পরিবেশ ও জলবায়ু ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশের উদ্যোগ

জাতিসংঘের মরুকরণ মোকাবিলা কনভেনশনের (UNCCD) ১৭তম কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (COP17) সম্মেলনের সাইডলাইনে বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, এমপি, চারটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন।

বৈঠকগুলোতে ভূমি অবক্ষয় ও খরা মোকাবিলা, জলবায়ু সহনশীলতা, বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বাণিজ্য, শ্রম অভিবাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূমি অবক্ষয়ের মতো আন্তঃসীমান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করা জরুরি। বাংলাদেশ তার অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে বিনিময়ের পাশাপাশি অন্য দেশগুলোর সফল উদ্যোগ থেকেও শিক্ষা নিতে আগ্রহী।

ভারত-বাংলাদেশ পরিবেশ সহযোগিতা

ভারতের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে ২৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের পরিবেশ ও জলবায়ু সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বৈঠকে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, পানি সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, খরা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে যৌথ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়। সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষা, রিমোট সেন্সিং ও জিআইএস প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ও আলোচনায় আসে।

এ ছাড়া নবায়নযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ, ভূমি-সাশ্রয়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি এবং পরিবেশসম্মত জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মঙ্গোলিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান

মঙ্গোলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাতসেতসেগ বাতমুনখের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হয়। উভয় দেশে দূতাবাস খোলার মাধ্যমে কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব জোরদারের বিষয়েও মতবিনিময় করেন তারা।

পরিবেশ ও জলবায়ু সহযোগিতার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়টি বৈঠকে গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ ও তৈরি পোশাক রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়।

মঙ্গোলিয়ার শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় নির্মাণ, সেবা ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মীদের নিরাপদ ও নিয়মিত কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে। এ ক্ষেত্রে সরকার-টু-সরকার ব্যবস্থা, দক্ষতার স্বীকৃতি এবং অভিবাসী কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিবাসন

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (IOM) উপ-মহাপরিচালক (অপারেশনস) উগোচি ড্যানিয়েলসের সঙ্গে ২৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিবাসনের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন পরিবেশমন্ত্রী।

জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, জলবায়ুজনিত মানব চলাচলের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে মতবিনিময় হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসনের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর উভয় পক্ষ গুরুত্বারোপ করে।

মঙ্গোলিয়ার সঙ্গে পরিবেশ ও জলবায়ু সহযোগিতার নতুন উদ্যোগ

মঙ্গোলিয়ার পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সান্দাগ-ওচির সেংদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই দেশের পরিবেশ ও জলবায়ু সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।

এ লক্ষ্যে পরিবেশ ও জলবায়ু সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) প্রণয়নের বিষয়টি আলোচনায় আসে। ভূমি পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু অভিযোজন, টেকসই প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সক্ষমতা উন্নয়নকে সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বাংলাদেশ মঙ্গোলিয়ার চারণভূমি ব্যবস্থাপনা, মরুকরণ নিয়ন্ত্রণ ও খরা সহনশীলতার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে জলাভূমি, উপকূলীয় অঞ্চল ও কমিউনিটিভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা মঙ্গোলিয়ার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার আগ্রহ জানানো হয়।

এ ছাড়া জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি, খরা পূর্বসতর্কীকরণ ব্যবস্থা, বিশেষজ্ঞ বিনিময়, প্রশিক্ষণ, যৌথ গবেষণা এবং পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়।

আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদারের প্রত্যাশা

পরিবেশমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, COP17-এর সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত এসব বৈঠকের ধারাবাহিকতায় সংশ্লিষ্ট দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা আরও জোরদার হবে।

তিনি বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা, ভূমি পুনরুদ্ধার ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

four × 4 =