়ান পেনা। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের সময় তিনি ‘খুব, খুব শক্তিশালী’ কম্পন অনুভব করেন।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছিল। দৃশ্যটি ছিল অভিভূত হওয়ার মতো। আমি কিছু না নিয়েই দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। সেখানে শত শত মানুষ ছিল।’
তিনি বলেন, ‘অনেক ভবনে ফাঁক ও ফাটল দেখা দিয়েছে। আবার কিছু ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে।’
রাজধানী বোগোতাসহ কলম্বিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বোগোতায় অনেক মানুষ পাজামা পরা অবস্থায় দ্রুত রাস্তায় বেরিয়ে আসে।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তি ছিল ভূপৃষ্ঠের ১১০ কিলোমিটার (৬৮ মাইল) গভীরে। প্রতিবেশী ইকুয়েডর ও পানামাতেও এর কম্পন অনুভূত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নাজকা টেকটোনিক প্লেটের গভীরে থাকা একটি চ্যুতিরেখায় নড়াচড়ার কারণে ভূমিকম্পটি হয়ে থাকতে পারে।
পেশাদার ফুটবলের সব আসন্ন ম্যাচ স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশ এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে কলম্বিয়ার প্রতি সহমর্মিতার বার্তা এসেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি ‘ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে’ এবং ‘কলম্বিয়ার জনগণকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।’
পরে যুক্তরাষ্ট্র জরুরি ত্রাণ হিসেবে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেছেন, উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য ইইউ উপগ্রহভিত্তিক সেবা কোপার্নিকাসকে কাজে লাগিয়েছে।
ইসরাইল, মেক্সিকো, ইকুয়েডর ও ফ্রান্সও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।