সঙ্গীত জগতের নক্ষত্র সাবিনা ইয়াসমিনের জন্মবার্ষিকী আজ

সঙ্গীত জগতের নক্ষত্র ও জীবন্ত কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের ৭২তম জন্মবার্ষিকী আজ। তিনি ১৯৫৪ সালের এই দিনে সাতক্ষীরায় জন্মগ্রহণ করেন।

সাবিনা ইয়াসমিনের পিতা লুতফর রহমান ব্রিটিশ রাজের অধীনে সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন এবং মা বেগম মৌলুদা খাতুন ছিলেন কণ্ঠশিল্পী। তার মা সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ কাদের বকশের কাছে গানের তালিম নিয়েছিলেন। পাঁচ বোনের মধ্যে ছোট সাবিনার চার বোনই সঙ্গীতের সাথে যুক্ত ছিলেন। তারা হলেন ফরিদা ইয়াসমিন, ফৌজিয়া ইয়াসমিন, নীলুফার ইয়াসমিন এবং নাজমা ইয়াসমিন।

ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি সাবিনা ইয়াসমিনের অনুরাগ জন্মে। মাত্র সাত বছর বয়সে স্টেজে উঠে গান করেন সাবিনা ইয়াসমিন। বড় বোন ফরিদা ইয়াসমিন যখন ওস্তাদ দুর্গাপ্রসাদ রায়ের কাছে গানের তালিম নিতেন, তখন সাবিনাও বোনের পাশে বসে সেই গানগুলো কণ্ঠে তুলে নিতেন।

প্রতিবেশী সঙ্গীতজ্ঞ আলতাফ মাহমুদ প্রথম সাবিনা ইয়াসমিনের গায়কী প্রতিভা আবিষ্কার করেন। বাড়িতে বসে হারমোনিয়ামে তিনি প্রথম যে গানটি শিখেছিলেন, তা ছিল ‘খোকন মণি সোনা’। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ওস্তাদ পি সি গোমেজের কাছে তার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নেওয়া শুরু হয়। এর আগে ১৯৬২ সালে ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে রবীন ঘোষের সুরে শিশুশিল্পী হিসেবে একটি গানে অংশ নেন তিনি।

শৈশবে বেতারের ‘খেলাঘর’ অনুষ্ঠানে ছোটদের গান গেয়ে তিনি প্রশংসা কুড়ান। পরে ১৯৬৭ সালে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর ১৯৭২ সালে ‘অবুঝ মন’ চলচ্চিত্রে ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’ গানটিতে কণ্ঠ দিয়ে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

শিশুশিল্পী হিসেবে ১৯৬২ সালে পরিচালক এহতেশামের উদ্যোগে ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে প্রথম গান গাওয়ার সুযোগ পান সাবিনা ইয়াসমিন। খ্যাতনামা পরিচালক আমজাদ হোসেন ও নুরুল হক বাচ্চু পরিচালিত ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রে ১৯৬৭ সালে তিনি প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে সুযোগ পান। এরপর তার দীর্ঘ পথচলায় অসংখ্য দেশাত্মবোধক গান ও চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন।

শুধু দেশাত্মবোধক বা চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দেওয়ায় নয়, তিনি উচ্চাঙ্গ, ধ্রুপদী, লোকসঙ্গীত ও আধুনিক বাংলা গানসহ বিভিন্ন ঘরানার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। সেসব গান তাকে উচ্চমাত্রায় আসীন করেছে। প্রায় পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে গান করে যাচ্ছেন তিনি। প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি সুরকার আর. ডি. বর্মণের সুরে শত্রু চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দেন সাবিনা ইয়াসমিন।

অন্যদিকে ইন্দো-বাংলা যৌথ প্রযোজনার ‘অন্যায় অবিচার’ চলচ্চিত্রে ব্যতিক্রমী ঘরানার গান ‘ছেড়ো না ছেড়ো না হাত’ গানে কণ্ঠ দেন। প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী কিশোর কুমারের ও মান্না দে’র সাথেও দ্বৈত গানে কণ্ঠ দিয়েছেন সাবিনা।

তিনি জনপ্রিয় গায়ক শ্যামল মিত্রের সাথে ডুয়েটে  ‘পথের সাথী নামো গো পথে আজ’-গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন। এছাড়া ভূপেন হাজারিকা সুরে ও মাসুদ করিমের গীতে দুটি গান করেছেন সাবিনা ইয়াসমিন।

সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া উল্লেখযোগ্য দেশাত্মবোধক গানগুলোর মধ্যে রয়েছে, ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’,  ‘ও আমার বাংলা মা’, ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’, ‘মাঝি নাও ছাড়িয়া দে’ , ‘ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’, ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য’ ও ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার’।

বিশিষ্ট সুরকার আলাউদ্দিন আলীর সুরে তার গাওয়া বিপুল জনপ্রিয় গান ‘ও আমার রসিয়া বন্ধুরে’ এবং ‘চিঠি দিও প্রতিদিন’ গান দুটি এখনও সমান জনপ্রিয়। ‘একবার যেতে দে না’, ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘কতো সাধনায় এমন ভাগ্য মেলে’, ‘ও মাঝি নাও ছাইড়া দে’, ‘সুন্দর সুবর্ণ’, ‘এই মন তোমাকে দিলাম’, ‘মনেরই রঙে রাঙাবো’, ‘তুমি বড় ভাগ্যবতী’-এমন প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন।

এই গুণী শিল্পী প্রায় ১৪ বার বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন। শিল্পকলার সঙ্গীত শাখায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৮৪ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কারসহ (ছয়বার) অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন।

এদিকে, সাবিনা ইয়াসমিনের জন্মদিনকে স্মরণীয় করতে চলচ্চিত্র সাংবাদিক আবদুর রহমানের সঞ্চালনায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আই’য়ে প্রচারিত হবে ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’ শিরোনামের একটি অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানটি শুক্র ও শনিবার প্রচারিত হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 10 =