ঢাকার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সবুজায়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর

মোহাম্মদ আবু সাঈদ, বাসস

অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাশয় কমে যাওয়া এবং যানবাহনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহারে রাজধানী ঢাকার তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে ঢাকা ধীরে ধীরে ‘হিট আইল্যান্ড’-এ পরিণত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবুজায়ন, জলাশয় সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণ প্রযুক্তি সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পাশাপাশি দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন রাজধানীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তিনি জানান, যানবাহন খাত থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমাতে বৈদ্যুতিক, ব্যাটারি ও হাইব্রিড গাড়ির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ভবন নির্মাণে ফায়ার ব্রিকসের পরিবর্তে সলিড ব্লক, হলো ব্লক ও নন-ফায়ার ব্রিকস ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। প্রচলিত কাচের পরিবর্তে ডাবল গ্লেজড ইউনিট (ডিজিইউ), স্যান্ডউইচ ও টেম্পার্ড গ্লাস ব্যবহার বাড়ালে ভবনে তাপ প্রবেশ ও বিকিরণ কমানো সম্ভব হবে।

ভবনগুলোতে প্রচলিত স্প্লিট ও উইন্ডো এসির পরিবর্তে ভ্যারিয়েবল রেফ্রিজারেন্ট ফ্লো (ভিআরএফ) ও চিলারভিত্তিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির প্রসার রাজধানীর তাপমাত্রা ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

রাজধানীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সবুজায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি সড়ক বিভাজক, ফুটপাত ও নতুন স্থাপনার আশপাশে ল্যান্ডস্কেপিং ও আরবরিকালচারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি উঁচু ভবনে ছাদবাগান সম্প্রসারণের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

ড. আবু নাসের বলেন, ঢাকায় ছোট পুকুর, লেক ও অন্যান্য জলাশয়ের সংখ্যা বাড়ানো এবং বিদ্যমান জলাশয় সংরক্ষণ জরুরি। জলাশয় ও সবুজ এলাকার বিস্তার নগরের তাপমাত্রা কমানোর পাশাপাশি অতিবৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতা মোকাবিলায়ও সহায়ক হবে।

গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সমন্বয়) সুমন চাকমা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত গণপূর্ত মেট্রোপলিটন জোনে ৫ লাখ ৬২ হাজার গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে আরবরিকালচার খাতে ৫ লাখ ৫২ হাজার এবং অন্যান্য গণপূর্ত বিভাগে ১০ হাজার গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি জানান, ১৬ আগস্ট পর্যন্ত আরবরিকালচার গণপূর্ত বিভাগে ২২ হাজার ৩৯২টি এবং এস বি নগর গণপূর্ত বিভাগের জোন-৩-এ ১৫০টি গাছ লাগানো হয়েছে। এসবের মধ্যে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রয়েছে। এছাড়া গণপূর্ত ঢাকা জোনে আগস্টের মধ্যে ১০ হাজার গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইতোমধ্যে ৫ হাজার ৩৩৯টি গাছ লাগানো হয়েছে।

ঢাকার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে প্রচলিত বিদ্যুতের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সুমন চাকমা জানান, ঢাকা গণপূর্ত ই/এম বিভাগের উদ্যোগে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে ৪,৬২২.৪৮ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।

গণপূর্ত বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) আশ্রাফুল হক বলেন, সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত ও বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত এসি ও ফ্রিজ সিএফসি-মুক্ত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ঢাকাকে বসবাসযোগ্য করার লক্ষ্যে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকাকে সিঙ্গাপুর, সিউল ও টোকিওর মতো প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব সবুজ নগরীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব মোকাবিলায় শুধু বৃক্ষরোপণ নয়—জলাশয় রক্ষা, পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ, পরিচ্ছন্ন পরিবহন, জ্বালানি দক্ষতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও নগরবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণও এ উদ্যোগের সফলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + fifteen =