অস্ট্রেলিয়া সফর: বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা

আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরই দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া সফরে যাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। দীর্ঘ ২৩ বছর পর এটি হবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের মাত্র দ্বিতীয় দ্বিপাক্ষিক টেস্ট সিরিজ। শক্তি, সামর্থ্য, অভিজ্ঞতা ও পরিসংখ্যান—সব বিবেচনায় ক্রিকেটের পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তাই সিরিজে বাংলাদেশ বড় কোনো অঘটন ঘটাবে—এমন প্রত্যাশা খুব কমই আছে।

তবে এই সিরিজটি আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় এবং আগামী ১২ মাসে অস্ট্রেলিয়াকে ২০টি টেস্ট খেলতে হওয়ায় ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া প্রায় পূর্ণশক্তির দল ঘোষণা করেছে। অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের নেতৃত্বাধীন দলে রয়েছেন স্কট বোল্যান্ড, অ্যালেক্স ক্যারি, ক্যামেরুন গ্রিন, জশ হ্যাজলউড, ট্রাভিস হেড, জশ ইংলিস, মার্নাস লাবুশেন, নাথান লায়ন, স্টিভ স্মিথ, মিচেল স্টার্ক, জেক ওয়েদারাল্ড ও বিউ ওয়েবস্টার।

স্টার্ক, কামিন্স, হ্যাজলউড ও লায়নকে নিয়ে গড়া অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণ শুধু বর্তমান সময়ের নয়, টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা বোলিং ইউনিট বললেও অত্যুক্তি হবে না। এর সঙ্গে স্কট বোল্যান্ড, ক্যামেরুন গ্রিন ও বিউ ওয়েবস্টারের মতো কার্যকর বিকল্পও রয়েছে। চোটের কারণে কিছুদিন বিশ্রামে থাকা অস্ট্রেলিয়ার মূল বোলাররা এই সিরিজ দিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরবেন। ফলে পূর্ণ শক্তিতেই মাঠে নামবে স্বাগতিকরা।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই ভয়ংকর পেস আক্রমণ সামাল দেওয়া। অন্যদিকে স্টিভ স্মিথ ও ট্রাভিস হেডের উপস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপও থাকবে পরিপূর্ণ শক্তির। এই সিরিজকে সামনে রেখে তারা ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আসন্ন টেস্ট সিরিজের প্রস্তুতিও সেরে নেবে। বর্তমান দলগত শক্তি বিবেচনায় অস্ট্রেলিয়া আবারও বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার অন্যতম দাবিদার।

দুই টেস্ট অনুষ্ঠিত হবে ম্যাকাই ও কেয়ার্ন্সে। যদিও এগুলো সিডনি, মেলবোর্ন, ব্রিসবেন, পার্থ, অ্যাডিলেড বা হোবার্টের মতো ঐতিহ্যবাহী ভেন্যু নয়, তবুও অস্ট্রেলিয়ার উইকেটের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য—অতিরিক্ত গতি ও বাউন্স—বাংলাদেশের ব্যাটারদের কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলবে। আগস্ট মাসের আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথা নয়, কিন্তু উইকেটের আচরণ সামলানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

মোমিনুল হক, মুশফিকুর রহিম ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তদের স্টার্ক, কামিন্স ও হ্যাজলউডের গতিময় বোলিংয়ের বিপক্ষে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে জিম্বাবুয়ের পেস আক্রমণের বিপক্ষেই বাংলাদেশের ব্যাটারদের সংগ্রাম করতে দেখা গেছে। তাই অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বমানের পেস ব্যাটারির সামনে তারা কতটা প্রস্তুত, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বাংলাদেশের বোলিং বিভাগও পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই। নাহিদ রানা ও শরিফুল ইসলামের ম্যাচ ফিটনেস নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। পূর্ণশক্তির পেস আক্রমণ নিয়ে খেলতে পারলে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের কিছুটা হলেও চাপে ফেলা সম্ভব হতো। এখন সেই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

বাস্তবতা হলো, এই সিরিজে বাংলাদেশ স্পষ্টতই আন্ডারডগ। একজন বাংলাদেশি-অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে আমি বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা রাখার আহ্বান জানাই। যদি বাংলাদেশ দুটি টেস্টেই লড়াই করে ম্যাচকে অন্তত চতুর্থ দিনে নিয়ে যেতে পারে, সেটিও ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

মনে রাখতে হবে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এসে ইংল্যান্ড, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলও বারবার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য এই সফর নিঃসন্দেহে টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা। এখন দেখার বিষয়, বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের বিপক্ষে টাইগাররা কতটা সাহস, শৃঙ্খলা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা নিয়ে নিজেদের মেলে ধরতে পারে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 1 =