৪২৯ রান করেও হার! রাওয়ালপিন্ডিতে ক্রিকেটের মহাকাব্য

সালেক সুফী

রাওয়ালপিন্ডি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গতকাল ক্রিকেট বিশ্ব দেখল এক অবিস্মরণীয় রূপকথা। ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার ম্যাচটি শুধু রানের বন্যা কিংবা চার-ছক্কার উৎসব ছিল না; ছিল শেষ বল পর্যন্ত স্নায়ুচাপ, অবিশ্বাস্য লড়াই এবং নাটকীয়তার অনন্য প্রদর্শনী। ৪২৯ রানের বিশাল পুঁজি নিয়েও জিততে পারল না ইংল্যান্ড। ৪৯.৫ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ৪৩০ রান তুলে দুই উইকেটের অবিশ্বাস্য জয় ছিনিয়ে নিল শ্রীলঙ্কা। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের ঘটনা।

পাকিস্তানে চলমান তিন জাতির ওয়ানডে টুর্নামেন্টে দুই দলের জন্যই ম্যাচটি ছিল বাঁচা-মরার লড়াই। নিজেদের প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানের কাছে হেরে চাপে ছিল ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা। ব্যাটিংবান্ধব উইকেটে বড় সংগ্রহ গড়ার সম্ভাবনা ছিল শুরু থেকেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি যে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় লড়াইয়ে পরিণত হবে, তা হয়তো কেউই ভাবেননি।

ব্রুকের দ্বিশতকেও জয় অধরা

টসের পর ব্যাট করতে নেমে ইংল্যান্ড যে ব্যাটিং তাণ্ডব চালায়, তার কেন্দ্রে ছিলেন অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক। মাত্র ১১৬ বলে ২১টি চার ও ১০টি ছক্কায় ২০২ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন তিনি। ওয়ানডে ক্রিকেটে অধিনায়ক হিসেবে তাঁর এই দ্বিশতক ছিল এক মাইলফলক।

তাঁকে দারুণভাবে সহযোগিতা করেন জো রুট, যিনি করেন ৬৯ রান। উইল জ্যাকস মাত্র ৩০ বলে অপরাজিত ৬৬ রান তুলে শ্রীলঙ্কার বোলারদের ওপর আরও চাপ বাড়ান। টম ব্যান্টনের ব্যাট থেকে আসে ৫০ রান।

নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৪ উইকেটে ৪২৯ রান তোলে ইংল্যান্ড। এমন বিশাল সংগ্রহের পর অনেকেই ইংল্যান্ডের জয়কে প্রায় নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু ক্রিকেট যে অনিশ্চয়তার খেলা, রাওয়ালপিন্ডির এই ম্যাচ তার আরেকটি অবিস্মরণীয় প্রমাণ হয়ে থাকল।

শ্রীলঙ্কার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন

৪৩০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই বিপর্যয়ে পড়ে শ্রীলঙ্কা। মাত্র ২৪ রানের মধ্যে হারায় দুই উইকেট। এমন পরিস্থিতিতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ইংল্যান্ডের হাতে চলে গেছে বলেই মনে হচ্ছিল।

কিন্তু হাল ছাড়েনি শ্রীলঙ্কা। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থায় অসাধারণ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন পাভান রাতনায়েকে ও আসিথা ফার্নান্দো। তৃতীয় উইকেটে তাঁদের ১৬৪ রানের জুটি শ্রীলঙ্কাকে আবারও লড়াইয়ে ফিরিয়ে আনে। রাতনায়াকে করেন ১৩০ রান, আর ফার্নান্দোর ব্যাট থেকে আসে ৯৭ রান।

তাঁদের গড়ে দেওয়া ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তী ব্যাটাররা চালিয়ে যান অবিশ্বাস্য লড়াই। দাসুন শানাকা মাত্র ৫০ বলে ৯৭ রান করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। অন্য প্রান্তে ঝড় তোলেন জানিথ লিয়ানাগে। তাঁর ২৭ বলে অপরাজিত ৬১ রানের ইনিংস শ্রীলঙ্কাকে পৌঁছে দেয় জয়ের দ্বারপ্রান্তে।

তবু শেষ ওভারে নাটকীয়তা তখনো বাকি। ইংল্যান্ডের জশ টাং পরপর দুই বলে দুনিথ ওয়ালালাগে ও ইশান মালিঙ্গাকে ফিরিয়ে শ্রীলঙ্কার শিবিরে নতুন করে শঙ্কা ছড়িয়ে দেন। শেষ ওভারে উইকেট হারানোর চাপে ম্যাচের ভাগ্য আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

কিন্তু স্নায়ুর চাপ সামলে পঞ্চম বলে ছক্কা হাঁকিয়ে শ্রীলঙ্কার জয় নিশ্চিত করেন লিয়ানাগে। ৪৯.৫ ওভারে ৮ উইকেটে ৪৩০ রান তুলে দুই উইকেটে ম্যাচ জিতে নেয় শ্রীলঙ্কা। শেষ মুহূর্তের এই জয় ক্রিকেটীয় নাটকীয়তাকে নিয়ে যায় অন্য উচ্চতায়।

ফাইনালের লড়াই আরও জমজমাট

এই জয়ে দুই ম্যাচ শেষে একটি জয় নিয়ে ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন জিইয়ে রাখল শ্রীলঙ্কা। অন্যদিকে, প্রথম দুই ম্যাচেই জয় তুলে নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান।

দুই ম্যাচেই জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হওয়া ইংল্যান্ডের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। তবে ফিরতি পর্বে বাকি ম্যাচগুলোতে জিততে পারলে তাদেরও ফাইনালে ওঠার সুযোগ থাকবে। সেই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বোলিং ও চাপ সামলানোর ক্ষেত্রেও ইংল্যান্ডকে আরও কার্যকর হতে হবে।

ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য অনন্য অভিজ্ঞতা

প্রযুক্তির কল্যাণে অস্ট্রেলিয়ার এক পর্যটননগরীতে বসে গভীর রাতে এই অবিশ্বাস্য ম্যাচ দেখার সুযোগ হয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে এটি ছিল ক্রিকেটের অনাবিল আনন্দ উপভোগের এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

হ্যারি ব্রুকের দ্বিশতক, শ্রীলঙ্কার ব্যাটারদের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, দুই দলের সম্মিলিত রানের পাহাড় এবং শেষ ওভারের নাটকীয়তা—সব মিলিয়ে ম্যাচটি ওয়ানডে ক্রিকেটের অন্যতম সেরা রান উৎসব হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

৪২৯ রান করেও জয় অধরা ইংল্যান্ডের জন্য এই হার যেমন হতাশার, তেমনি শ্রীলঙ্কার জন্য এটি আত্মবিশ্বাস ও লড়াকু মানসিকতার এক অনন্য উদাহরণ। রাওয়ালপিন্ডি দেখল, ক্রিকেটে কোনো লক্ষ্যই অসম্ভব নয়—শেষ বল পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেলে রূপকথাও বাস্তব হয়ে উঠতে পারে।

সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড

ইংল্যান্ড: ৪২৯/৪, ৫০ ওভার, হ্যারি ব্রুক: ২০২, জো রুট: ৬৯, উইল জ্যাকস: অপরাজিত ৬৬ ও টম ব্যান্টন: ৫০। দুনিথ ওয়ালালাগে: ২/৫৬

শ্রীলঙ্কা: ৪৩০/৮, ৪৯.৫ ওভার, পাভান রাতনায়েকে: ১৩০, আসিথা ফার্নান্দো: ৯৭, দাসুন শানাকা: ৯৭, জানিথ লিয়ানাগে: অপরাজিত ৬১, জশ টাং: ৩/৭৯। স্যাম কারান: ২/১০৩।

ফলাফল: শ্রীলঙ্কা ২ উইকেটে জয়ী।

ম্যাচসেরা: পাভান রাতনায়েকে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 − six =