ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিদায়

এক দশকেরও বেশি সময় পর ইরাকে সামরিক মিশন শেষ করছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট। জঙ্গিগোষ্ঠীর হাত থেকে ইরাককে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এই জোটের উপস্থিতি দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার কারণ ছিল। এএফপি

২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সেনারা ইরাক ও সিরিয়ায় মোতায়েন হয়। সে সময় আইএস দুই দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নিয়েছিল এবং ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও নৃশংসতা চালায়।

২০১৭ সালে ইরাকে এবং ২০১৯ সালে সিরিয়ায় আইএসকে পরাজিত করা হয়। তবে গোষ্ঠীটির অবশিষ্ট সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যেতে জোটের সেনারা ইরাকে অবস্থান করতে থাকে।

২০২৪ সালে বাগদাদ ও ওয়াশিংটন জোটের মিশন ধীরে ধীরে শেষ করার বিষয়ে সম্মত হয়। এরপর ইরাকের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি থেকে জোটের সেনারা পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হয়। শেষপর্যায়ে তাদের উপস্থিতি সীমিত হয়ে পড়ে দেশটির স্বায়ত্তশাসিত উত্তরাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান অঞ্চলে।

তাদের চূড়ান্ত সেনা প্রত্যাহার বুধবার ওই অঞ্চল থেকে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

ইরাক সরকার মনে করে, জোটের সেনা প্রত্যাহারের ফলে ইরানের সমর্থনপুষ্ট শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে অস্ত্র রাখার যে অজুহাত ছিল, তা আর থাকবে না।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদি ঘোষণা করেছেন, জোটের সেনা প্রত্যাহারের পরদিন ১ অক্টোবর ‘সার্বভৌমত্ব দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে।

সোমবার দেশটির নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগের প্রধানরা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, এটি এমন একটি ‘জাতীয় দিবস’, যা ইরাকের সার্বভৌমত্ব অর্জনের পথচলা সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে এবং রাষ্ট্র ও এর প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃত্বকে আরও শক্তিশালী করে।

তারা আরও বলেন, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অস্ত্রের বিষয়টি সমাধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব আরও শক্তিশালী হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে চলতি বছর ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী জায়েদি রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্রের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে তাদের অস্ত্র সরকারের কাছে হস্তান্তরে বাধ্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তার সরকার প্রথমে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ত্যাগের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল। তবে অস্ত্রের বিষয়টি কীভাবে ‘নিয়ন্ত্রণে আনা যায়’, তা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকায় পরে সেই সময়সীমা প্রত্যাহার করা হয়।

বিষয়টি ইরাকে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার অন্যতম কারণ এবং এর সমাধানে আরও অনেক সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বেশ কয়েকটি শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী অস্ত্র ছাড়তে অস্বীকৃতি জানানোয় দেশটির জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকরা আলোচনায় হস্তক্ষেপ করেছেন। তারা এখন একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যেসব শর্ত দিয়েছে, তার মধ্যে শুধু বিদেশি সেনা প্রত্যাহারই নয়; যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবিও রয়েছে।

ইরাকের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী কাতায়েব হিজবুল্লাহ সোমবার এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘দখলদার বাহিনী’ প্রত্যাহার করা পূর্ণ সার্বভৌমত্ব অর্জনের পথে একটি সূচনা। তবে একই বিবৃতিতে তারা প্রধানমন্ত্রী জায়েদির সরকারকে হুমকিও দিয়েছে।

গোষ্ঠীটি বলেছে, যে সরকার জনগণের কল্যাণে কাজ করবে না, তাকে সব ধরনের সম্ভাব্য উপায়ে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে।

ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট এবং ইরানের সমর্থনপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো একই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। কিন্তু আইএস পরাজিত হওয়ার পর ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সেনাদের উপস্থিতি বাগদাদ সরকার এবং এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।

গোষ্ঠীগুলো ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানায়। একই সঙ্গে তারা মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হামলা চালায়। কয়েক বছর ধরে এসব হামলায় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর কয়েকজন কমান্ডার নিহত হয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক আঞ্চলিক যুদ্ধের সময় ইরান ও তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো হামলা আরও বাড়িয়ে দেয়। এসব হামলায় কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সেনারাও লক্ষ্যবস্তু হয়।

কুর্দিস্তান অঞ্চলের রাজধানী এরবিলের কুর্দিরা এএফপিকে জানিয়েছেন, জোটের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও প্রতিরোধকারী বাহিনী চলে যাওয়ার পর তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

তাদের আশঙ্কা, স্বায়ত্তশাসিত এই অঞ্চলে বারবার ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। জোটের প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে এসব হামলা থেকে তাদের কে রক্ষা করবে, তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

চলতি বছরের শুরুতেই মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট সিরিয়া থেকেও তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

15 + sixteen =