অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ: এই জয় বিশ্বজয়ের সমান

অস্ট্রেলিয়ার নর্দার্ন টেরিটরির ডারউইনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দাপট দেখিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাসের অন্যতম সেরা জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে এর আগে কখনো ক্রিকেট না খেলা একটি দল পূর্ণ শক্তির অস্ট্রেলিয়াকে এভাবে পরাস্ত করবে—বাংলাদেশের কট্টর ক্রিকেটপ্রেমীরাও হয়তো স্বপ্নেও ভাবেননি।

এটি কোনো অঘটন কিংবা আপসেট ছিল না। শ্রেয়তর ক্রিকেট খেলেই বাংলাদেশ যোগ্য দল হিসেবে ম্যাচটি জিতেছে। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—তিন বিভাগেই চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে এবং অধিকাংশ সময়ই অস্ট্রেলিয়ার ওপর প্রাধান্য ধরে রেখেছে।

অথচ কিছুদিন আগেই দুর্বল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের বিব্রতকর পরাজয় হয়েছিল। এমনকি ডারউইন টেস্টের আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রান্তিক দলের বিপক্ষেও বাংলাদেশ নিজেদের সামর্থ্যের পরিচয় দিতে পারেনি। সেই দলটিই যেন হঠাৎ করেই ইতিহাস সৃষ্টির তাড়নায় জেগে উঠেছিল।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো অত্যন্ত বিরল ঘটনা। ইংল্যান্ড, ভারত কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো শক্তিশালী দলগুলোর পক্ষেও এমন জয় নিয়মিত পাওয়া সম্ভব হয়নি। সেখানে বাংলাদেশ যেভাবে পূর্ণ শক্তির অস্ট্রেলিয়াকে পরাস্ত করেছে, তার মাহাত্ম্য আরও বেশি।

ডারউইনের সেই ঐতিহাসিক জয়ে তানজিদ তামিমসহ বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের দৃঢ়তা এবং হাসান মাহমুদ ও মেহেদী হাসান মিরাজের দুর্দান্ত বোলিং অস্ট্রেলিয়াকে কার্যত হতবাক করে দিয়েছিল। আমার বিবেচনায়, এটি বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জয়—সম্ভবত শ্রেষ্ঠতম।

একজন বাংলাদেশি-অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে এই জয়ে আমার অনুভূতিতে কিছুটা মিশ্রতা থাকলেও মায়ের দেশের এমন দাপুটে জয়ে আমি নিঃসন্দেহে উল্লসিত। দেশে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে জরুরি প্রয়োজনে দেশে ফিরে আসায় মাঠে উপস্থিত থেকে এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত উদযাপনের সুযোগ হারিয়েছি—এটাই কিছুটা অতৃপ্তি।

ম্যাকায় সুযোগ এসেছিল, কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ছিল ম্যাকায় দ্বিতীয় টেস্ট জিতে অদম্য ক্যাঙ্গারু বাহিনীকে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করার। সবুজ ঘাসে ঢাকা বাউন্সি উইকেটে টস জিতে প্রথমে বোলিং করার সুযোগ পেলে হয়তো বাংলাদেশ ম্যাচ জয়ের সম্ভাবনা আরও জোরালোভাবে তৈরি করতে পারত।

এমন কন্ডিশনে বিশ্বসেরা অস্ট্রেলীয় পেস আক্রমণ—বিশেষ করে বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা মিচেল স্টার্কের আগ্রাসী বোলিং—যেকোনো ব্যাটিং লাইনআপকে বিপদে ফেলতে পারে। ভারত কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলও এমন পরিস্থিতিতে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ত।

বাংলাদেশ অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস ২১০ রানে আটকে দিতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু ব্যবধান যদি আরও কম রাখা যেত এবং বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসে অন্তত ২০০ রানের মতো সংগ্রহ করতে পারত, তাহলে ম্যাচটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারত। শেষ পর্যন্ত ইনিংস ব্যবধানে হেরে বাংলাদেশ সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ করেছে।

পেস আক্রমণে নতুন আত্মবিশ্বাস

তবে ফলাফল যা-ই হোক, এই সিরিজে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি পেস বোলিং ইউনিটের আত্মবিশ্বাস। তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ ও শরিফুল ইসলামকে নিয়ে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

এই সিরিজে তাদের পারফরম্যান্স দেখে মনে হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজেলউড ও প্যাট কামিন্সের মতো বিশ্বমানের পেসারদের সঙ্গে লড়াই করার সামর্থ্য বাংলাদেশের রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পেসারদের কার্যকারিতা বরং বেশি নজর কেড়েছে।

প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরাও অস্ট্রেলীয় ব্যাটারদের তুলনায় অনেক বেশি দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। সব মিলিয়ে সিরিজটি বাংলাদেশের ক্রিকেটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।

এই পারফরম্যান্সের পর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক সিরিজে আমন্ত্রণ জানাবে—এমন প্রত্যাশা করাই যায়। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড (MCG), সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড (SCG), ব্রিসবেন কিংবা অ্যাডিলেডের মতো ঐতিহাসিক ভেন্যুতে বাংলাদেশের খেলার সুযোগ তৈরি হলে সেটি দেশের ক্রিকেটের জন্য বড় অর্জন হবে।

ধারাবাহিকতাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

অস্ট্রেলিয়া সফরের এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশকে নিজেদের আরও পরিণত করতে হবে। একটি বড় জয় দিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে আলোড়ন সৃষ্টি করা সম্ভব, কিন্তু ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করতে হলে টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শক্তিশালী ঘরোয়া কাঠামো এবং মানসম্পন্ন পেস ও ব্যাটিং ইউনিট গড়ে তোলা জরুরি।

বাংলাদেশ যদি এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে এবং দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে সিরিজ জয় করতে পারে, তাহলে আইসিসি বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার স্বপ্নও আর অসম্ভব থাকবে না।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের আজন্ম শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে এই সিরিজের পারফরম্যান্সে আমার প্রত্যাশা এখন আকাশ ছুঁয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জয়—বিশ্বজয়ের অনুভূতি

পেছনে ফিরে তাকালে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে হয়—অস্ট্রেলিয়ায় মাত্র দ্বিতীয় সফরে এসে প্রথমবারের মতো তাদের মাটিতে খেলেই বাংলাদেশ যা করেছে, ইংল্যান্ড, ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবা পাকিস্তানও সবসময় তা করতে পারেনি।

জানি না জীবদ্দশায় বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ জয় করতে দেখার সুযোগ পাব কি না। তবে আমার কাছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো অনেকটাই বিশ্বকাপ জয়ের সমান।

বিষয়টি বোঝাতে একটি উদাহরণই যথেষ্ট—ভাবুন, বাংলাদেশের ফুটবল দল স্পেনের বিপক্ষে তাদেরই দেশে গিয়ে বার্সেলোনায় একটি ম্যাচ জিতে এসেছে। সেই জয়ের মাহাত্ম্য যেমন হবে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক জয়ও আমার কাছে তেমনই এক অবিশ্বাস্য অর্জন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 3 =